সামসউদ্দীন চৌধুরী কালাম, পঞ্চগড় থেকেঃ ঋতু বৈচিত্রে বাংলাদেশে শীতকাল ধরা হয় পৌষ-মাঘ মাসে। কিন্তু দেশে শীতের প্রকোপ শুরু হয় হেমন্তেই। আর হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থান হওয়ার কারণে পঞ্চগড়সহ উত্তরের কয়েকটি জেলায় শীতের আগমন হয় শরতের শেষ থেকে। এই অঞ্চলে দেশের অন্যান্য জেলার চেয়ে আগে শীত অনুভূত হয়। আর শেষ হয় সবার পরে। শীতকালে অধিকাংশ দিনে দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় এই অঞ্চল থেকেই।

সোমবারও দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করেছে তেঁতুলিয়া আবহাওয়া অফিস। পুরো শীতকালে শীত ও শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় বহু মানুষ। এবার কিছুটা দেরীতে শুরু হয়েছে শীতের আমেজ। তবে এবার শীত আসছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে। তাই শীতের সাথে এবার লড়তে হবে করোনার সাথেও। করোনাময় শীত সামাল দিতে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ।

বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে পরিবর্তন হচ্ছে জলবায়ুরও। তার পরও পঞ্চগড়সহ উত্তরের জেলাগুলোতে আশ্বিনের শেষ ও কার্তিকের শুরু থেকে শুরু হয়ে যায় শীত। প্রতি বছর এই সময়টাতে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের কারণে ঝড়-বৃষ্টির পর থেকেই শীতের দেখা মিলতে থাকে। তবে এবার মধ্য কার্তিকে আকাশ মেঘলা ও হালকা বাতাসের কারণে কয়েকদিনের জন্য কনকনে শীত অনুভূত হয়। সন্ধ্যার পর থেকে সকাল পর্যন্ত কুয়াশা ঝড়তে দেখা যায়। এর পর থেকে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা কমলেও দিনের তাপমাত্রা না কমায় শীতের প্রকোপ খুব বেশি একটা বাড়েনি। তবে অগ্রহায়নের শুরু থেকেই শুরু হয়ে যাবে জমপেশ শীত এমনটাই ধারণা করেছে আবহাওয়া অফিস।

তবে এবারের শীত নিয়ে আতংকে রয়েছেন মানুষজন। বাংলাদেশে করোনার শুরু থেকেই পঞ্চগড়সহ উত্তরের জেলাগুলোতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক কম। তবে শীতকালে করোনা নতুন করে বিস্তার লাভ করবে; এই আশংকায় চিন্তিত এখানকার মানুষরা। বিশেষ করে খেটে খাওয়া ও কম আয়ের মানুষরা শীতে বেশী কষ্টের মধ্যে থাকে। খড়কুটো দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে তাদের শীত নিবারণ করতে দেখা যায়। গোটা শীতকাল তাদের অপেক্ষা করতে হয় সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিলি করা শীতবস্ত্রের দিকে।

তীব্র শীতে তারা কাজে বের হতে না পারলে পরিবার নিয়ে তাদের উপোষ থাকতে হয়। এরই সাথে করোনা তাদের মাঝে নতুন করে আতংক সৃষ্টি করেছে। এমনিতেই শীতকালে শীতজনীত বিভিন্ন রোগ বিস্তার লাভ করে। বিশেষ করে শ্বাষকষ্ট, সর্দি, জ্বর, কাশ, নিউমোনিয়াসহ শীতজনীত বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এ সময়টাতে শিশু ও বৃদ্ধরা থাকে ঝুঁকির মধ্যে। মূলত: শীতকালের শীতজনীত রোগে শিশু ও বৃদ্ধরাই বেশী মারা যায়। এরমধ্যে কিছু রোগের উপসর্গ করোনার মধ্যেও রয়েছে। তাই এই নিয়ে দুশ্চিন্তার রয়েছে সাধারণ মানুষজন।

পঞ্চগড়ে শীতে করোনা মোকাবেলায় ইতোমধ্যে সভা করেছে জেলা প্রশাসন। সভায় মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জেলা পর্যায়ে ৩০টি ও উপজেলায় পর্যায়ে ২০টিসহ মোট ৫০টি বেড ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদিসহ প্রস্তুতকৃত কোভিড আইসোলেশন ইউনিট ব্যবহার উপযোগি করে রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে আধুনিক সদর হাসপাতালে আরও একটি ওয়ার্ডকে কোভিড ডেডিকেটেড করার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। এছাড়া জরুরী রোগি হেলিকপ্টারে পরিবহনের জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম স্টেডিয়ামে হ্যালিপ্যাড হিসেবে প্রস্তুত করা হচ্ছে। এছাড়া শীতার্ত মানুষদের মাঝে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শীতবস্ত্র বিতরণের জন্য ইতোমধ্যে চাহিদাপত্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানান, সোমবার তেঁতুলিয়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১২ দশমিক ৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। যা চলতি শীত মৌসূম ও দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বলে তিনি জানান।

শীতকালে করোনা মোকাবেলায় ব্যাপক প্রস্তুতির কথা জানিয়ে পঞ্চগড়ের সিভিল সার্জন ডা. মো. ফজলুর রহমান জানান, শীত ও করোনা মোকাবেলায় আমাদের যথেষ্ট প্রস্তুতি রয়েছে। এমনিতেই শুরু থেকেই পঞ্চগড়ে করোনা সনাক্তের হার খুবই কম। আবার সনাক্তদের অধিকাংশই বাড়িতে থেকেই সুস্থ্য হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সংখ্যা খুবই কম। তারপরও আমরা শীতে মোট ২০টি বেড প্রস্তুত রেখেছি। আমাদের পর্যাপ্ত অক্সিজেন সিলিন্ডার মজুদ রয়েছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী থাকায় আমরা আশা করছি শীতে করোনা মোকাবেলায় আমাদের কোন সমস্যা হবে না।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য