মহান বিজয় দিবসে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় পতাকা বিকৃত করে প্রদর্শনের ঘটনায় মামলায় ১৯ শিক্ষক-কর্মকর্তার জামিন মঞ্জুর করেছেন আদালত। বৃহস্পতিবার (৪ ফেব্রুয়ারি) রংপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক ফজলে এলাহি তাদের জামিন মঞ্জুর করেন।

এর আগে কঠোর পুলিশি পাহারায় আসামিরা আদালতে আসেন। সম্ভাব্য গোলযোগের আশঙ্কায় আদালতের প্রবেশপথসহ বিভিন্ন স্থানে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। দুপুর পৌনে ১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হাফিজুর রহমান সেলিম, পরিমলচন্দ্র বর্মণ, তাবিউর রহমানসহ ১৯ আসামি আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন।

এ সময় বাদীপক্ষের আইনজীবী খন্দকার রফিক হাসনাইন জামিনের বিরোধিতা করে আদালতে বলেন, ‘৩০ লাখ মানুষকে হত্যা দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা। সেই স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকাকে আসামিরা শুধু বিকৃত করেননি বরং জাতীয় পতাকাকে পদদলিত করে মহান স্বাধীনতার প্রতি চরম অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন। তারা জামিন পেলে এরপর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জাতীয় পতাকার বদলে চাঁদ-তারা পতাকা তোলা হবে।’

অপর দিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী আব্দুল হক প্রামাণিক বলেন, ‘আসামিরা জাতীয় পতাকার অবমাননা করেননি আর অভিযোগ জামিনযোগ্য।’

বিচারক উভয়পক্ষের বক্তব্য শুনে জামিন মঞ্জুর করেন।

জামিন পাওয়া ১৯ আসামি হলেন– বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যাপক আর এম হাফিজুর রহমান, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাবিউর রহমান প্রধান, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক পরিমল চন্দ্র বর্মণ, মার্কেটিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাসুদ উল হাসান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রামপ্রসাদ বর্মণ, পরিসংখ্যান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রশিদুল ইসলাম, ভূগোল ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক শামীম হোসেন, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রভাষক রহমতউল্লাহ, রসায়ন বিভাগের প্রভাষক মোস্তফা কাইয়ুম শারাফাত, ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রভাষক সোহাগ আলী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক আবু সায়েদ, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কামরুজ্জামান, ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সদরুল ইসলাম সরকার, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক প্রদীপ কুমার সরকার, পরিসংখ্যান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শাহ জামান, অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মোরশেদ হোসেন, পরিসংখ্যান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক চার্লস ডারউইন, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নুর আলম সিদ্দিক এবং পরিসংখ্যান বিভাগের সেকশন অফিসার (গ্রেড-১) শুভঙ্কর।

উল্লেখ্য, মহান বিজয় দিবসে জাতীয় পতাকা বিকৃত করে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপিত স্বাধীনতা স্মারকে প্রদর্শন এবং সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রদর্শনের অভিযোগে মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ আসিফ ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি আরিফ বাদী হয়ে নগরীর তাজহাট থানায় দুটি পৃথক মামলা দায়ের করেন। এ ঘটনা জানাজানি হলে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সারাদেশে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। জড়িতদের বিচারের দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন সংগঠন। পরে এ ঘটনায় জেলা প্রশাসক আসিব আহসান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট গোলাম রব্বানীকে আহ্বায়ক এবং রংপুর মেট্রোপলিটান পুলিশের সহকারী কমিশনার শেখ মো. জিয়াহ আল মামুন ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সদরুল আলম দুলকে সদস্য করে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেন।

তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন, প্রত্যক্ষদর্শী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ছবিসহ অন্যান্য বিষয় তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘১৬ ডিসেম্বর ২০২০ মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে অবস্থিত স্বাধীনতা স্মারক চত্বরে জাতীয় পতাকার নকশা পরিবর্তন করে সবুজের ভিতর লাল বৃত্তের পরিবর্তে চার কোনা আকৃতির বিকৃত পতাকা দিয়ে কয়েকজন শিক্ষক-কর্মকর্তা কর্তৃক ছবি তোলার সত্যতা পাওয়া গেছে। যা জাতীয় পতাকা অবমাননার শামিল এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের পতাকা বিধিমালা, ১৯৭২-এর বিধি-৩-এর পরিপন্থী।’ তদন্ত প্রতিবেদনে জাতীয় পতাকা অবমাননার জন্য ১৯ জন শিক্ষক ও কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করা হয়।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য