বুক ভরা আশা নিয়ে শীতকালীন সবজি মুলার আবাদ করেছিলেন কৃষক হামিদুল মিয়া। কিন্তু তার সেই মনের আশা আর পূরন হয়নি। এখন সেই মুলাথই তার গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রেতার অভাবে জমি ফাঁকা করতে পারছেন না। আর জমি ফাঁকা করতে না পারলে, পরবর্তীতে আবাদ হিসেবে আলুও রোপনও দেরি হয়ে যাচ্ছে। শেষে মুলা ক্ষেত পরিস্কারের স্বার্থে (জমি ফাঁকা করবেন) ফ্রিতে দিয়েছেন এক পাইকারকে সেই মুলা। পাচঁ মন মুলা বিক্রি করে এক কেজি চাল কেনা যাচ্ছে না। এভাবেই আদিতমারী উপজেলার কমলাবাড়ি গ্রামের কৃষক হামিদুল মিয়া তার কষ্টগাঁথার সেই কথাগুলা এভাবেই বলছিলেন।

লালমনিরহাট জেলা কৃষি বিভাগ জানায়, জেলার পাঁচ উপজলায় চলতি মৌসুম আলু ছাড়াও বিভিন্ন শাকসব্জি চাষে ছয় হাজার ৪০০ হক্টর জমি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়ছে। এর মধ্যে ঠিক কত পরিমান জমিতে মুলা চাষ হয়েছে এর সঠিক পরিসংখ্যান জানাতে পারেনি বিভাগটি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লালমনিরহাট সদর উপজেলার বড়বাড়ি ও মোগলহাট, আদিতমারীর সারপুকুর, কমলাবাড়ি, ভেলাবাড়ি ও দুর্গাপুর, কালীগঞ্জের গোড়ল ও চলবলা এবং পাটগ্রামের বাউরা, জগতবেড়, কুচলিবাড়ি ও জোংড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে প্রচুর পরিমাণ সবজি চাষ হয়ে থাকে। এর মধ্যে মুলাও আছে। তবে জেলার সবচেয়ে বেশি পরিমাণ সবজি চাষ হয় আদিতমারী ও পাটগ্রাম উপজলার বিভিন্ন এলাকায়। এবার ওই উপজেলা দুটিতে অন্যান্য সবজির সাথে মুলা চাষ হয়েছে ব্যাপক হারে।

মৌসুমের শুরুতে লালমনিরহাটের স্থানীয় খুচরা বাজারগুলোতে প্রতি কেজি মুলা বিক্রি হয়েছে প্রকার ভেদে ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে। কোথাও কোথাও ৭০-৮০ টাকা দামেও কেজিতে বিক্রি হয়েছে। বর্তমান খুচরা বাজারেও বিক্রি হচ্ছে সর্বােচ্চ দুই থেকে তিন টাকা কেজি দরে। আর কৃষকের মাঠ বর্তমান পাইকারি দরে প্রতি মন (৪০কজি) ১০ থেকে ২০ টাকা দরে। এই অবস্থায় জেলার অনেক মুলা চাষি ক্ষেত থেকে মুলা তুলতে শ্রমিকের খরচ জোগাতে না পেরে গবাদিপশু দিয়ে নষ্ট করে ফেলছেন একরের পর একর মুলার ক্ষেত। অনেকে আবার ভুট্টা চাষের জন্য ট্রাক্টর দিয়ে চাষ করে মুলাক্ষেত নষ্ট করছেন। কৃষকরা বলছেন, আগাম মুলা নষ্ট হয়েছে অতিবৃষ্টি-বন্যায়। দ্বিতীয় দফায় ফসলটি লাগানোর পর এখন তারা দাম না পেয়ে চরমভাবে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। গত দুই দিন লালমনিরহাটর আদিতমারী ও সদর উপজেলা সরেজমিন ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে।

আদিতমারী উপজেলার সারপুকুর ইউনিয়নের কৃষক আজাহার আলী (৫২), একই এলাকার ধীরদ্র নাথ (৫৫) কমলাবাড়ি ইউনিয়নের কৃষক বচু মিয়া, জিয়াব উদ্দিন, জয়নাল হকসহ আরো অনেক কৃষককের সাথে কথা হলে তারা জানান, শেষ সময় এসে মুলা নিয়ে তারা চরম বেকায়দায় রয়েছেন। এ সময় তারা বলেন, প্রতি দোন জমির (২৭ শতক) মুলা ১ হাজার টাকায় বিক্রি করত বাধ্য হচ্ছেন। কারণ হিসেবে তারা বলেন, প্রথমত ক্রেতার অভাব আর দ্বিতীয়ত পরবর্তীতে আবাদের সময় ফুরিয়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতে পড়তে হয়েছে।

কৃষক আজাহার আলী বলেন, ব্যবসায়ীরা নিজেরাই জমি থেকে মুলা তুলে নিয়ে যাচ্ছেন। জমিতে আলু লাগানোর সময় ফুরিয়ে আসায় ব্যবসায়ীরা একেবারে ফ্রিতে মুলা তুলে নিয়ে যাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ একপ্রকার পানির দরে বিক্রি না করে নিজেদের গবাদী পশুকে দিয়ে খাইয়ে নিজেদের ফসল নষ্ট করছেন।

পাটগ্রাম উপজেলার বাউরা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী গ্রাম নবীনগর (ডাঙ্গাটারি)। গত মঙ্গলবার (১ ডিসেম্বর) বিকেলেে সখান গিয়ে দেখা গেছে, লাভের আশায় চাষ করা তাদের মুলা এখন যেন কৃষকের গলার কাঁটা হয়ে দাড়িয়েছে। এ সময় ওই এলাকায় দেখা গেল, তরতাজা একটি মুলাক্ষেত ট্রাক্টর দিয়ে চাষ করে নষ্ট করা হচ্ছে। সেটির কারণ জানতে চাইলে কৃষক রেজাউল করিম সবুজ বলেন, প্রথমবার লাগানো মুলাক্ষত নষ্ট হয়েছে বৃষ্টি-বন্যায়। দ্বিতীয়বার লাগানো মুলা যখন তরতাজা তখন আর বাজারে মুলার দাম নেই। এদিকে ভুট্টা লাগানোরও সময় চলে এসেছে। তাই বাধ্য হয়ে মুলাক্ষেত নষ্ট করে জমি তৈরি করছি। ওই কৃষক আরও জানান, তিনি প্রথম দফায় ৪৫ হাজার টাকা খরচ করে এবার ১০ বিঘা জমিতে মুলা লাগিয়েছিলেনে কিন্তু তা নষ্ট হয়েছে বৃষ্টির কারণে। পরে আবারও একই জমিতে ৫০ হাজার টাকা খরচ করে মুলা লাগিয়েছিলেন। শুধু তিনিই নন নবীনগর (ডাঙ্গাটারি) এলাকার কৃষক আসাদুজামান ও তার ভাই হাবিবুর, আবদুর রহিমসহ অনকেরই একই অবস্থা। শুধু ওই গ্রামটিতে নয়, পাটগ্রামের সবজি চাষাবাদের জন্য বিখ্যাত অন্যান্য গ্রামও মুলা নিয়ে চলছে অনকটাই একই অবস্থা।

কৃষকরা জানিয়ছেন, বতর্মান মুলার ক্ষেত প্রতি মন (৪০কজি) মুলা বিক্রি হচ্ছে ১০ থেকে ১৫ টাকায়। প্রথমবার লাগানা বষ্টির কারণে মুলার গাছ সম্পুর্ন নষ্ট হয়ে যায়। বৃষ্টি শেষে সবাই একসাথে আবারো মুলা চাষ করায় একসাথেই ফসল উঠেছে ফলে একেবারে দাম নেই। দাম আর বাড়ারও কোন লক্ষন নেই। বিভিন্ন ভাবে মুলাক্ষেত নষ্ট করার কারণ সম্পর্ক কৃষকরা জানিয়েছেন, ভুট্টা চাষের সময় একবার চলে এসেছে তাই বসে না থেকে ক্ষেতেই মুলা নষ্ট করে ভুট্টাচাষের জন্য জমি তৈরি করা হচ্ছে।

পাটগ্রাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল গাফফার জানান, চলতি রবি মৌসুমে প্রতি ৬০ হেক্টর জমিতে মুলার চাষ হয়েছে ওই উপজেলায়। তবে বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাস্তবে এর চেয়েও অনেক বেশি পরিমাণ জমিতে মুলা চাষাবাদ হয়েছে।

এদিকে জেলার পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জসহ বিভিন্ন বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব বাজারে প্রতি কেজি মুলা বিক্রি হচ্ছে সর্বাচ্চ তিন থেকে চার টাকায়। কোনো কোনো হাটে আবার বেগুনের সাথে বিনামূল্যেও দেওয়া হচ্ছে মুলা।

আদিতমারী উপজেলার কুমড়িহাট এলাকার পাইকারী ব্যাপারী নজরুল ইসলাম বলেন, বছরের শুরুতে মুলার ব্যবসায় যথেষ্ট পরিমান লাভ হলেও বর্তমান ট্রাকের ভাড়া উঠানোই কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আরও বলেন, গত রোববার কুমিল্লার মিনসায় এক ট্রাক মুলা নিয়ে গিয়ে ক্রেতা না পাওয়ায় সেই মুলা ফেলে দিয়ে এসেছেন। এতে তার ট্রাক ভাড়ার ৪০ হাজার টাকাই নিজের পকেট থেকে দিতে হয়েছে।

লালমনিরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরর উপ-পরিচালক মাঃ শামীম আশরাফ বলেন, প্রায় একই মৌসুম একই সাথে সব চাষি এক একটি ফসল চাষাবাদ শুরু করলে বাজারে চাহিদা কম থাকায় দরপতন হয়। মুলার ক্ষেত্রেও এবার সেটাই হয়েছে। ফল চাষের আগে বাজারের চাহিদা কৃষকদেরই নির্ধারণ করতে হবে। তাই বুঝে শুনেই ও বাজারের চাহিদা দেখে যেকোনো ফসল চাষ করলে ভাল দাম পাওয়া যাবে বলে জানান তিনি।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য