ফাল্গুন ও চৈত্র মাস মিলে ষড়ঋতুর শেষ ঋতুরাজ বসন্তের। বসন্তের প্রথম দিনে আলাদা আয়োজন থাকে সবার মধ্যে। বৈচিত্র্যময় পোশাক, সাজে আর গহনার নতুনত্বে নিজেকে সাজিয়ে তোলে অনন্য করে।

বাসন্তী রঙের বসন্তের পোশাক

অনেকের সারা বছর ওয়েস্টার্ন পোশাকের দিকে আগ্রহ থাকলেও বৈচিত্র্য আনতে উৎসব পার্বণগুলোতে প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নেন ষোলোআনা দেশীয় পোশাক। বাহারি সালোয়ার-কামিজ, শাড়ি, টি-শার্ট ও পাঞ্জাবি পরে সবাই মেতে ওঠে এই উৎসবে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশীয় ফ্যাশন হাউজগুলো সব সময়ই তাদের পোশাকের ঢং আর ডিজাইনে নিয়ে আসে পরিবর্তন ও নতুনত্ব। এবারও তারা তৈরি করেছে নানা রঙের বসন্তের পোশাক। বেশিরভাগ ফ্যাশন হাউজই বসন্তের পোশাকে উজ্জ্বল রংকে প্রাধান্য দেয়। আর এসব আয়োজনে থাকে বাহারি রঙের শাড়ি, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, থ্রি-পিস, টি-শার্ট, শার্ট ইত্যাদি। সব ধরনের পোশাকেই রয়েছে বসন্তের ছোঁয়া। বসন্তকে ঘিরে পোশাকগুলোতে কাজ করা হয়েছে নানা ব্লক, টাইডাই, স্প্রে ব্লক, চুনরি, স্ক্রিনপ্রিন্ট, কারচুপি ইত্যাদি। পোশাকে তুলে ধরা হয়েছে তারুণ্য। বাসন্তী বা হলুদকে ফাল্গুনের রং মনে করা হয়। তবে বর্তমানে আর সেই ধারা নেই। এখন বাসন্তী ও হলুদ রঙের সঙ্গে কমলা, লাল এবং নতুন পাতার সবুজ রংকেও বসন্তের রং ধরা হয়।

বসুন্ধরা শপিং মলের দেশী দশের আউটলেট ঘুরে চোখে পড়ল হলুদ, গোলাপি আর লাল রঙের মিশেলে তৈরি পোশাক। মেয়েরা একটু উজ্জ্বল রঙের শাড়ি পছন্দ করছেন বলেও জানালেন বিক্রেতারা। শাড়িজুড়ে এই যে রঙের বৈচিত্র্য, তার মধ্যে যেন বসন্তের আবেদনটা কোনোভাবেই না হারিয়ে যায়– শাড়ি কেনার সময় এটি মাথায় রাখার পরামর্শ দিলেন নিউএজ ফ্যাশনের বিক্রেতা আমিনুল হক।

যেহেতু শীতের শেষে প্রকৃতিতে মিষ্টি ফাগুনের হাওয়ার সঙ্গে হালকা গরমেরও ছোঁয়া থাকে। তাই এ সময় সুতি কাপড়কেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে এসব বাসন্তী পোশাকে। কটন, লিলেন, খাদি, ভয়েল এবং তাঁতের তৈরি বসন্তের পোশাক নিয়ে আসে বৈচিত্র্য। আর সাধারণত বসন্তের পোশাকের ডিজাইনে ফুলকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয় এবং প্রকৃতির বিভিন্ন মোটিফও ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এবারও এর ব্যতিক্রম নয়। বসন্ত উৎসবের রং হিসেবে বাসন্তী, হলুদ, কমলা, লাল, সাদা, লাইম গ্রিন উজ্জ্বল সব রংকে বেছে নিয়েছে বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজ। ব্লক প্রিন্টের শাড়িতে করা হয়েছে কাঁথা, চুমকি ও গ্লাসের কাজ। অনেক পোশাকে করা হয়েছে এমব্রয়ডারি, স্ক্রিনপ্রিন্টের কাজ।

আর ছেলেদের বসন্তের পাঞ্জাবিতে উইভিং কাপড়ের নকশাও বেশি। আছে বিভিন্ন রং মিশিয়ে তৈরি কটি। তাগা আউটলেট ঘুরে দেখা গেল বিভিন্ন রঙের পাঞ্জাবির ওপর উজ্জ্বল কটিতেই সাজিয়েছে তাদের ছেলেদের পোশাক। পাঞ্জাবির বাইরে অনেকে টি-শার্ট পরেও ঘোরাফেরা করেন বসন্তে। তাই টি-শার্টের নকশায়ও বসন্ত এসে গেছে। টি-শার্টে বাসন্তী রং তো আছেই।

বসন্তের পোশাক নিয়ে অঞ্জন’স এর স্বত্বাধিকারী শাহিন আহম্মেদ জানান, ছেলেদের জন্য পাঞ্জাবি, শার্ট, কটি, মেয়েদের জন্য শাড়ি, সালোয়ার কামিজ, টপস নিয়ে অঞ্জন’স এবারের বসন্ত আয়োজন করেছে। থিম হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে ফ্লোরাল ও জ্যামিতিক মোটিফ। হলুদ, কমলা, বাসন্তী, জলপাই ও সবুজ রং বেশি প্রাধান্য পেয়েছে এবারের বসন্তের আয়োজনে। ডিজাইনে বৈচিত্র্যের পাশাপশি পোশাকে উজ্জ্বল রং প্রাধান্য পেয়েছে। কাপড় হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে কটন, ভয়েল, লিলেন কটন ।

বসন্তের দিনটিকে আলাদা করে রাঙাতে ফ্যাশন হাউজ কে-ক্র্যাফট এর পোশাক সম্ভারে রয়েছে সালোয়ার-কামিজ, শাড়ি, টপ্‌স, কুর্তি, কটি, স্কার্ট-টপ্স, শার্ট, পাঞ্জাবি, টি-শার্ট ও শিশুদের জন্য থাকছে নানা পোশাকের আয়োজন। এছাড়াও সময়োপযোগী যুগল ও ফ্যামিলি পোশাকও রয়েছে। রং হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছে বাসন্তী, হলুদ, কমলা, ম্যাজেন্টা, গোল্ডেন ইয়েলো, মিষ্টি, লেমন ইয়েলো, অলিভসহ নানা রং। পোশাকের নকশায় পেয়েছে হাতের কাজ, এমব্রয়ডারি, স্ক্রিন ও ব্লকপ্রিন্ট কারচুপি এবং টাই-ডাই।

ফাল্গুনে নিপুণ ক্র্যাফটস নিয়ে এসেছে ফ্লোরাল মোটিফে তৈরি নতুন ডিজাইনের পোশাক। সাধারণত ফাল্গুনে হলুদ ব্যবহার থাকলেও এবার রং হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছে হলুদের নানা শেড, কমলা, সবুজ ও অফ হোয়াইট ইত্যাদি। আর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হয়েছে স্ক্রিনপ্রিন্ট, ব্লক, এমব্রয়ডারি। লিলেন, ভয়েল, ভিসকস, স্লাভ কটন।

ফাল্গুনের পোশাক নিয়ে ফ্যাশন হাউজ রঙ বাংলাদেশ এর স্বত্বাধিকারী ও ডিজাইনার সৌমিক দাস বলেন, গোল্ডেন হলুদ, কাঁচা হলুদ, কমলা, গেরুয়া, ম্যাজেন্টার সঙ্গে আরও সহকারী হিসেবে গাজর কমলা, টিয়া, সবুজ, নেভি ব্লু ও ফিরোজা রংকে প্রাধান্য দিয়েছি। ফ্লোরাল মোটিফেই প্রধান্য দেওয়া হয়েছে। সুতি, লিলেন, অ্যান্ডি সিল্ক, হাফ সিল্ক কাপড়ে পোশাকের নকশাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে নানা ভ্যালু অ্যাডেড মিডিয়ার ব্যবহারে। এর মধ্যে রয়েছে ব্লকপ্রিন্ট, স্ক্রিনপ্রিন্ট, হাতের কাজ, কারচুপি ইত্যাদি। মেয়েদের পোশাকের তালিকায় আছে শাড়ি, থ্রি-পিস, সিঙ্গেল কামিজ, টপস সেট, আনস্টিচ ড্রেস, পালাজ্জো, সিঙ্গেল ওড়না, ব্লাউজ। ছেলেদের পাঞ্জাবি, শার্ট, টি-শার্ট, কাতুয়া। বড়দের মতো ছোটদের পোশাকও রয়েছে। উৎসবের পরিপূর্ণতা দিতে পাবেন যুগল আর পরিবারের সবার জন্য একই থিমের পোশাক।

দেশীয় ফ্যাশন হাউজগুলো প্রতি বছরই বসন্তের রঙিন পোশাকের পসরা সাজায়। এ বছরও নানা রং, ডিজাইন আর মোটিফ নিয়ে বৈচিত্র্যময় পোশাকের আয়োজন করেছে হাউজগুলো। বিশ্ব রঙ, ইনফিনিটি, আড়ং, অঞ্জন’স, রঙ, বিবিয়ানা, কে-ক্র্যাফট, বাংলার মেলা, দেশাল ও নিপুণে পেয়ে যাবেন পছন্দের ফাল্গুনের পোশাক। এ ছাড়া বসুন্ধরা শপিং মল, যমুনা ফিউচার পার্ক, কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি, মৌচাক মার্কেট, ফরচুন শপিং মল এবং নিউ মার্কেট, গাউছিয়া, মিরপুর এক নম্বর মুক্তবাংলা মার্কেট ও দশ নম্বর শাহআলী মার্কেট থেকে বেছে নিতে পারেন বাসন্তী পোশাক।

দরদাম

শাড়ি ৭০০ থেকে ৬,০০০ টাকা, সিঙ্গেল কামিজ ৮০০ থেকে ২,৫০০ টাকা, থ্রি-পিস ২,০০০ থেকে ৪,৫০০ টাকা, আনস্টিচ ড্রেস ১,২০০ থেকে ৩,৫০০ টাকা, সিঙ্গেল ওড়না ৫০০ থেকে ১,৫০০ টাকা, টপস সেট ১৫০০ থেকে ২,৫০০ টাকা, সিঙ্গেল পালাজ্জো ৬০০ থেকে ১,০০০ টাকা। ছেলেদের পাঞ্জাবি ৮০০ থেকে ২,০০০ টাকা, কাতুয়া ৭০০ থেকে ১,৫০০ টাকা, শার্ট-৬০০ থেকে ১,৫০০ টাকা, টি-শার্ট ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা। ছোটদের পোশাক শাড়ি ৮০০ থেকে ২,০০০ টাকা, ফ্রক- ৬০০ থেকে ১,০০০ টাকা, কামিজ ৬০০ থেকে ১,০০০ টাকা, , স্কাট টপস ৬০০ থেকে ১,৫০০ টাকা। বাচ্চা ছেলেদের পোশাকের মধ্যে পাঞ্জাবি ৬০০ থেকে ১,০০০ টাকা, শার্ট ৪৫০ থেকে ৬৫০ টাকা, টি-শার্ট ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। সাজসজ্জা

কোন পোশাকে কেমন সাজবেন জানালেন এভারগ্রিন বিউটি পারলারের রূপবিশেষজ্ঞ নাহিদ আফরোজ তানি। তিনি জানালেন, ফাল্গুনের শাড়ি কিংবা সালোয়ার-কামিজের সঙ্গে মিলিয়ে এবার নিজেকে সাজিয়ে তুলুন। ফাল্গুনের দিনে মুখে ভারী মেকআপ না করাই ভালো। কারণ বেশিরভাগ সময় বাইরে থাকতে হয়। রোদ ও গরমে ভারী মেকআপে ত্বক নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই সেই দিনের মেকআপ হালকা হওয়া উচিত। প্রথমে মেকআপের আগে আপনার মুখ ফেসওয়াশ দিয়ে পরিষ্কার করে নিন। পরিষ্কার করার পর স্ক্রাবিং করুন। এরপর সানস্ক্রিন এবং ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন। এরপর প্রাইমার লাগান। ফাউন্ডেশনের আগে প্রাইমার অবশ্যই লাগাতে হবে। প্রাইমার সাধারণত আপনার সারা দিনের মেকআপকে ধরে রাখতে সাহায্য করবে। ত্বকের সঙ্গে মিলিয়ে ফাউন্ডেশন বেছে নিন। খেয়াল রাখবেন ফাউন্ডেশন বেশি না হয়। হালকা মেকআপের জন্য অল্প ফাউন্ডেশনই যথেষ্ট। সারা দিন বেশি ফ্রেশ দেখাতে সাহায্য করবে ক্রিম হাইলাইটিং ব্যবহার করলে। আপনার স্কিন শেডের থেকে দুই-তিন শেড লাইট কনসিলার দিয়ে করে নিন ক্রিম হাইলাইটিং। কনসিলারটি চোখের নিচে, কপালে, নাকের ওপর, থুঁতনিতে লাগিয়ে নিন এবং ব্লেন্ড করে ফেলুন। কনসিলারটি অবশ্যই পাউডার দিয়ে সেট করে নিন। এবার পুরো মুখ ফেসপাউডার দিয়ে ব্লাশার করুন। চোখের সাজে খেয়াল রাখুন যেন চোখের মেকআপেও স্নিগ্ধভাব ফুটে ওঠে। সেটা হিসেব করেই আইশ্যাডো লাগাবেন।

চড়া রংগুলো ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন। কোরাল, পিচ, কমলা, হলুদ, গোল্ডেন, কপার, লাইট ব্রাউন, লাইট পিংক, লাইট পার্পল, প্যারট গ্রিন কালারগুলো খুব ভালো মানিয়ে যাবে পহেলা ফাল্গুনে। বিশেষ করে শাড়ির সঙ্গে ম্যাচ করে দিন। দেখতে ভালো লাগবে।

আইশ্যাডো দেওয়া হয়ে গেলে অবশ্যই টানা করে আইলাইনার লাগাবেন। আপনি চাইলে ব্ল্যাক বা ভিন্ন কালারের কাজল এবং লাইনার ব্যবহার করতে পারেন। এটা আই মেকআপে নতুন রূপ নিয়ে আসবে। যেহেতু দিনের বেলার সাজ তাই চোখে আইল্যাশ না পরাই ভালো। বরং চোখের পাতাগুলোতে মাশকারা লাগিয়ে নিতে পারেন। এবার ঠোঁটের পালা। পহেলা ফাল্গুনে লিপস্টিক হিসেবে হালকা রংগুলোই পারফেক্ট মনে হয়। লাইট পিংক, ব্রাউন বা পিংক, অরেঞ্জ, পিচ, কোরাল ইত্যাদি কালারগুলো বেশ ভালো লাগবে দেখতে। সবচেয়ে ভালো আইশ্যাডো যে কালারে দিয়েছেন সেই কালারের লিপস্টিক দিন। কপালে ছোট গোল টিপ দেবেন। বসন্তের দিনে চুল খোঁপা করে বাঁধাই শ্রেয়। খোঁপাতে জারবেরা, গাঁদা কিংবা গোলাপ ফুল পরতে পারেন। এছাড়া কয়েক রঙের ফুলের মালাও খোঁপাতে পরতে পারেন। এছাড়া ফুলের গহনাও পরা যায়। গলায় কানে পাথরের টপ জাতীয় ছোট দুল পরতে পারেন। হাতে শাড়ির বা কামিজের সঙ্গে মিলিয়ে কাচের চুড়ি পরতে পারেন। এক কালারের পরবেন না।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য