লালমনিরহাটের বুড়িমারী উপজেলায় শহিদুন্নবী জুয়েল নামে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার পর মরদেহ পোড়ানোর ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া ১৬ আসামীর মধ্যে পাঁচ আসামির তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দুপুরে লালমনিরহাট আমলি আদালত-৩ এর বিচারক সিনিয়ার জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এর আগে রোববার (১ নভেম্বর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে লালমনিরহাট সিনিয়র জুডিসিয়াল আদালত-৩ এর বিচারক বেগম ফেরদৌসী বেগম মঙ্গলবার রিমান্ড শুনানির দিন ধার্য করে আসামিদের জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশকে আলোচিত ঘটনায় দায়ের করা তিনটি মামলার তদন্তভার দেওয়া হয়। আপাতত হত্যা মামলায় গ্রেফতার পাঁচ আসামিকে পাঁচ দিন করে রিমান্ডের আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পরিদর্শক মাহমুদুন্নবী। শুনানি শেষে বিচারক তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

রিমান্ডপ্রাপ্তরা হলেন- বুড়িমারী এলাকার ইসমাইল হোসেনের ছেলে আশরাফুল আলম (২২) ও বায়েজিদ (২৪), ইউসুব আলী ওরফে অলি হোসেনের ছেলে রফিক (২০), আবুল হাসেমের ছেলে মাসুম আলী (৩৫) এবং সামছিজুল হকের ছেলে শফিকুল ইসলাম (২৫)।

কোরআন অবমাননার গুজব ছড়িয়ে শহিদুন্নবী জুয়েলকে হত্যার দায়ে নিহতের চাচাত ভাই সাইফুল ইসলাম বাদী হয়ে শনিবার (৩১ অক্টোবর) একটি মামলা দায়ের করেন।

এ মামলায় গ্রেফতার পাঁচ আসামিকেই পাঁচ দিন করে রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পরিদর্শক মাহমুদুন্নবী। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রিমান্ড আবেদনের শুনানির দিন ধার্য করে আসামিদের হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন আমলি আদালত ৩ এর বিচারক সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বেগম ফেরদৌসী বেগম।

মঙ্গলবার শুনানি শেষে পাঁচ আসামির প্রত্যেককে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন লালমনিরহাট সিনিয়র জুডিসিয়াল আদালত ৩ এর বিচারক বেগম ফেরদৌসী বেগম।

এ ঘটনায় দ্বিতীয় ধাপে সোমবার (২ নভেম্বর) সকালে বুড়িমারী বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খাদেম জোবেদ আলীসহ (৬১) আরো পাঁচ জনকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠালে আদালত তাদের জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

মঙ্গলবার তৃতীয় দফায় আরো ছয় জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এ নিয়ে এই তিন মামলায় মোট ১৬ জনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। বাংলানিউজকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওমর ফারুক।

এ ঘটনায় পুলিশের ওপর হামলার দায়ে পাটগ্রাম থানার উপ পরিদর্শক (এসআই) শাহজাহান আলী বাদী হয়ে এবং ইউনিয়ন পরিষদ ভাঙচুরের দায়ে অপর একটি মামলা দায়ের করেন বুড়িমারী ইউপি চেয়ারম্যান আবু সাঈদ নেওয়াজ নিশাত।

বহুল আলোচিত তিনটি মামলায় জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশকে তদন্তের দায়িত্ব ভার দেওয়া হয়। সোমবার (২ নভেম্বর) পর্যন্ত দুই দফায় মসজিদের খাদেম জোবেদ আলীসহ ১০ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

নিহত যুবক শহিদুন্নবী জুয়েল রংপুর শহরের শালবন মিস্ত্রীপাড়া এলাকার আব্দুল ওয়াজেদ মিয়ার ছেলে। তিনি রংপুর ক্যান্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক গ্রন্থাগারিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র। গত বছর চাকরিচ্যুত হওয়ায় মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, শহিদুন্নবী জুয়েল বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেলে সুলতান রুবায়াত সুমন নামে এক সঙ্গীসহ বুড়িমারী বেড়াতে আসেন। বিকেলে বুড়িমারী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে আসরের নামাজ আদায় করেন তারা।

নামাজ শেষে পাঠ করার জন্য মসজিদের সানসেটে রাখা কোরআন শরীফ নামাতে গিয়ে অসাবধনাতাবশত কয়েকটি কোরআন ও হাদিসের বই তার পায়ে পড়ে যায়। এ সময় তুলে চুম্বনও করেন জুয়েল। বিষয়টি নিয়ে তার সঙ্গে মুয়াজ্জিনের কথা কাটাকাটি হয়। এরপর আশপাশের লোকজন ছুটে এসে সন্দেহবশত জুয়েল ও সুলতান রুবায়াত সুমনকে পাশে ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের একটি কক্ষে আটকে রাখে। খবর পেয়ে পাটগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউএনও, ওসি বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদে উপস্থিত হন।

সন্ধ্যায় পুরো বাজারে এবং পার্শ^বর্তী গ্রামে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, কোরআন অবমাননার দায়ে দুই যুবককে আটক করা হয়েছে। এ সময় উত্তেজিত হয়ে বিক্ষুব্ধ জনতা ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের দরজা জানালা ভেঙে প্রশাসনের কাছ থেকে জুয়েলকে ছিনিয়ে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। পরে মরদেহ টেনে পাটগ্রাম বুড়িমারী মহাসড়কে নিয়ে আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতা মহাসড়কে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল করে।

সন্ধ্যা থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পাটগ্রাম ও হাতীবান্ধা থানা পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দফায় দফায় চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতার ছোড়া ইট পাথরের আঘাতে পাটগ্রাম থানার ওসি সুমন্ত কুমার মোহন্তসহ ১০ জন পুলিশ সদস্য আহত হন। জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে ১৭ রাউন্ড ফাঁকাগুলি ছোড়ে পুলিশ।

রাত সাড়ে ১০টার দিকে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর ও পুলিশ সুপার (এসপি) আবিদা সুলতানা অতিরিক্ত পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ আনেন। নিহত জুয়েলের সঙ্গী সুলতান রুবায়াত সুমনকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছে পুলিশ।

রোববার (১ নভেম্বর) ঘটনাস্থল তদন্ত করে মসজিদের কোরআন অবমাননার কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছেন জাতীয় মানবধিকার কমিশনের অভিযোগ ও তদন্ত দলের পরিচালক আল মাহমুদ ফাউজুল কবির। এটা স্রেফ একটি গুজব বলে দাবি করা হয়েছে। এছাড়াও জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটিও কোরআন অবমাননার সত্যতা পাননি বলেও তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি সাংবাদিকদের জানান।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য