উহানে করোনা মহামারির একেবারে শুরুর দিনগুলো চীন কিভাবে মোকাবিলা করেছিল সে সংক্রান্ত নতুন একটি গোপন নথি প্রকাশিত হয়েছে। দ্য উহান ফাইলস শিরোনামের ১১৭ পৃষ্ঠার বিশদ ওই অভ্যন্তরীণ নথিটি হাতে পেয়েছে সংবাদমাধ্যম সিএনএন। ফাঁস হওয়া ওই নথিটিতে উঠে এসেছে, করোনা ঢেউয়ের একেবারে প্রথম দিকে চীনা কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনার চিত্র। এতে বলা হয়েছে, প্রথম দিকে নতুন করে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লেগেছে।

হুবেই প্রদেশের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা কিভাবে ভাইরাসটি প্রথম শনাক্ত করেছিলেন, ধারাবাহিক তহবিল স্বল্পতা কিভাবে তদের কাজে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছিল, সংশ্লিষ্ট কর্মীদের কাজ ও পরীক্ষা সরঞ্জাম সংক্রান্ত নানা তথ্য উঠে এসেছে এ প্রতিবেদনে।

কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশন্স-এর সিনিয়র ফেলো ইয়ানজং হুয়াং বলেন, এটি স্পষ্ট যে, তারা ভুল করেছে। এটি শুধু কোনও নভেল ভাইরাস নিয়ে কাজ করতে গিয়ে সংঘটিত ভুলই নয়; বরং তারা যেভাবে কাজ করেছে সেখানে আমলাতান্ত্রিক এবং রাজনৈতিকভাবে অনুপ্রাণিত ত্রুটি ছিল।

উহানে কোভিড-১৯-এর প্রকোপ শুরু হওয়ার সময় কর্মকর্তারা কী জানতেন এবং তারা প্রকাশ্যে কী বলেছিলেন এ দুইয়ের মধ্যকার নানা অসঙ্গতিও উঠে এসেছে হুবেই-র প্রাদেশিক রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের এসব গোপন নথিতে।

ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংক্রামক রোগের অধ্যাপক উইলিয়াম শ্যাফনার বলেন, কর্মকর্তাদের ধারণা ছিল যে কোনও মুহুর্তে মহামারীটির প্রভাব কমে যেতে পারে। ফলে তখন তারা মোট আক্রান্তের কোনও তালিকা তৈরি করেনি।

‌‘অভ্যন্তরীণ নথি, দয়া করে গোপনীয়তা রক্ষা করুন’ এমন মার্ক করা ওই নথিতে দেখা হয়েছে, ২০২০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা পাঁচ হাজার ৯১৮টি নতুন সংক্রমণের কথা জানিয়েছিলেন। অথচ কর্তৃপক্ষ তখন জনসমক্ষে মোট শনাক্তের সংখ্যা দেখিয়েছিল দুই হাজার ৪৭৮। অর্থাৎ নিশ্চিতভাবে আক্রান্তের যে সংখ্যা প্রকাশ্যে তার অর্ধেকেরও কম দেখিয়েছিল চীনা কর্তৃপক্ষ।

জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের চীন স্টাডিজ প্রোগ্রামের পরিচালক অ্যান্ড্রু মের্থা বলেন, চীন বাইরের দুনিয়ায় তার ইমেজ রক্ষার ওপর জোর দিয়েছে। করোনা আক্রান্তদের সংখ্যা কম দেখানোর ক্ষেত্রে নিচের পর্যায়ের কর্মকর্তাদের উৎসাহ ছিল স্পষ্ট। অথবা ঊর্ধ্বতনদের তারা দেখাতে চাইতো যে, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে কম রিপোর্ট করছে।

ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি নাগাদ কর্মকর্তারা তাদের সিস্টেমের উন্নয়ন করেন। হুবেই-এর স্বাস্থ্য বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করা হয়; যারা এসবের জন্য দায়ী ছিল।

ফাঁস হওয়া নথিতে বলা হয়, প্রাদুর্ভাবের প্রথম কয়েক মাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে গড়ে ২৩.২ দিন সময় লেগেছিল। ফলে সরকারের জন্য শনাক্তের নিয়মিত আপডেট না দিয়ে পুরনো সংখ্যা প্রচারের সুযোগ তৈরি হয়।

জনস হপকিন্স সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটির চিকিৎসক আমেশ আদালজা বলেন, ‘আপনি তিন সপ্তাহের পুরানো ডাটা দেখছেন এবং আজকের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করছেন।’

৭ মার্চের মধ্যে সিস্টেমে উন্নতি হয়। তখন নতুন করে শনাক্ত হওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে ৮০ ভাগেরও বেশি ক্ষেত্রে একই দিনে সিস্টেমে রেকর্ড করা শুরু হয়।

চীনের ফাঁস হওয়া নথি অনুযায়ী, দেশটির কর্মকর্তারা কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের মাত্রা বুঝতে পারেনি। এটি একটি আন্তর্জাতিক সংকটে রূপান্তরিত হবে; এটি তারা অনুধাবন করতে পারেনি।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান থেকে ছড়িয়ে পড়ে করোনাভাইরাস। উৎপত্তিস্থল চীনে এখন ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাব কমে গেছে। তবে বিশ্বের অন্যান্য দেশে এই ভাইরাসের প্রকোপ বাড়ছে। চীনের বাইরে করোনাভাইরাসের প্রকোপ ১৩ গুণ বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে গত ১১ মার্চ দুনিয়াজুড়ে মহামারি ঘোষণা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।

আমেরিকার দুই মহাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ায় সংক্রমণ এখনও দ্রুত বাড়ছে। অন্যদিকে ইউরোপকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে করোনা কিছুটা স্তিমিত হলেও সেখানে আবারও নতুন করে রোগটির প্রাদুর্ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। তবে আশার কথা হচ্ছে, এখন আক্রান্তের পর সুস্থ হওয়ার হার দ্রুত বাড়ছে।

প্রথম থেকেই চীনের বিরুদ্ধে করোনার প্রকৃত পরিস্থিতি গোপন করার অভিযোগ রয়েছে। উহানের একজন স্বেচ্ছাসেবী বলেন, ‘বুদ্ধি-বিবেচনাসম্পন্ন যেকোনও মানুষ এই সংখ্যা (সরকারি পরিসংখ্যান) নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করবেন।’

মহামারির শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে আসছিল, করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পেছনে চীনের ভূমিকা রয়েছে। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প করোনাভাইরাসকে চীনা ভাইরাস হিসেবে আখ্যায়িত করেন। সূত্র: সিএনএন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য