মোঃ জাকির হোসেন, সৈয়দপুর (নীলফামারী) সংবাদদাতা ॥ নীলফামারীর সৈয়দপুরে নবম শ্রেণীর এক মেধাবী শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে বিজিবি সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ২০ নভেম্বর শুক্রবার রাতে সৈয়দপুর থানায় মামলাটি করেছেন শিক্ষার্থীর মা মকছুদা বেগম। মামলা নং ১৫। এঘটনায় পুলিশ ২ জনকে আটক করলেও জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। তবে মামলার পর থেকে বিজিবি সদস্য আখতারুজ্জামান পলাতক রয়েছে।

মেয়েটির মা মকছুদা বেগম জানান, আমার মেয়ে অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী। অষ্টম শ্রেণীতে জিপিএ-৫ পেয়েছে। সে বর্তমানে নবম শ্রেণীতে অধ্যায়নরত। এমতাবস্থায় গত ৯ নভেম্বর সোমবার বিকেল ৪ টার দিকে প্রতিবেশী মৃত জয়নাল আবেদীনের ছেলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর সদস্য মো: আখতারুজ্জামান (৩০) আমার মেয়েকে ডেকে নিয়ে মোটর সাইকেল যোগে শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কস্থ সাজেদা ক্লিনিকে প্রসব পরবর্তী চিকিৎসারত তার বোন রোকেয়া বেগমের (২৮) কাছে নিয়ে যায়।

এ ব্যাপারে আমাদের কারও কোন অনুমতি না নিয়েই আমার মেয়েকে নিয়ে যাওয়ায় আমরা বিষয়টি অবগত ছিলাম না। পরবর্তীতে রাতের বেলা আখতারুজ্জামানের বোন পারুল বাড়িতে এসে আমার মেয়ের জামা নিয়ে যায়। এসময় পারুল জানায় আমার মেয়ের জামাতে তরকারীর ঝোল পড়ে নষ্ট হয়েছে। আবার জিজ্ঞাসা করা হলে সে বলে সাজেদা ক্লিনিকে বাথরুমে পড়ে গিয়ে আমার মেয়ের জামা ভিজে গিয়েছে। সে রাতে সেখানেই থাকবে । তাই তার জামা প্রয়োজন।

পরদিন মঙ্গলবার রাত ৯ টার দিকে আমার মেয়েকে আখতারুজ্জামান মোটর সাইকেল যোগে বাড়ির প্রধান দরজায় নামিয়ে দিয়ে তাৎক্ষনিক চলে যায়্ এরপর মেয়ের ডাকে আমরা বুঝতে পারি যে সে বাড়িতে ফিরে এসেছে। কিন্তু দরজা খুলে দেখতে পাই আমার মেয়ে অস্বাভাবিক আচরণ করছে। এর কোন কারণ জিজ্ঞাসা করেও জানতে পারিনি। দীর্ঘ সময় পর মেয়ে জানায় তার আর কোন অভাব থাকবেনা। কারণ সে কয়েকটি ক্লিনিকে কাজ পেয়েছে। তাছাড়া তাকে বড় ভাই আখতারুজ্জামান ও ভগ্নিপতি সামসুর রহমান সংগ্রাম এবং তার বন্ধু ইমন ও রশিদুল ইসলাম অনেক টাকা দিবে। একসময় মেয়েটি একটি চিরকুটে তাদের নাম লিখে কান্না করে। একসময় বলে রাতে তাকে ভাই ও দুলাভাই দই খাইয়েছে। তখন থেকেই তার মাথাটা কেমন জানি করছে।

এমতাবস্থায় আমরা মেয়েকে নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়ি। আখতারুজ্জামানসহ তার পরিবারের লোকজনকে জিজ্ঞাসা করি যে, আমার মেয়েকে সুস্থ অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার পর এমন কি হয়েছে যে সে অস্বাভাবিক কথা বার্তা বলছে। এতে তারা কোন রকম কর্ণপাত না করে উল্টো নানা ধরণের হুমকি দেয়। এর প্রতিবাদ করায় এক পর্যায়ে মেয়ের বাবা এপেন্ডিসাইট অপারেশনের রোগী ভ্যান চালক আজাদ আলী মন্ডল ও তার বড় বাবা আতাউর রহমানকে মারতে উধ্বত হয় এবং তাড়িয়ে দেয়। এখনও তারা এ নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতে বিভিন্ন রকম ভয়ভীতি প্রদর্শণ করছে।

আমাদের আশংকা আখতারুজ্জামান বা তার ভগ্নিপতি (রোকেয়ার স্বামী) সামসুর রহমান সংগ্রাম এবং তার বন্ধুরা ক্লিনিকে একাকী পেয়ে আমার মেয়েকে ধর্ষণ করেছে। যে কারণে সে মানসিক ভারসাম্যতা হারিয়ে অস্বাভাবিক আচরণ করছে। বাধ্য হয়ে আমরা ১১ নভেম্বর বুধবার সরকারী বঙ্গবন্ধু হেলফ ডেক্স নম্বরে মোবাইলে কল দিয়ে পরামর্শ নেই। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী নীলফামারী সদর আধুনিক হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রোগীর অবস্থা বেগতিক দেখিয়া দায়িত্বরত চিকিৎসক রংপুর মেডিকেল কলেজের ওসিসি সেন্টারে প্রেরণ করেন। এসময় সেখান থেকে দেয়া ছাড়পত্রে উল্লেখ করা হয় মেয়েটি যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাৎক্ষনিক মেয়েকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসি সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয় এবং এখনও সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছে। গত শুক্রবার রাতে (২০ নভেম্বর) সৈয়দপুর থানায় আখতারুজ্জামানকে আসামী করে মামলা দায়ের করেছি।

মেয়েটির বড় বাবা আতাউর রহমান জানান, আমার ভাই অত্যন্ত গরিব মানুষ। ভ্যান চালিয়ে অনেক কষ্ট করে দুই মেয়েকে লেখাপড়া করিয়েছেন। মেয়ে দুটিও খুবই মেধাবী। আখতারুজ্জামান পরিবারটির অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে পরিবারের অজ্ঞাতে কৌশলে ক্লিনিকে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেছে। মেয়েটির জীবন আজ চরম সংকটাপন্ন। তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। চিকিৎসায় কতটুকু উন্নতি হবে তা আমরা জানিনা। একইভাবে জানিনা প্রভাবশালী বিজিবি সদস্য আখতারুজ্জামানের এহেন অপকর্মের বিচার আমরা পাব কিনা। কারণ আমাদের অর্থ নেই, নেই কোন প্রভাব প্রতিপত্তি। মেয়ের জীবন ধ্বংস করেও উল্টো আমাদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে ধর্ষকের পরিবার।

এ ব্যাপারে বিজিবি সদস্য আখতরুজ্জামানের সাথে তার বাড়িতে কথা হলে তিনি জানান, আমার চাচাতো বোন তাকে কোথাও নিয়ে যেতে কারও অনুমতির প্রয়োজন নেই। সে যেতে চেয়েছিল তাই কাউকে না বলেই ক্লিনিকে নিয়ে গিয়েছি। সেখানে কোন কিছুই ঘটেনি। তবে তার আগেও এমন অস্বাভাবিক আচরণের ঘটনা ঘটেছিল।

আখতারুজ্জামানের বোন রোকেয়া জানান, মেয়েটি ক্লিনিকে রাতে আমার সাথেই ছিল। পরদিন দুপুর তিনটার দিকে তাকে আমার ভাই আখতারুজ্জামান ক্লিনিক থেকে নিয়ে গেছে। কিন্তু পরে জানতে পারি তাকে রাত ৯ টায় বাড়িতে পৌছানো হয়েছে।

সামসুর রহমান সংগ্রামের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানিনা। ক্লিনিকে আমি ছিলাম না। আমার স্ত্রীর সাথে আমার বড় বোন ছিল। মেয়েটি ছিল কিনা তাও জানিনা।

সাজেদা ক্লিনিকের পরিচালক মোঃ শরিফুল ইসলাম জানান, রোকেয়া বেগমের সন্তান প্রসবের জন্য এখানে ভর্তি হয়েছিল। রোগীর সাথে কে এসেছে বা রাতে অবস্থান করেছে সে বিষয়ে আমাদের কোন তথ্য নেই। এখানে ধর্ষণের ঘটনা ঘটার মত কিছুই হয়নি। মেয়ের মায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ক্লিনিকের সিসি টিভি ফুটেজ তদন্ত করে এ ধরণের কোন তথ্যই পায়নি।

সৈয়দপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) মোঃ আতাউর রহমান জানান, অভিযোগ পেয়ে ক্লিনিকে পরিদর্শণ করেছি। তেমন কোন আলামত পাওয়া যায়নি। রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত ধর্ষণ হয়েছে কি না সে ব্যাপারে নিশ্চিত না হয়ে কোন পদক্ষেপ নিতে পারছিনা। মেয়েটিও অস্বাভাবিক আচরণ করায় তারও সুস্পষ্ট বক্তব্য নেয়া সম্ভব হচ্ছেনা।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য