সামসউদ্দীন চৌধুরী কালাম, পঞ্চগড় থেকেঃ দেশের তৃত্বীয় চা অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া পঞ্চগড়সহ উত্তরের কয়েকটি জেলায় সমতল ভূমির চা আবাদ চা শিল্পে নতুন করে আলো দেখাচ্ছে। এই অঞ্চলে প্রতিবছরই বাড়ছে চা আবাদী জমির পরিমান ও চা উৎপাদন। গত বছর চা উৎপাদনে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে এই অঞ্চলটি।

২০২০ সালের দেশজ মোট উৎপাদনের শতকরা ১২ ভাগ চা উৎপাদন করেছে পঞ্চগড়সহ উত্তরের জেলাগুলো। শীর্ষে থেকে মোট উৎপাদনের ৮২ ভাগ উৎপাদন করেছে সিলেট অঞ্চল এবং বাকী ৬ ভাগ উৎপাদন করছে চট্টগ্রাম অঞ্চল। পঞ্চগড় অঞ্চলের চেয়ে তিনগুন বেশি জমিতে চা আবাদ করলেও চট্টগ্রামকে পিছনে ফেলে উৎপাদনের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে চলে এসেছে পঞ্চগড় অঞ্চল। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই অঞ্চলে ১০ হাজার ১৭০ একর জমিতে চা চাষ হয়েছে। চা বোর্ডের সমীক্ষা অনুযায়ী পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও এবং পাশ্ববর্তি তিন জেলায় চা আবাদযোগ্য জমি রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার একর। চা আবাদযোগ্য এসব জমিতে চাষ হলে এই অঞ্চল থেকে প্রতি বছর ৫০ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদন করা সম্ভব।

চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী পঞ্চগড় জেলায় চা আবাদযোগ্য জমি রয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার একর। এর মধ্যে জেলার পাঁচ উপজেলায় বর্তমান পর্যন্ত চা আবাদ রয়েছে ৮ হাজার ৬৪২ একর জমিতে। এর মধ্যে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে ২৫টি চা বাগানে জমির পরিমান দুই হাজার ৩৬৬ একর। এছাড়া নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে ক্ষুদ্রায়তন ৬ হাজার ৪৯৮টি চা বাগানে জমি রয়েছে ৬ হাজার ২৭৫ একর। এসকল চা বাগান থেকে গত বছর চার কোটি ৬০ লাখ ৫১ হাজার ১৭৬ কেজি সবুজ চা পাতা থেকে ৯৮ লাখ ৯৭ হাজার ৭০ কেজি তৈরি চা উৎপাদন হয়েছে।

পার্শ্ববর্তি ঠাকুরগাঁও জেলায় চা আবাদযোগ্য জমি রয়েছে প্রায় ৫ হাজার একরের মত। এর মধ্যে জেলার পাঁচ উপজেলায় দুইটি বাগানসহ নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে ৬৫৯টি ক্ষুদ্রায়তন চা বাগানে এক হাজার ২৯৩ একর জমিতে চা চাষ হচ্ছে। গত বছর এসব বাগান থেকে ৪৫ লাখ ২৫ হাজার ৫০০ কেজি সবুজ চা পাতা থেকে চার লাখ ১৩ হাজার ৩৪০ কেজি তৈরি চার উৎপাদন হয়েছে।

এছাড়া লালমনিরহাট, দিনাজপুর ও নীলফামারী জেলায় চা আবাদযোগ্য প্রায় ১০ হাজার একর জমি রয়েছে। বর্তমানে লালমনিরহাট জেলার পাঁচ উপজেলায় ৯৭টি নিবন্ধিত ক্ষুদ্রায়তন চা বাগানে ১১৩ একর, নীলফামারী জেলার পাঁচ উপজেলায় ৩২টি নিবন্ধিত চা বাগানে ৬১ একর এবং দিনাজপুর জেলার পাঁচ উপজেলায় ২৬টি নিবন্ধিত ক্ষুদ্রায়তন চা বাগানে ৬১ দশমিক ৫০ একর জমিতে চাষ হচ্ছে। গত বছর পর্যন্ত এই তিন জেলার ১৫৫ টি ক্ষুদ্রায়তন চা বাগানে ২৩৫ দশমিক ৫৭ একর জমি থেকে সাত লাখ ছয় হাজার ৭১০ কেজি সবুজ চা পাতা উৎপাদিত হয়েছিল।

বাংলাদেশে যেহেতু জমির পরিমান কম তাই নতুন করে সিলেট ও চট্টগ্রামের মত বড় চা বাগান করার সম্ভাবনাও কম। তাই ছোট ছোট চা বাগানের আদলে আমাদেরকে চা বাগান তৈরী করতে হবে। তাতে জমি হাত বদলের মত প্রক্রিয়া থাকবে না এবং তা দারিদ্র বিমোচনে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। ক্ষুদ্র পরিসরে চা আবাদ করে অনেকদুর এগিয়েছে ভারত, শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া, কেনিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশ। জমি যার বাগান তার এই নীতিতে চা চাষ করে তারা আগের চেয়ে অনেক বেশী চা উৎপাদন করে দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়েছে তারা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই পদ্ধতিতে পঞ্চগড়ে চা চাষ শুরু হয় ২০০০ সালে। এরপর থেকে বেড়েই চলেছে পঞ্চগড়ে ক্ষুদ্রায়তনে চা বাগান। অনেকে বাড়ির পাশে পতিত পড়ে থাকা ৫ শতক জমিতেও চা চাষ করছে। এখন এই পদ্ধতিতে চা চাষ শুধুমাত্র পঞ্চগড়ে সীমাবদ্ধ নয়: পাশ্ববর্তি ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, লালমনিরহাট ও নীলফামারী জেলাতেও সমতল ভূমিতে চা চাষ হচ্ছে।

বাংলাদেশ স্মল টি গার্ডেন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আমিরুল হক খোকন বলেন, পঞ্চগড়সহ উত্তরের জেলাগুলোতে সমতল ভূমির চা চাষ ইতোমধ্যে দেশে চা উৎপাদনে আশার আলো দেখাচ্ছে। চা পাতার ন্যায্য মূল্য, সুলভে সেচ সুবিধা ও সার সরবরাহ নিশ্চিত হলে দিন দিন চায়ের চাষ ও উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। তিনি আরও বলেন, এতদিন চা আবাদযোগ্য জমিতে কৃষকরা আখ চাষ করত। কিন্তু চলতি বছর পঞ্চগড় চিনিকলে আখ মাড়াই বন্ধ থাকায় কৃষকরা আখ ক্ষেতে চা চাষ করবে। এতে করে চলতি বছরেই শুধুমাত্র পঞ্চগড় জেলাতেই চা আবাদ ১০ হাজার একর জমি পার হয়ে যাবে।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের পঞ্চগড় আঞ্চলিক কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও নর্দান বাংলাদেশ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মোহাম্মদ শামীম আল মামুন বলেন, সমতল ভূমিতে চা চাষের জন্য পঞ্চগড় ও এর পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এলাকা। দিন দিন উত্তরাঞ্চলে চা চাষ ও উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। চা চাষ সম্প্রসারণের জন্য বাংলাদেশ চা বোর্ড চাষিদের বিভিন্ন সহায়তার মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করছে। চাষিদের স্বল্পমূল্যে উন্নত জাতের চারা সরবরাহ করা হচ্ছে। চাষিদের নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ‘ক্যামেলিয়া খোলা আকাশ স্কুলে’ হাতে কলমে কর্মশালা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

চাষিদের বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সমাধান দিতে ইতিমধ্যে ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’ নামে একটি মোবাইল অ্যাপস চালু করা হয়েছে। এ আঞ্চলিক কার্যালয়ে একটি পেস্ট ম্যানেজমেন্ট ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হয়েছে। যেখানে চা চাষিদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান, চাষের নানান রোগবালাই ও পোকা দমনে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সহায়তা দেওয়া হয়। এ বছর ক্ষুদ্র চাষিরা তাঁদের বাগানের উৎপাদিত কাঁচা পাতার ন্যায্যমূল্য পাওয়ায় তাঁরা চা চাষে উৎসাহিত হয়েছে, চা বোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ী বাগানের যতœ নিয়েছে।

এছাড়াও পাতার দাম ভাল পাওয়ায় নতুন নতুন চা আবাদীও বাড়ছে। এতে উত্তরাঞ্চলের জেলা সমূহের মানুষের যেমন একদিকে দারিদ্র বিমোচন ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন হয়েছে তেমনি প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য