দিনাজপুর সংবাদাতাঃ ঘরে নতুন ধান! আত্মীয় স্বজনদেরকে নিয়ে পিঠা পুলির এক মহা উৎসব। অগ্রহায়ণ মাস জুড়েই প্রতিটি বাঙ্গালী ঘরের চিত্র এটি। আর এই আয়োজনকেই বলা হয় হেমন্তের প্রাণ বা নবান্ন উৎসব। কৃষকের সোনালী হাসির এই নবান্নের স্বাদ পাওয়া যাচ্ছে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা সহ আশপাশের বেশ কয়েকটি উপজেলার বাঙ্গালী পরিবার গুলোর মাঝে।

আজ থেকে শুরু হলো অগ্রহায়ণ মাস। আর পয়লা অগ্রহায়ণ মানেই বাঙ্গালী গেরস্থ বাড়িতে উৎসবের আমেজ। মাঠ থেকে সোনালী ফসল ঘরে তুলতে ব্যস্ত কৃষকরা। নতুন ধানের গন্ধে ম ম উঠান বাড়ি। পাশাপাশি নতুন ধানের পিঠা, পুলি, পায়েশ রান্নাতে ব্যস্ত বাঙ্গালী পরিবার গুলো। ঘোড়াঘাট সহ আশপাশের বেশ কয়েকটি উপজেলা ঘুরে দেখা যায়, বাড়িতে মেয়ে-জামাই, আত্মীয়-স্বজনদেরকে নিয়ে আনন্দে মেতে উঠেছে বাঙ্গালী পরিবার গুলো।

নেচে গেয়ে মনের আনন্দে কাঠের ঢেঁকিতে আটা কোটা ও পিঠা পুলি তৈরিতে ব্যস্ত মেয়েরা। নবান্নকে ঘিরে বেশ কয়েকটি গ্রামে জবাই করা হয়েছে গরু ও মহিষ। ভোর থেকে মাংস কিনতে ভীড় জমাচ্ছে বাড়ির জামাই সহ পরিবারের পুরুষ সদস্যরা। অনেক জায়গায় নবান্নকে ঘিরে চলছে পিকনিক। সবচেয়ে বেশি আনন্দে মেতে উঠেছে বাঙ্গালী আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পরিবার গুলো। পিঠা-পুলির পাশাপাশি বিভিন্ন আদিবাসী নৃত্য ও সঙ্গীতে আত্মহারা হয়ে উঠেছে তারা।

তবে আগেকার সেই নবান্ন উৎসব এখন আর চোখে পড়ে না। দিন পরিবর্তনের সাথে সাথে হারিয়ে যেতে বসেছে বাঙ্গালী জাতির সেই চির চেনা নবান্ন উৎসব। আগে প্রতিটি বাঙ্গালী পরিবারেই হতো নবান্নের মহা আয়োজন। তবে এখন কিছু কিছু বাঙ্গালী গেরস্থ বাড়িতে স্বল্প পরিসরে এই আয়োজন হয়। সেটাও আগেকার মত জমকালো নয়। গ্রামে তাও দেখা মেলে নবান্ন আয়োজনের। কিন্তু শহরে এর কোন ছাপ নেই। শহরের নবান্ন মানে পিঠা-পুলির দোকান। আর সেই সব দোকান থেকে পিঠা-পুলি কিনে খাওয়া। আগেকার দিনের সেই নবান্নের আংশিক স্বাদ পাওয়া যায় গ্রামের পরিবার গুলোতে। বাড়ির একদিকে মা-দাদিরা কাঠের ঢেঁকিতে নতুন ধানের আটা কুটতে ব্যস্ত। অপর দিকে বাড়ির উঠোনে বোন, ভাবী, চাচীরা ব্যস্ত নানান রং বেরং এর পিঠা-পুলি ও পায়েশ-খীড় তৈরিতে।

কানাগাড়ী গ্রামের কৃষক আব্দুল জব্বার বলেন, নবান্নের প্রকৃত স্বাদ কেবল কৃষকরাই পায়। মাসের পর মাস পরিশ্রম করার পর ফসল ঘরে তোলার মাঝে কি যে আনন্দ, তা বলে বোঝানো যাবে না। আবার নতুন ধানের পিঠা-রুটিতেও থাকে অন্য রকম স্বাদ।

জালালপুর গ্রামের আদিবাসী কৃষক পাল্টন হেমরম বলেন, ‘হামরা সারা বছর কৃষানী করে খাই। বছরের এই একটা সময় বেটি-জামাই নিয়ে আনন্দ করি। হামার হেরে বাপ দাদার আমলে আরো বড় বড় আয়োজন হচ্ছিল। এখন তো আর ওগলা হয় না।’

ঘোড়াঘাট পৌর নাগরিক কমিটির সভাপতি আনিসুর রহমান বলেন, আমরা আগে যে নবান্ন দেখতাম আর এখন যে নবান্ন উৎসব পালিত হয়, তার মাঝে অনেক পার্থক্য। নবান্ন উৎসবের সেই প্রফুল্লতা এখন আর আমাদের মাঝে নেই। বর্তমান প্রজন্ম নবান্ন সম্পর্কে জানেই না। বাঙ্গালী জাতির এই মহা উৎসবকে টিকিয়ে রাখতে গেলে আগেকার দিনেই সেই সাংস্কৃতি চর্চা চালিয়ে যেতে হবে। নতুন প্রজন্মকে বাঙ্গালী জাতির সেই ইতিহাস জানাতে হবে। আমাদের আন্তরিকতার অভাব এবং অধিক ডিজিটালাইজেশনের কারণে এই উৎসব গুলি আর তেমন চোখে পরে না।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য