মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে গুরুতর আহত হন বীর প্রতীক মতিউর রহমান (৮০)। দেশ স্বাধীনের ৪৯ বছর পরেও তার ভাগ্যে জোটেনি ভাতার টাকা। তিনি নীলফামারী সৈয়দপুর উপজেলার কাশিরাম বেলপুকুর ইউনিয়নের পূর্ব বেলপুকুর গ্রামের মৃত্যু ফজলার রহমানের ছেলে।
তার বাংলাদেশ গেজেট নং-১৯৪, লাল বই ও মুক্তি বার্তা নাম্বার-০৩১৫০৪০০৫৬ আর ভারতীয় তালিকায় মুক্তিযোদ্ধা নং ৪১২০২।

তিনি ১৯৪৭ সালের ১২ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। এরপর ১৯৬২ সালের ২ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান আর্মিতে যোগ দেন। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ দেশে (তিন মাসের) ছুটিতে আসেন। ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল ভারতের ভারতের দেওয়ানগঞ্জ ক্যাম্পে গিয়ে যোগদান করেন।

তার শরীর আর মুখমণ্ডল যুদ্ধকালীন পাক সেনাদের গুলির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত। সেই ক্ষত চিহ্ন নিয়ে শেষ বয়সে ভাতার জন্য জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের নেতৃবৃন্দসহ উপজেলা প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কারও কাছ থেকে কোন প্রকার সহযোগিতা না পেয়ে অত্যন্ত মর্মাহত তিনি।

তিনি জানান, ১৯৭১ সালে ৬ নং সেক্টরের সাব সেক্টর-৬ এর অধীনে ৩ বি বি কোম্পানির অধিনায়ক হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। তৎকালীন পঞ্চগড় মহকুমার পূর্বদিকে বড়শশী কাজল দীঘি ইউনিয়ন এলাকায় যুদ্ধ করেন তিনি। ৭১ এর জুন থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১১৮ টি যুদ্ধে অপারেশন পরিচালনা করে সফল হন। এর মধ্যে ২৯ নভেম্বর পঞ্চগড় মহকুমাকে স্বাধীন ঘোষণা করেন সাব সেক্টর কমান্ডার স্কোয়াড্রন লিডার সদর উদ্দিন। এদিন বিকাল ৪টার দিকে এসডিও অফিস বর্তমানে ডিসি অফিস প্রাঙ্গণে মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলার জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন।

তিনি মুক্তিযুদ্ধের ভয়াল স্মৃতি বর্ণনাকালে বলেন, বড়শশী কাজল দীঘি ইউনিয়ন এলাকায় পাকবাহিনীর আস্তানায় গ্রেনেড নিক্ষেপের সময় পাল্টা পাক বাহিনীর আর্টিলারি সেল এর স্প্লিন্টারের আঘাতে মুখমণ্ডল ক্ষত বিক্ষত হয়। আহতাবস্থায় জলপাইগুড়ি হাসপাতালে ১৩ দিন চিকিৎসা নিয়ে আবারও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। পঞ্চগড়ের পূর্বদিকের তালমা এলাকায় ব্রিজ গুড়িয়ে দেওয়ার সময় পাক বাহিনীর রাইফেলের গুলি তার পিঠের বাঁপাশ ঝাঁঝরা করে দেয়। যুদ্ধাহতাবস্থায় ৩ জন পাক সেনাকে আটক করে ক্যাম্পে আনেন এবং ইন্ডিয়ান আর্মির সহায়তায় জলপাইগুড়ি জেলখানায় পাঠানো হয়।

জলপাইগুড়ি আলীদুয়ার ডাঙ্গী শরণার্থী ক্যাম্প হাসপাতালে ৪ থেকে ৮ তারিখ পর্যন্ত চিকিৎসার পরে সুস্থ হয়ে আবারও ফিরে যান রণাঙ্গনে। পঞ্চগড় ওকড়াবাড়ী বাজার এলাকায় পাকবাহিনীর দুইজন সদস্য ও ৬ জন রাজাকার একজন বাঙালি যুবতীকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার সময় ১ নং প্লাটুনের মুক্তিযোদ্ধাসহ তাদের আটক করা হয়। রাজাকাররা পালিয়ে গেলেও ওই দুইজন পাকসেনাদের ইন্ডিয়ান আর্মির হাতে সোপর্দ করা হয়। ওই সময় পাকবাহিনীর গুলিতে ডান পায়ের উরুতে গুলি লাগে। গুরুত্বর আহতাবস্থায় শিলিগুড়ি সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে আবারও ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে।

বীর প্রতীক মতিউর রহমান আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, যুদ্ধে এত অবদান রাখায় আমাকে বীর প্রতীক উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এরপরও যুদ্ধাহত ভাতা প্রাপ্তিতে ভোগান্তিতে পড়েছি। ১৯৯৫ সাল থেকে ২০০৯ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর যুদ্ধাহত ভাতার জন্য আবেদন করেছি। পরবর্তীতে ২০১২ সালের ২৫ জুলাই পুরায় আবেদন করি।

মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টে যুদ্ধাহত ভাতা পাওয়ার জন্য বার বার আবেদন করেও কোনও লাভ হয়নি। এমনকি প্রধানমন্ত্রী বরাবরেও ২০১৯ সালের ২৪ নভেম্বর আবেদন করেও এখন পর্যন্ত কোন সুফল পাইনি।

সৈয়দপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের সাবেক কমান্ডার একরামুল হক বলেন, যথা নিয়মে বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান (বীর প্রতীক) যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার ভাতার জন্য আবেদন করেছেন। অন্যরা পেলেও তিনি কী কারণে এখনও পাননি তা আমার জানা নেই। তবে তার ভাতাটা দ্রুত দেওয়া উচিত। তথ্যঃ বাংলা ট্রিবিউন

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য