কোভিড-১৯ মোকাবেলায় লকডাউন নীতির ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সতর্কবার্তা দিয়ে শুরু হওয়া বৈশ্বিক আন্দোলনে কয়েক হাজার বিজ্ঞানী ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ যুক্ত হয়েছেন।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লকডাউন সমাজে বিরূপ প্রভাব রাখার পাশাপাশি মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ‘ভয়াবহ প্রভাব’ ফেলছে বলে অভিমত দিয়েছেন প্রায় ছয় হাজার বিশেষজ্ঞ, যাদের মধ্যে যুক্তরাজ্যেরও কয়েক ডজন বিশেষজ্ঞ রয়েছেন।

তাদের মতে, করোনাভাইরাস সুরক্ষা নীতিতে এই রোগে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে, আর স্বাস্থ্যবানরা স্বাভাবিক জীবনযাপন চালিয়ে যাবেন।

তবে তাদের এই অভিমত নিয়ে বিজ্ঞানী মহলে মতভেদ রয়েছে, অন্যরা এর ঝুঁকির দিকগুলো নিয়ে সতর্ক করেছেন।

তারা কিছু বিষয় নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। সেগুলো হল:

এতে অসহায় জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

এবং করোনাভাইরাসের দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার কারণে আরও অনেকে ঝুঁকিতে থাকবেন।

তবে ‘গ্রেট ব্যারিংটন ডিক্লারেশন’ নামে পরিচিতি পাওয়া এই আন্দোলনে যুক্ত যুক্তরাজ্যের একদল চিকিৎসকের লেখা একটি চিঠিতেও এই বিষয়গুলো উঠে এসেছে ভিন্নভাবে।

টেলিভিশন অনুষ্ঠানের কারণে পরিচিত মুখ ডা. ফিল হ্যামন্ড ও ডা. রোজম্যারি লিওনার্ডসহ ৬৬ জন ‘জেনারেল প্রাকটিশনার’, যাদের অনেকে ব্রিটিশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের উচ্চ পদে ছিলেন, তারা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে একটি চিঠি লিখেছেন যে, কোভিড-১৯ মোকাবেলার নীতি নির্ধারণীতে কোভিড বহির্ভূত ক্ষতির ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।

‘গ্রেট ব্যারিংটন ডিক্লারেশন’ কী?

এই আন্দোলন শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রে। এখন বিশ্বের প্রায় ছয় হাজার বিজ্ঞানী এবং ৫০ হাজার সাধারণ মানুষ এই ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছেন।

এতে স্বাক্ষরকারী যুক্তরাজ্যের বিশেষজ্ঞদের মধ্যে রয়েছেন:

ডা. সুনেত্রা গুপ্ত, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির মহামারী বিশেষজ্ঞ।

নটিংহ্যাম ইউনিভার্সিটির ‘সেলফ-হার্ম’ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এলেন টাউনসেন্ড।

এডিনবার্গ ইউনিভার্সিটির ‘ডিজিজ মডেলার’ ডা. পল ম্যাককেগি।

তারা বলছেন, টিকা না আসা পর্যন্ত লকডাউন চালিয়ে গেলে ‘অপূরণীয় ক্ষতি হবে’ এবং সুবিধাবঞ্চিতরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

যেসব স্বাস্থ্য ক্ষতির কথা বলা হচ্ছে:

শিশুদের টিকা দেওয়ার হার কমে যাওয়া।

হার্ট ও ক্যান্সারের রোগীদের যথাযথ সেবা বঞ্চিত হওয়া।

তারা বলছেন, জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হওয়ায় বৃদ্ধ ও অসুস্থরাসহ সবার ক্ষেত্রেই সংক্রমণের ঝুঁকি কমেছে। এবং এটাই অনেক বেশি ‘সমবেদনামূলক’ নীতি হবে।

ওই ঘোষণায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণদের সুরক্ষায় বেশ কয়েকটি পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে কেয়ার-হোম কর্মীদের নিয়মিত করোনাভাইরাস পরীক্ষার মতো বিষয় রয়েছে।

অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ঘরে নিত্যপণ্যসহ অন্যান্য জরুরি জিনিসপত্র পৌঁছে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এবং সম্ভব হলে তারা ঘরের বাইরে গিয়েই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারবেন। সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার মতো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা মেনে চলা এবং অসুস্থ হলে ঘরে থাকা- এই নিয়মগুলো সবার মেনে চলতে হবে।

অন্য বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

ইউনিভার্সিটি অব লিডসের স্কুল অব মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক স্টেফেন গ্রিফিন বলেন, এটা ঠিক যে এর ‘উদ্দেশ্য ভালো’। তবে এই ঘোষণার নৈতিক, লজিস্টিক ও বৈজ্ঞানিক ত্রুটি রয়েছে।

এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিরা সব শ্রেণিতে রয়েছে এবং তাদের সঙ্গে ‘সমান আচরণ’ করাটাও তাদের প্রাপ্য। এছাড়া মৃদু উপসর্গ দেখা দেওয়ার পরেও অনেকের ক্ষেত্রে কয়েক মাস ধরে মূর্ছা যাওয়া ও হাত-পায়ের গিটে ব্যথা হওয়ার মতো সমস্যা থেকে যাচ্ছে।

ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ের সেলুলার বায়োলোজি বিশেষজ্ঞ ডা. সিমন ক্লার্ক বলছেন, ‘হার্ড ইম্যুনিটি’ অর্জন সম্ভব কি না তাও স্পষ্ট নয়।

“রোগটির বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক, স্থায়ী ও সুরক্ষামূলক ইম্যুনিটি দরকার। এবং আমরা জানি না যে, রোগটি থেকে সেরে ওঠার পর কতটা কার্যকর ও স্থায়ী ইম্যুনিটি তৈরি হবে।”

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য