ইরানের শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী মোহসেন ফাখরিজাদেহকে রুমোট কন্ট্রল দিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে বিশ্বাস ইরানি কর্মকর্তাদের।

গত শুক্রবার মোহসেনকে হত্যা করা হয়। ইরানের ধারণা, ইসরায়েল এবং নির্বাসিত একটি ইরানি বিরোধীদল দূর-নিয়ন্ত্রিত অস্ত্র দিয়ে তাকে হত্যা করেছে।

ইসরায়েল এখন পর্যন্ত ইরানের এই অভিযোগ নিয়ে কোনও মন্তব্য করেনি। সোমবার রাজধানী তেহরানের উত্তরাংশের একটি কবরস্থানে মোহসেনের দাফন সম্পন্ন হয়।

তার আগে ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রণালয়ে মোহসেনের জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে জানাযায় শুধু নির্দিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তিই উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে সামরিক বাহিনীর বেশ কয়েক ডজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও মোহসেনের পরিবারের সদস্যরা ছিলেন।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে এক বক্তৃতায় ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলি শামখানি বলেন, ‘‘হামলাকারীরা বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার করেছে। তারা হত্যাকাণ্ডের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল না।”এ বিষয়ে তিনি আর কোনও তথ্য দেননি বলে জানিয়েছে বিবিসি।

প্রাথমিকভাবে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছিল, কয়েকজন বন্দুকধারী মোহসেনের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে।

মোহসেন গত শুক্রবার তেহরানের কাছে একটি মহাসড়কে চোরাগোপ্তা হামলার শিকার হন। আহত মোহসেনকে হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়। এ হত্যার বদলা নেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।

মোহসেন ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রণালয়ের গবেষণা ও উদ্ভাবন সংগঠনের প্রধান ছিলেন। তাকে ইরানের গোপন পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচির হোতা বলে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন থেকেই সন্দেহ করে আসছিল। কূটনীতিকরা তাকে ‘ইরানের বোমার জনক’ বলেও আখ্যা দিয়েছিলেন।

এর আগে ২০১০ সাল থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ইরানের আরও চার পরমাণু বিজ্ঞানী হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। সেবারও ইরান এসব হত্যাকাণ্ডে ইসরায়েলের জড়িত থাকার অভিযোগ তুলেছিল।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর দপ্তর থেকে এখন পর্যন্ত মোহসেন ফাখরিজাদেহ হত্যাকাণ্ড নিয়ে কোনও মন্তব্য করা হয়নি। তবে ২০১৮ সালের মে মাসে নেতানিয়াহু ইরানের পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে অভিযোগ করতে গিয়ে মোহসেনের নাম বলেছিলেন। সে সময় তিনি ‘এই নামটি মনে করেও রাখতে’ বলেছিলেন।

ইরান ২০১৫ সালে তাদের পরমাণু কার্যক্রম নিয়ে ছয় বিশ্বশক্তির সঙ্গে একটি চুক্তি করে। ওই চুক্তি ইরানকে তার পরমাণু কর্মসূচিতে দৃশ্যত লাগাম টানতে বাধ্য করলেও দুই বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প চুক্তিটি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর তেহরানও চুক্তিতে থাকা বিভিন্ন শর্ত লঙ্ঘন করা শুরু করে।

এবারের নির্বাচনে জিততে পারেননি ট্রাম্প। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার পালাবদল হচ্ছে। নানা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলের আপত্তি সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ফের ইরান পরমাণু চুক্তিতে ওয়াশিংটনকে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আগামী ২০ জানুয়ারি শপথ নেবেন বাইডেন।

ঠিক এই সময়ে ইরানের শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী হত্যাকাণ্ড স্বাভাবিকভাবেই মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলবে।

মোহসেন ফাখরিজাদেহের উপর চোরাগোপ্তা হামলা হতে পারে-এমন খবর ইরানের গোয়েন্দা সংস্থা ও নিরাপত্তা বাহিনী আগেই পেয়েছিল বলে দাবি করেন রিয়ার অ্যাডমিরাল শামখানি। এমনকী কোথায় হামলা হতে পারে তার আন্দাজও তারা করতে পরেছিলেন বলেও দাবি করেন এই নিরাপত্তা কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, ‘‘মোহসেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাই প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু শত্রুরা সম্পূর্ণ নতুন, পেশাদার এবং বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছে এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে তারা সফলও হয়েছে।

“বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার করে তারা খুবই জটিল একটি মিশন পরিচালনা করেছে। ঘটনাস্থলে তাদের কেউই উপস্থিত ছিল না।”কারা এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে আছে সে সম্পর্কে ‘কিছু তথ্য’ পাওয়ার দাবিও করেছেন শামখানি।

তিনি বলেন, ইরান থেকে নির্বাসিত বিরোধীদল মুজাহেদিন-ই খালক (এমকেও) এ হত্যাকাণ্ডে ‘নিশ্চিতভাবে জড়িত’ এবং ‘গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে’। তাদের সঙ্গে ইসরায়েল এবং দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হাতও আছে।

শামখানির এ মন্তব্যের একদিন আগে রোববার ইরানের আধা-স্বায়ত্তশাসিত বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ মোহসেনকে রিমোট চালিত একটি স্বয়ংক্রিয় মেশিনগান দিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে খবর প্রকাশ করে।

অবশ্য, শুক্রবারের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে ঘটনাস্থলে বন্দুকধারীদের থাকার কথা জানিয়েছিলেন। ঘটনাস্থলে পাওয়া অস্ত্রে ইসরায়েলের সমরাস্ত্র কারখানার লোগো ও নাম ছিল বলে ইরানের প্রেস টিভির খবরে সে সময় বলা হয়।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য