সামসউদ্দীন চৌধুরী কালাম, পঞ্চগড় থেকেঃ পঞ্চগড় সদর উপজেলার সদর ইউনিয়নের মোলানীপাড়া গ্রামে বুলবুলি বেগম (৭৫)। যৌবনে স্বামী সন্তান পরিবার পরিজনের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। পরিবারের কাজ করতে গিয়ে পাননি কোন মজুরী বা অভারটাইম। পরিবারের স্বচ্ছলতার জন্য ক্ষেতে খামারেও তাঁকে কাজ করতে হয়েছে। বাড়ী বাড়ী ঘুরে অসংখ্য নারীকে কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন। বুলবুলি বেগমের স্বামী পেশায় কাঠমিস্ত্রি ছিলেন। ছেলেও হয়েছেন কাঠমিস্ত্রি। পরিবারে আয়-রোজগার খুব একটা নেই। গত কয়েক বছর আগে বুলবুলি বেগম ব্রেইনস্ট্রোকে আক্রান্ত হন। এক হাত, এক পা অবস হয়ে যায়। সেই সাথে বাঁক শক্তিও হারিয়ে ফেলেন তিনি। ছেলে কাঠমিস্ত্রি রেজাউল সাধ্যমত মা’কে সুস্থ্য করার জন্য ঘুরেছেন বিভিন্ন ডাক্তারের কাছে। কিন্তু ডাক্তারসহ প্রয়োজীয় চিকিৎসা সেবা তিনি পাচ্ছেন না।

বোদা উপজেলার বেংহারী বনগ্রাম ইউপির ঝেরঝেরিয়াপাড়া গ্রামের যগেন্দ্রনাথ (৭০)। তিনিও একই রোগে আক্রান্ত হয়ে কঠিন সময় পার করছেন। বিছানা থেকে উঠতেই পারছেন না, বাক-শক্তিও হারিয়েছেন। সংসারে একমাত্র আয়ের ব্যক্তিটি তার ছেলে। সেও বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ্য। এরপরেও পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন ওঝা কবিরাজের কাছে নিয়ে গেছেন। এখন তিনি বিছানায় শুয়ে শুয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। বুলবুলি-যোগেনদের মত পঞ্চগড় জেলায় ব্রেইন স্ট্রেকে আক্রান্ত হয়ে হাজার হাজার নারী-পুরুষ পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে বিছানায় শুয়ে ওপারে যাওয়ার দিন গুনছেন। প্রচুর অর্থ খরচ করে তাদের পক্ষে সুস্থ্য হওয়ার ইচ্ছেটা অধরা। রাজধানী থেকে প্রায় ৫৫০ কিলোমিটার দুরের এ জেলার অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পঞ্চগড় জেলায় বাত, ব্যথা, পক্ষাঘাতগ্রস্থসহ নিউরো জটিলতা রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ২০ হাজার রোগী রয়েছে। এ সকল রোগির অধিকাংশরই প্রয়োজন ফিজিওথেরাপি। সরকার রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন-২০১৮ পাস করলেও মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের মাত্রা অত্যন্ত ধীর। দেশে প্রতিদশ হাজার জনের জন্য একজন ফিজিওটেকনিশান বা ফিজিওথেরাপিস্ট আছে যা চাহিদার তুলনায় অতি সামান্য। জেলায় সরকারি দুটি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র রয়েছে। সেগুলোতেও রয়েছে জনবল সংকট। অধিকাংশ সময় যন্ত্রপাতি বিকল থাকায় সাধারণ মানুষ প্রাপ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জেলায় সরকারি বা বেসরকারি আবাসিক কোন ফিজিওথেরাপি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা হয়নি। বেসরকারী পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দারিদ্র কল্যাণ সংস্থা অনাবাসিকভাবে সীমিত পরিসরে প্রতিবন্ধীদের ফিজিওথেরাপি সেবা দিয়ে আসছে ।

প্রত্যন্ত এলেকায় ক্যম্পেইনের মাধ্যমে মাইকিং করে সাধারন মানুষের মাঝে প্রতিদিন ফ্রি স্বাস্থ্য সেবা প্রদান এবং পর্রমশ দিয়ে আসছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটি। কারও কারও সামর্থ থাকলেও উপজেলা শহর বা গ্রামে ফিজিও টেকনিশিয়ান না থাকায় সাধারণ মানুষ এ সেবাটি নিতে পারছে না। যাদের টাকা রয়েছে তারও সেবা নিতে পারছেন না। যাদের নেই তারাও প্রাপ্ত সেবা নিতে পারছেন না। প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডেই ৫/৭ জন প্যারালাইসসি বা পক্ষাঘাতগ্রস্থ রোগীর সন্ধ্যান মিলছে। এর সাথে অন্যান্য ফিজিও সম্পৃক্ততা রোগীর সংখ্যাও কম নয়। এসব কারণে পঞ্চগড় জেলায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফিজিওথেরাপি টেকনিশিয়ান ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি।

এ নিয়ে কথা বললে পঞ্চগড়ের সিভিল সার্জন ডা. ফজলুর রহমান জানান, পঞ্চগড় জেলায় নিউরো জটিলতায় আক্রান্তের সংখ্যার সঠিক কোন পরিসংখ্যান নেই। এসকল রোগির জন্য প্রয়োজন বিষেশায়িত ইউনিট ও প্রয়োজনীয় জনবল। জেলায় সরকারিভাবে দুটি প্রতিবন্ধি সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র থাকলেও সেগুলোতেও রয়েছে জনবল সংকট। অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান না থাকায় অধিকাংশ সময় যন্ত্রপাতি বিকল থাকায় নিয়মিত চিকিৎসা সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য