চারদিকে বরফ, ঠাণ্ডায় জমে যাওয়ার অবস্থা, তার মধ্যেই বসনিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর বিহাকের পরিত্যক্ত বিভিন্ন ভবনে আশ্রয় নিয়ে আছেন শত শত শরণার্থী, তারা অপেক্ষায় আছেন, হয়ত কোনো এক সময় সীমান্ত পেরিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশ ক্রোয়েশিয়ায় ঢুকে পড়ার সুযোগ মিলে যাবে।

ইউরোপের ধনী দেশগুলোতে পৌঁছানোর চেষ্টায় থাকা এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য আর উত্তর আফ্রিকার শরণার্থীদের জন্য ২০১৮ সালের পর থেকে বসনিয়া হয়ে উঠেছে সীমান্ত পার হওয়ার ‘ট্রানজিট রুট’।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের সীমান্ত পার হওয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠেছে। আর জাতিগত দ্বন্দ্বে বিভক্ত দারিদ্র্যপীড়িত বসনিয়া সরকারের এই সঙ্কট সামাল দেওয়ার মত অবস্থা নেই। ফলে বহু মানুষের জন্য সেখানে আশ্রয়ের ব্যবস্থাও করা যায়নি।

আফগানিস্তান থেকে আসা ১৬ বছরের আলীর আশ্রয় হয়ে উঠেছে পরিত্যক্ত একটি বাস; বিহাকের শরণার্থী ক্যাম্প ছাড়ার পর গত ছয় মাস ধরে ওই বাসেই সে ঘুমায়।

রয়টার্সকে তিনি বলেন, “আমার অবস্থা আসলে ভালো না। এখানে আমাদের দেখার কেউ নেউ। এ জায়গা মোটেও নিরাপদ না।

“যারা সাহায্য করার নাম করে আমাদের এখানে আসে, তারা আমাদের জিনিসপত্র নিয়ে যায়, তারপর সেসব জিনিস বিহাকের শরণার্থী ক্যাম্পে, নয়ত অন্য কোথাও বিক্রি করে দেয়। এখানে আমাদের আর কিছুই নেই,… প্লিজ, আমাদের সাহায্য করুন।”

এ মুহূর্তে বিভিন্ন দেশের আট হাজারের মত শরণার্থী বসনিয়ায় আশ্রয় নিয়ে আছেন। তাদের মধ্যে সাড়ে ছয় হাজারের ঠাঁই হয়েছে রাজধানী সারাজেভো এবং ক্রোয়েশিয়া সীমান্ত লাগোয়া বসনিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় বিভিন্ন ক্যাম্পে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেল সোমবার বসনিয়ার প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে থাকা সার্ব নেতা মিলোরাদ দোদিকের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। তিনি শরণার্থীদের আরো বেশি মানবিক সহায়তা দিতে আরো বেশি আশ্রয়কেন্দ্র খোলার কথা বলেন।

এই শরণার্থীদের একটি বড় অংশ এসেছে বিভিন্ন মুসলমান প্রধান দেশ থেকে। বসনিয়ার সার্ব ও ক্রোয়েট অধ্যুষিত এলাকা তাদের আশ্রয় দিতে রাজি নয়।

বোরেলের অফিসের এক বিবৃতিতে বলা হয়, এই শরণার্থীদের মানবিক সহায়তা দিতে ব্যর্থ হলে তা বসনিয়া-হার্জেগোভিনার ভাবমূর্তির জন্য ভালো কিছু হবে না।

বসনিয়ার শরণার্থী ক্যাম্পগুলো পরিচালনার দায়িত্বে থাকা আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) বলেছে, তাদের ভ্রাম্যমাণ টিম বিহাক সীমান্তের কাছে নব্বইয়ের দশকের যুদ্ধে বিধ্বস্ত ও পরিত্যক্ত বিভিন্ন ভবনে আশ্রয় নিয়ে থাকা হাজার খানেক শরণার্থীকে সাহায্য দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

তবে তাদের নিয়মিত খাবার দেওয়া যাচ্ছে না, সেখানে চিকিৎসা সেবারও সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন আইওএম এর ক্যাম্প ম্যানেজার ও সমন্বয়ক নাতাশা ওমেরোভিক।

গত সপ্তাহেই ২৬ কিলোমিটার দূরে লিপা সামার ক্যাম্পে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হলে প্রায় ৯০০ শরণার্থী এই শীতের মধ্যে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েন।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই শরণার্থীদের অন্য কোথাও সরিয়ে নিতে বহু আগে থেকে আহ্বান জানিয়ে এলেও বসনিয়া কর্তৃপক্ষ এতদিন তাতে সাড়া দেয়নি। এখন তারা ওই শরণার্থীদের জন্য তাঁবুর ব্যবস্থা করছে।

রোববার সন্ধ্যায় বিহাকের একটি পরিত্যক্ত ভবনে আশ্রয় পাওয়া একদল শরণার্থীকে আগুন জ্বেলে রাতের জন্য রান্না করা কিছু খাবার খেতে দেখা যায়।

বাইরে তুষারপাত হচ্ছে, অথচ তাদের অনেকের পায়ে দেখা গেল কেবল প্লাস্টিকের স্লিপার। পরিত্যক্ত ওই ভবনের নোঙরা কংক্রিটের মেঝের ওপরই তাদের ঘুমাতে হয়।

শাহবাজ খান নামে আফগানিস্তানের এক নাগরিক বললেন, “জীবন এখানে বড়ই কঠিন।”

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য