যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে দুই বড় দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের মুখোমুখি বিতর্কে ডেমোক্র্যাট কমলা হ্যারিস ও রিপাবলিকান মাইক পেন্স তীব্র বাকযুদ্ধে জড়িয়েছেন।

বিতর্কের অনেকটাজুড়েই ছিল করোনাভাইরাস মহামারী মোকাবেলায় ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপ ও বর্ণবাদ ইস্যু।

ডেমোক্র্যাট ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কমলা হ্যারিস প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসনকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের ‘সবচেয়ে ব্যর্থ প্রশাসন’ হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়েছেন। অন্যদিকে রিপাবলিকান ভাইস প্রেসিডেন্ট পেন্স ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মহামারী মোকাবেলার পরিকল্পনা হোয়াইট হাউস থেকে ‘চুরি করা’ বলে অভিযোগ করেছেন।

জনমত জরিপগুলোতে ট্রাম্পের চেয়ে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের সামান্য এগিয়ে থাকার মধ্যেই বুধবার সল্ট লেক সিটির উটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে এই দুই ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী লাইভ টেলিভিশন বিতর্কে মুখোমুখি হয়েছিলেন বলে জানিয়েছে বিবিসি।

এদিন বিতর্কের এক পর্যায়ে একটি মাছির উড়ে এসে পেন্সের মাথায় বসা এবং দুই মিনিট অবস্থান করার ফুটেজ পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।

গত সপ্তাহে ট্রাম্প-বাইডেন উত্তপ্ত ও বিশৃঙ্খল বিতর্কের তুলনায় এদিন দুই ভাইস-প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর তর্ক-বিতর্ক ছিল বেশ শান্ত। প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের বিতর্কে বাইডেন ও ট্রাম্প একে অপরকে অপমান করেছেন, একজনের কথা বলা সময় অন্যজন বাধাও দিয়েছেন।

ভাইস প্রেসিডেন্টে প্রার্থীদের বিতর্কে তেমনটা দেখা যায়নি। পেন্স দুই-একবার কমলার কথার মাঝখানে কথা বলার চেষ্টা করলেও বাইডেনের রানিংমেটকে তাৎক্ষণিকভাবে বলতে শোনা গেছে, “মিস্টার ভাইস প্রেসিডেন্ট, আমি কথা বলছি, আমি কথা বলছি।”

দেড় ঘণ্টার এ বিতর্কে দুইজনের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডাও হয়েছে। পেন্স ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে করোনাভাইরাসের ভয়াবহতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের বিভ্রান্ত করার অভিযোগ এনেছেন কমলা হ্যারিস।

“তারা জানতেন আর তারা তা লুকিয়েছেন, এর মাধ্যমে তারা পুনর্নির্বাচন করার অধিকারও হারিয়েছেন,” বলেন ক্যালিফোর্নিয়ার ৫৫ বছর বয়সী এ সিনেটর।

রিপাবলিকান পেন্স তার বক্তব্যে বাইডেন-হ্যারিস শিবিরের বিরুদ্ধে হোয়াইট হাউসের মহামারী মোকাবেলার কৌশল হুবহু নকল করার অভিযোগ করেন। এর মাধ্যমে তিনি ১৯৮৭ সালে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মনোনয়নের দৌড় থেকে বাইডেনের ছিটকে পড়ার দিকেও ইঙ্গিত করেন। সেবার বাইডেনের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ লেবার নেতা নেইল কিনোকের বক্তৃতা চুরির অভিযোগ উঠেছিল।

বিতর্কের এক পর্যায়ে সঞ্চালক নির্বাচনের আগে কোনো টিকা অনুমোদন পেলে ও সরবরাহ শুরু হলে হ্যারিস তা গ্রহণ করবেন কিনা জানতে চাইলে ডেমোক্র্যাট ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বলেন, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা না বললে কেবল ট্রাম্পের কথায় তিনি টিকা নেবেন না।

“আসলে ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে কোনো টিকা এলেও আপনি (কমলা হ্যারিস) ওই টিকার বিষয়ে ধারাবাহিকভা জনগণের আস্থা হ্রাসের চেষ্টা করবেন, যাকে বিবেকবর্জিত কাজ বলেই আমি মনে করি,” ডেমোক্র্যাট প্রতিদ্বন্দ্বীর অবস্থানের জবাবে বলেন হোয়াইট হাউসের করোনাভাইরাস টাস্ক ফোর্সের প্রধান পেন্স।

বর্ণবাদ নিয়ে আলোচনায় মার্কিন এ ভাইস প্রেসিডেন্ট জানান, মিনেসোটায় জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ড তাকে মর্মাহত করেছে।

“তবে এরপরও দাঙ্গা ও লুটপাটের কোনো যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে না,” বলেন তিনি।

পেন্স অডিটোরিয়ামে থাকা তার এক অতিথি ফ্লোরা ওয়েস্টব্রুকসের প্রসঙ্গও তোলেন। মিনিয়াপোলিসে সাম্প্রতিক অস্থিতিশীলতার সময় কৃষ্ণাঙ্গ এ নারীর ‘হেয়ার স্টুডিও’ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল।

বিতর্কের এক পর্যায়ে পেন্স বলেন, বাইডেন ও হ্যারিস যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘পদ্ধতিগতভাবে বর্ণবাদী দেশ’ এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে মার্কিন পুলিশ পক্ষপাতমূলক আচরণ করে বলে দাবি করে আসছে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘মারাত্মক অপমানজনক’।

পেন্সের এ অভিযোগের প্রেক্ষিতে হ্যারিস বলেন, “গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ৭ কোটি মার্কিনির সামনে একটি বিতর্ক মঞ্চে দাঁড়িয়ে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের নিন্দা জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।”

“সত্য নয়, সত্য নয়,” উত্তরে বলেন পেন্স। কমলা হ্যারিস যখন সান ফ্রান্সিসকোর কৌঁসুলি ছিলেন, তখন ছোটখাট মাদক সংক্রান্ত অপরাধে শ্বেতাঙ্গ কিংবা লাতিন বংশোদ্ভূতদের চেয়ে আফ্রিকান-আমেরিকানদেরই বেশি বিচার হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।

বুধবারের বিতর্কে কমলা চীনের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘শুল্ক যুদ্ধেরও’ বিরোধিতা করেন, এর ফলে উৎপাদন খাতে মন্দা দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন যুক্তরাষ্ট্রের বড় কোনো দলের হয়ে প্রথমবারের মতো ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করা কৃষ্ণাঙ্গ এ নারী।

“শুল্ক যুদ্ধে আপনারা হেরে গেছেন। আপনারা হেরেছেন,” বলেন কমলা হ্যারিস।

পাল্টা উত্তরে পেন্স বলেন,“চীনের সঙ্গে শুল্ক যুদ্ধে হার? জো বাইডেন কখনো এই যুদ্ধ করেননি। বাইডেন গত কয়েক দশক ধরেই কমিউনিস্ট চীনের চিয়ারলিডারের ভূমিকায় আছেন।”

কমলা হ্যারিস তার বক্তব্যে নিউ ইয়র্ক টাইমসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রকাশিত ট্রাম্পের বছরে মাত্র ৭৫০ ডলার কর দেয়ার প্রসঙ্গও টানেন। ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা এবং বিশ্বের বিভিন্ন অংশের স্বৈরশাসকদের কাছে টেনে নিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পেন্স এর জবাবে বলেন, ট্রাম্পের নির্দেশেই মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের আবু বকর আল-বাগদাদি ও ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলেমানিকে হত্যা করা হয়েছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য