যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত কে জয়ী হয় তা জানতে দেশটির নাগরিকদের পাশাপাশি সারা বিশ্বই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

দেশটির বেশ কয়েকটি ব্যাটলগ্রাউন্ড রাজ্যে এখনও লাখ লাখ ভোট গণনা বাকি থাকায় এবং দুই প্রার্থীর মধ্যে ব্যবধান অল্প হওয়ায় নির্বাচনে কে জয়ী হচ্ছেন তা নিশ্চিত হতে কয়েকদিন তো বটেই আইনি লড়াইয়ে গড়ালে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্তও সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত ভোটের ধারা বিবেচনায় ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনকে হোয়াইট হাউসের পরবর্তী বাসিন্দা বলে ধরে নেওয়া হলেও ট্রাম্প আগেভাগে নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করে গোল বাঁধিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের অনেক রাজনৈতিক ভাষ্যকার এবং নাগরিক অধিকার আন্দোলনকারীরা রিপাবলিকান প্রার্থীর এমন ‘হটকারী অবস্থানের’ কড়া সমালোচনা করেছেন।

ট্রাম্পের ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে পদদলিত করতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তারা।

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের এ তুমুল উত্তেজনা বিশ্বের অধিকাংশ দেশের নেতা এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।

“আমরা অপেক্ষা করছি ও দেখছি, কী হয়। অবশ্যই এখনও নানা ধরনের অনিশ্চয়তা আছে। অনেকে যেমনটা ভেবেছিল এটা (নির্বাচন) তার চেয়েও ব্যাপক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে বলে আমার মনে হচ্ছে,” বলেছেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডমিনিক রাব।

তার মতো বিশ্বের অধিকাংশ দেশের নেতারাই যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন নিয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার সময় সাবধানতা অবলম্বন করলেও, কূটনৈতিক রীতিনীতির বেড়াজাল ছিন্ন করে ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টিকে অভিনন্দন জানিয়ে বসেছেন স্লোভেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী ইয়ানেস জানেসা।

“এটা পরিষ্কার যে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ডনাল্ড ট্রাম্প ও মাইক পেন্সকে আরও ৪ বছরের জন্য নির্বাচিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ভালো ফল করায় রিপাবলিকান পার্টিকে অভিনন্দন,” বলেছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়ার দেশের এই প্রধানমন্ত্রীকে হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবানের মতো পূর্ব ইউরোপের ট্রাম্পঘনিষ্ঠদের একজন বলে ধরা হয়।

বিশ্বের প্রত্যেকটি অঞ্চল যে এ নির্বাচনের ফলকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই তার প্রমাণ। মঙ্গলবার থেকে বিশ্বজুড়েই টুইটারে ট্রেন্ড হয়ে আছে ট্রাম্প, বাইডেন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন ২০২০ শব্দগুলো। রাশিয়া থেকে পাকিস্তান, মালয়েশিয়া থেকে কেনিয়া, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার অসংখ্য মানুষ এ শব্দগুলোর সঙ্গে হ্যাশট্যাগ জুড়ে দিয়ে খবর, বুথফেরত জরিপ, নানান তথ্য, ভিডিও এবং নিজেদের মতামত দিয়েছে।

মস্কো যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করে আসছে, গত কয়েক বছর ধরে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ধারাবাহিকভাবে এ ধরনের অভিযোগ করে গেলেও মঙ্গলবারের নির্বাচন নিয়ে রাশিয়া কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেখায়নি ।

দেশটির ক্রেমলিনপন্থি এক সাংসদ অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের নাটকীয়তা উপভোগ করতে রাশিয়ানদের পপকর্ন মজুদের পরামর্শ দিয়েছেন। বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ মারাত্মকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বিপুল সংখ্যা মানুষকে আমেরিকান বারে বসে মার্কিন নির্বাচনের ভোট গণনা দেখতে দেখা গেছে।

“যখন ট্রাম্প থাকে তখন খবর অনেক ভালো হয়। আপনি কখনোই জানবেন না তিনি কী বলতে যাচ্ছেন। এটা চমৎকার। আমার মনে হয়, ট্রাম্প যদি হেরে যান তাহলে খবরগুলো কম আকর্ষনীয় হবে,” বলেছেন লাল রংয়ের ‘মেইক ইউরোপ গ্রেট অ্যাগেইন’ বেসবল ক্যাপ পরে থাকা গ্লেন রবার্টস।

বেশিরভাগ অস্ট্রেলিয়ানই অবশ্য বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন কী ধরনের প্রভাব ফেলে সে বিষয়টিকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

“আমার মনে হয়, এটি আমাদের সবার উপরই প্রভাব ফেলে। সেখানে যা ঘটছে, তার উপর সত্যি সত্যিই এখানকার আগামী ৪ বছরের অনেক কিছুই নির্ভর করবে,” বলেছেন সিডনির বাসিন্দা লুক হেইনরিখ।

নিউ ইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নির্বাহী পরিচালক কেনেথ রথ যুক্তরাষ্ট্রে সব ভোট গণনার আগেই ট্রাম্পের নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণার পদক্ষেপকে ‘বিপজ্জনক’ অ্যাখ্যা দিয়েছেন।

“বিজয়ের এই অগ্রিম ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রকে খাটো করতে পেরে স্বৈরাচাররা ব্যাপক খুশি হতে পারে,” বলেছেন তিনি।

গত কয়েক দশকের মধ্যে ট্রাম্পের আমলেই চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছেছে। বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনকে দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফল নিয়ে ‘তাদের মাথাব্যথা নেই’।

চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং দ্রুত ও নির্ভুল ফল সরবরাহে ব্যর্থতা নিয়ে ব্যাঙ্গ করার সুযোগ হাতছাড়া করেননি।

“তিনি (ট্রাম্প) জয়ী হন বা হেরে যান, তার সর্বশেষ মিশন হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের চেহারাকে গুড়িয়ে দেওয়া,” বুধবার উইবুতে এমনটাই বলেছেন এক ব্যবহারকারী।

আরেকজন বলেছেন, “ট্রাম্পেরই পুনর্নির্বাচিত হওয়া উচিত এবং যুক্তরাষ্ট্রকে আরও তলানিতে নিয়ে যাওয়া উচিত।”

নাইজেরিয়ার সেনেটর শিহু সানি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ফল নিয়ে এ অনিশ্চয়তা আফ্রিকার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।

“আফ্রিকা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে গণতন্ত্র শিখত, এখন যুক্তরাষ্ট্র আফ্রিকান গণতন্ত্র শিখছে,” টুইটে বলেছেন তিনি।

সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম টুইটারে নাইজেরিয়ার এ প্রভাবশালী রাজনীতিকের ১৬ লাখের বেশি অনুসারী আছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য