দিনাজপুর সংবাদাতাঃ দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (হাবিপ্রবি)-এ এবার রেজিষ্ট্রার পদকে নিয়ে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে- ওই পদে মুক্তিযোদ্ধা শিক্ষককে সরিয়ে রাজাকারের সন্তানকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। যদিও সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক জানিয়েছেন তার বাবা রাজাকার না। বিশেষ পরিস্থিতিতে রেজিষ্ট্রারের দায়িত্ব নেয়ায় কেউ ক্ষুন্ন হয়ে এটি করাচ্ছে। রাজাকারের সন্তানকে রেজিষ্ট্রার পদে দায়িত্ব দেয়ার প্রতিবাদে এবং মুক্তিযোদ্ধা শিক্ষককে পূর্ণবহালের দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করেছে ছাত্রলীগ।

এদিকে রেজিষ্ট্রারের দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়ার ৬ দিন অতিবাহিত হলেও নিরাপত্তাহীনতার কারণে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত অধ্যাপক মোহাম্মদ রাজিব হাসান। নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি দাবি জানিয়েছেন তিনি।

গত ৬ অক্টোবর গুরুত্বপুর্ণ প্রশাসনিক পদে নিয়োজিত ১৭ জন শিক্ষক উপাচার্যের বাসভবনে দেখা করতে যান। কিন্তু ওই সময়ে উপাচার্য তাদের সাথে দেখা করেননি। এই ঘটনায় উপাচার্যের অসহযোগিতায় একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাজে অচলাবস্থা সৃষ্টির অভিযোগ এনে ১৭ জন শিক্ষক তাদের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন থেকে কর্মবিরতি শুরু করেন। এই অবস্থায় গত ৭ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অফিস আদেশে অতিরিক্ত পদে দায়িত্বরত মেডিসিন সার্জারী এন্ড অবষ্ট্রেটিক্স বিভাগের প্রফেসর ডা. ফজলুল হককে রেজিষ্ট্রারের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয় এবং অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর মোহাম্মদ রাজিব হাসানকে রেজিষ্ট্রারের দায়িত্বে নিযুক্ত করা হয়। তবে নিযুক্ত হওয়ার পরপরই অধ্যাপক মোহাম্মদ রাজিব হাসানের বাবা আলী আজম মাষ্টার একজন রাজাকার ছিলেন বলে কথা উঠে।

এমন ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধে বিশ্বাসী গণতান্ত্রিক শিক্ষক পরিষদ গত ১১ অক্টোবর অধ্যাপক মোহাম্মদ রাজিব হাসানকে একজন স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী রাজাকারের সন্তান বলে অভিযোগ এনে ওই সংগঠন থেকে তাকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়। শুধু তাই নয় একই দিনে ওই পরিষদের সভাপতি প্রফেসর ড. ফাহিমা খানম ও সাধারন সম্পাদক প্রফেসর ডাঃ ফজলুল হক স্বাক্ষরিত এক নিন্দা বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রফেসর ডাঃ ফজলুল হককে গত ৭ আক্টোবর অনাকাংখিতভাবে অব্যাহতি দেয়া হয়।

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় নতুন রেজিষ্ট্রার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী পরিবারের রাজাকারের সন্তান (সুত্র-যুদ্ধাপরাধীর তালিকা ও বিচার প্রসঙ্গ, ডা. এম এ হাসান, প্রকাশ ২০০৯) প্রফেসর মোহাম্মদ রাজিব হাসানকে। রেজিষ্ট্রার পদে এহেন ন্যাক্কারজনক নিয়োগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি চরম অবজ্ঞার সামিল। বিবৃতিতে প্রফেসর রাজিব হাসানকে রেজিষ্ট্রার হিসেবে নিয়োগে তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন ও প্রফেসর ডাঃ মোঃ ফজলুল হককে পুনরায় রেজিষ্ট্রার হিসেবে বহালের দাবী জানাচ্ছে।

জানা যায়, এর আগে অধ্যাপক মোহাম্মদ রাজিব হাসান ওই শিক্ষক পরিষদের উপদেষ্ঠা এবং গত ২০১৯ সালের ১৩ অক্টোবর এই পরিষদের অনুষ্ঠিত নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কিছুদিন আগেও তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা শাখার পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ওই সময়ে তার বিরুদ্ধে এমন কোন অভিযোগ উত্থাপিত হয়নি। কিন্তু রেজিষ্ট্রারের পদে নিযুক্ত হওয়ার পরই তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে।

এদিকে গত ২৩ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যেবোধে বিশ্বাসী গণতান্ত্রিক শিক্ষক পরিষদের সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক স্বাক্ষরিত একটি পত্র উপাচার্যকে দেয়া হয়। যেখানে উল্লেখ করা হয় যে এই পরিষদের লিখিত মতামতগুলো মূল্যায়নে উপাচার্য অবজ্ঞা ও অবহেলা করছেন। কিন্তু শুরু থেকেই পরিষদের শিক্ষকরা উপাচার্যকে সাধ্যমত সহযোগিতা করে আসছে। তাই বর্তমান উপাচার্যের মেয়াদকাল সময়ের মধ্যে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করাসহ ৫টি দাবি জানানো হয়।
গত ৭ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মু. আবুল কাশেমের সাথে কথা হলে তিনি বলেছিলেন, যেসব অভিযোগ এনে ১৭ শিক্ষক কর্মবিরতি শুরু করেছিলেন সেসব অভিযোগ মিথ্যা। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগের যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়েছিল প্রশাসনিক কর্মকর্তারা দ্রুত সেই নিয়োগ দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করছেন। নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক কার্যক্রমে ব্যাঘাতসহ নানান কথা ছড়ানো হচ্ছে।

অপরদিকে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে বিশ্বব্যিালয়ের প্রধান গেটের সামনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ব্যানারে প্রায় ঘন্টাব্যাপী মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করা হয়। এ সময় বলা হয়, প্রফেসর ডা. ফজলুল হক একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্ববিদ্যালয়ে রেজিষ্ট্রারের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। কিন্তু সম্প্রীতি তাকে রেজিষ্ট্রারের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাজাকারের সন্তান প্রফেসর মোহাম্মদ রাজিব হাসানকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। এই ঘটনায় প্রশাসনের প্রতি তারা নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে পূর্বের রেজিষ্ট্রার প্রফেসর ডা. ফজলুল হককে পূর্ণবহালের দাবি জানান। কর্মসূচী চলাকালে বক্তব্য রাখেন ছাত্রলীগ হাবিপ্রবি শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মোরশেদুর আলম রনি, যুগ্ম সম্পাদক ধনেশ পাল, রিয়াদ খান, ফারুক, মশিউর রহমান, ইলিয়াস, সজল, সৈকত প্রমুখ।

এ ব্যাপারে সদ্য অব্যাহতিপ্রাপ্ত রেজিষ্ট্রার ডা. ফজলুল হক বলেন, যেহেতু উপাচার্য আমাদের কর্ম নিতে চান না এবং আমাদের সাথে দেখা করতে চান না এজন্য মান-অভিমানে কর্মবিরতিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তুলনামূলকভাবে ভাল কাজ করেননি। উনি বিশ্ববিদ্যালয়ে শত্রু তৈরী করে এবং বিভক্ত করে গেলেন, আজীবন এটা থাকবে। প্রতিকুল পরিবেশে আমি প্রশাসনকে সহায়তা করেছি, কিন্তু এখন আমাকে সরিয়ে একজন রাজাকারের সন্তানকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা, আমার দু:খ যে আমার চেয়ারে একজন রাজাকারের সন্তান বসবে। রাজাকার ও মুক্তিযোদ্ধা এই মেরু আর সেই মেরু। তাদের রক্ত আমাদের রক্তের সাথে মিল হতে পারে না। যারা মা-বোনকে ধর্ষণ করেছে, মানুষকে হত্যা করেছে তাদের সাথে আমাদের মিল হতে পারে না।

এ ব্যাপারে রেজিষ্ট্রারের নতুন দায়িত্ব পাওয়া প্রফেসর মোহাম্মদ রাজিব হাসান বলেন, আমার বাবা একটি প্রাইমারী স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। আমি শুনেছি যে যুদ্ধের সময় জনপ্রতিনিধিরা আমার বাবার অজান্তেই পাক হানাদার বাহিনীকে তাদের লোক হিসেবে আমার বাবার নাম দেন। যুদ্ধের পরে ওই তালিকাটি হাতে পেয়ে পুলিশ আমাদের বাড়িতে এসে বাবাকে সাথে নিয়ে যান। পরে আদালতের বিচারক আমার বাবার প্রতি কোন তথ্য-প্রমাণ না থাকায় স্বসম্মানে বেকসুর খালাস দেন। আমার এক বড়ভাই সেনাবাহিনীর মেজর ছিলেন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এসএসএফ’এ ছিলেন। যদি আমার বাবা রাজাকার হতেন তাহলে প্রধানমন্ত্রীর এসএসএফ’র দায়িত্বে থাকতে পারতেন না।

২০১৬ সালে উনি বাংলাদেশ বিমানের পরিচালক পদে আবেদন করেছিলেন। ওই সময়ে অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বিরা জানায় একটি বইয়ে আমার বাবার নাম রাজাকারের তালিকায় আছে। কিন্তু সেখানে নামের বানান ভুল। এটি আমরা প্রথমে জানতাম না এবং জানার পর স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধ কমান্ডে আবেদন দিলে তারা একটি প্রত্যয়ন দেন যে আমার বাবা রাজাকার ছিলেন না। আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা শাখার পরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করেছি। আমি বিশেষ পরিস্থিতিতে রেজিষ্ট্রারের দায়িত্ব নিয়েছি। এটাতে হয়তো কেউ কেউ ক্ষুন্ন হতে পারে এজন্য এসব কথা উত্থাপিত হচ্ছে। আমার বাবা একজন সম্মানীয় ব্যক্তি ছিলেন, তিনি মারা গেছেন তারপরও তার বিরুদ্ধে কথা বলা হচ্ছে, কোন বিবেচনা করা হচ্ছে না। আমি অত্যন্ত মনোকষ্ট নিয়ে দিনযাপন করছি। রেজিষ্ট্রারের দায়িত্ব পেলেও অফিসে যেতে পারছি না। আমার নিরাপত্তার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেই নিশ্চিত করতে হবে।

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মু. আবুল কাশেমের মোবাইলে (০১৭১৩১৬৩৩০০) বারবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তার কার্যালয়ে যাওয়া হলেও সেখানে তাকে পাওয়া যায়নি। আর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভিতরে তার বাসাতে যাওয়া হলেও ভিতরে প্রবেশের অনুমতি মেলেনি। তাই তার সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য