ভারতের প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের লেখা আত্মজীবনীর শেষ পর্ব ‘দ্য প্রেসিডেন্সিয়াল ইয়ারস’ এর প্রকাশ নিয়ে প্রকাশ্যেই টুইটারে ঝগড়ায় জড়ালেন তার ছেলে অভিজিৎ এবং মেয়ে শর্মিষ্ঠা।

একজন চান, তার অনুমতি ছাড়া এ বই যেন প্রকাশিত না হয়। অন্যজন চান, কোনও বিতর্ক ছাড়াই বাবার লেখা শেষ বইটি প্রকাশিত হোক।

‘দ্য প্রেসিডেন্সিয়াল ইয়ারস’ এখনও প্রকাশ না পেলেও সেই স্মৃতিকথার কিছু অংশ সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে; যা নিয়ে ভারতের রাজনৈতিক মহলে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছে।

সেই বিতর্কের আঁচ লেগেছে প্রণব পরিবারেও। বাবার বই নিয়ে ছেলে-মেয়ের প্রকাশ্য ঝগড়ায় ঘনিয়েছে গৃহবিবাদের কালো মেঘ।

মঙ্গলবার এক টুইটে প্রণবের ছেলে অভিজিৎ বলেন, এখনও পর্যন্ত অপ্রকাশিত ‘দ্য প্রেসিডেন্সিয়াল মেমোয়ার্স’-এর পাণ্ডুলিপি তিনি নিজে খতিয়ে দেখতে চান। ওই আত্মকথা বই হিসেবে প্রকাশ বা সেটির কোনও অংশবিশেষ কোথাও প্রকাশ করার আগে তার লিখিত অনুমতি নেওয়া জরুরি।

অভিজিতের দাবি, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কেবলমাত্র কয়েকটি সংবাদ মাধ্যমে পাণ্ডুলিপির সারাংশ প্রকাশ করা হয়েছে।

এর কয়েকঘণ্টার মধ্যেই ভাইয়ের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করে টুইটারে প্রণবের মেয়ে শর্মিষ্ঠা লেখেন, ‘সস্তা প্রচারের জন্যই’ বাবার আত্মকথা প্রকাশে ‘অহেতুক বাধা’ সৃষ্টি করছেন অভিজিৎ।

কী আছে প্রণবের আত্মকথায়? যা এমনকী তার দুই ছেলে-মেয়েকে পর্যন্ত মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে?

ভারতের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের দাবি, প্রণবের বইয়ের অপ্রকাশিত ওই অংশে ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবির জন্য সোনিয়া গান্ধী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহকে দায়ী করা হয়েছে।

তাছাড়া, মনমোহন এবং নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে তুলনামূলক বিচারের মত একাধিক বিতর্কিত বিষয়ও প্রণব বইয়ে তুলে ধরেছেন। স্বাভাবিকভাবেই প্রণবের সেই মত ঘিরে দেশটির রাজনীতিতে ঝড় উঠেছে।

মঙ্গলবার কংগ্রেস নেতা এবং সাবেক সাংসদ অভিজিৎ বাবার বই নিয়ে একাধিক টুইট করেন। একটি টুইটে তিনি লেখেন, ‘‘কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে আমার লিখিত অনুমতি ছাড়াই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ওই সারাংশ ছাপা হয়েছে। লেখকের ছেলে হিসেবে আমার অনুরোধ, দয়া করে বইয়ের প্রকাশনা বন্ধ করুন।”

আরেক টুইটে তিনি লেখেন, ‘‘যেহেতু বাবা আর বেঁচে নেই। তাই তার ছেলে হিসেবে আমি ওই বইয়ের প্রকাশনার আগে তার খসড়া খতিয়ে দেখতে চাই। বাবা বেঁচে থাকলে তিনিও তাই করতেন।“

‘‘খসড়া দেখা না পর্যন্ত আমার লিখিত অনুমতি ছাড়া এই বইয়ের প্রকাশনা অবিলম্বে বন্ধ রাখার অনুরোধ করছি। এ বিষয়ে একটি সবিস্তার চিঠি আপনাদের পাঠানো হয়েছে। শিগগিরই তা হাতে পাবেন।”

ভাইয়ের এই টুইটের জবাবে বোন শর্মিষ্ঠার টুইট, ‘‘শেষ খসড়ায় আমার ‍বাবার হাতে লেখা নোট এবং মন্তব্য ছিল, ওই মতোই সব হয়েছে।”

‘‘লেখকের মেয়ে হিসেবে দাদাকে অনুরোধ, বাবার লেখা শেষ বই প্রকাশে অহেতুক বাধা তৈরি করবেন না। অসুস্থ হওয়ার আগেই ওই বইয়ের পাণ্ডুলিপি শেষ করেছিলেন তিনি (প্রণব)।”

বাথরুমে পড়ে গিয়ে মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বাঁধার পর তিন সপ্তাহ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থেকে গত ৩১ অগাস্ট মারা যান প্রণব মুখোপাধ্যায়।

আত্মকথায় প্রণব ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবির প্রসঙ্গে যা বলেছেন তা একান্তই তার নিজস্ব মত উল্লেখ করে শর্মিষ্ঠা আরও লেখেন, ‘‘যে মতামত তিনি প্রকাশ করেছেন তা তার নিজস্ব। এ নিয়ে সস্তা প্রচারের উদ্দেশ্যে বইয়ের প্রকাশনা বন্ধ করার চেষ্টা করা উচিত না। এতে প্রয়াত বাবাকে অশ্রদ্ধাই করা হবে।”

ভাইয়ের সঙ্গে অমত প্রকাশের পাশাপাশি ভাইয়ের ভুলও ধরিয়ে দিয়েছেন শর্মিষ্ঠা। টুইটে তিনি বলেছেন, ‘‘প্রসঙ্গত দাদা, বইয়ের নাম ‘দ্য প্র্রেসিডেন্সিয়াল ইয়ারস’, ‘দ্য প্রেসিডেন্সিয়াল মেমোয়ার্স’ নয়।”

কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজার জানায়, রাজনৈতিক জীবন নিয়ে আত্মজীবনীমূলক বইয়ের সিরিজে প্রণবের শেষ লেখা বই ‘দ্য পেসিডেন্সিয়াল ইয়ারস’।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ওই বইয়ের অংশবিশেষ উল্লেখ করে বলা হয়, ‘‘কংগ্রেসের কয়েক জন সদস্য তত্ত্বগত ভাবে মনে করেন যে, ২০০৪ সালে আমি প্রধানমন্ত্রী হলে ২০১৪ সালের লোকসভায় ভরাডুবির হাত থেকে বেঁচে যেত দল। যদিও আমি তা মনে করি না।”

“আমার মতে, প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরই দলীয় নেতৃত্ব রাজনৈতিক লক্ষ্য হারিয়েছিল। এক দিকে, সোনিয়া গান্ধী দল চালাতে অপারগ ছিলেন। অন্য দিকে, সংসদে দীর্ঘদিন অনুপস্থিতির কারণে সংসদদের থেকে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ঘুচে গিয়েছিল।”

বইটি প্রকাশ করা নিয়ে প্রণবের পরিবারে বিবাদের যে আবহ দেখা যাচ্ছে, তা নজিরবিহীন বলেই মনে করছেন অনেকে। সব বাধা পেরিয়ে বইটি এখন মুক্তি পায় কিনা, সেটিই দেখার বিষয়।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য