শাড়ি, চুড়ি, কানের দুল, চুলের খোপায় ফুটে উঠে এদেশের মেয়েদের প্রকৃত রুপ। এখানে অশালীন কি কিছু আছে, বা মনে হচ্ছে?

গতকাল সন্ধায় মার্কেটের সামনে আড্ডা দিচ্ছিলাম, কাপড়ের মার্কেট নানা ধরনের নারী পুরুষের আনাগোনা। যারা আসেন তারা প্রায় সবাই গোছালো। কাল লক্ষ করলাম কটা উঠতি বয়সের ছেলে দুটো মেয়েকে দেখছে আর ছোট ছোট রসালো টিটকারি করছে।

মেয়ে গুলোর বয়স ১৪/১৫ হবে তারা পরিবারের সাথে ছিল। সম্ভবত কারো বিয়ের কেনাকাটা করতে এসেছিল। ছেলে গুলোর পাশ দিয়ে এ দোকান ও দোকান ঘুরোঘুরি করছে এবং বিব্রত বোধ করছে। ছেলে গুলো বেহায়ার মত ওদের দিকে তাকিয়ে হাসাহাসি করছে।

পরে লক্ষ করলাম মেয়ে দুজনের ঘাড়ের কাছে ব্লাউজের পাশ দিয়ে ব্রার ফিতা বেরিয়ে এসেছে, সেটা দেখে ছেলে গুলো অসম্ভব যৌন আনন্দ উপভোগ করছে। অনেকে হয়তো মেয়ে গুলোকে দোষারোপ করবে, তবে মেয়ে গুলোর কোন দোষ আছে বলে আমি মনে করিনা। ওদের বয়সের তুলনায় পরনের শাড়ি ভারি ছিল, ওরা তো সবে সামলাতে শিখছে। আমরা ছেলে গুলোকে ওখান থেকে তাড়িয়ে দিলাম।

আমাদের দেশে মেয়ে জাত নিষিদ্ধ প্রানীতে পরিনত হচ্ছে, আর নিষিদ্ধ জিনিষের প্রতি মানুষের আগ্রহ চিরকালের। কবে কোথায় কখন এই ধ্যানধারণা শুরু হয়েছে বলা মুশকিল।

তবে এর প্রভাব আমরা বারবার দেখতে পাচ্ছি প্রতিদিনের খবরের কাগজে। নারী শরীর এখন বাংলাদেশের পুরুষদের সবচেয়ে কামনার বস্তু, অবিবাহিত বা বিবাহিত প্রায় সবাই নারী শরীর লোভে আসক্ত ফলাফল ধর্ষনের মত বর্বর ভয়াবহ পরিনতি।

কিছু কিছু মানুষকে বলতে শুনি পোষাকের দোষে মেয়েরা ধর্ষিত হয়। আসলে দোষটাকি পোষাকের না পুরুষের পশুসুলভ বাসনার। প্রতিটা পুরুষের ভেতর একটা করে পুশুর বসবাস করে, কারোটা অপ্রকাশ্য কারোটা প্রকাশ্যে বেরিয়ে আসে। এটা অস্বিকার করার ক্ষমতা কারো নেই।

সহপাঠীর কাছে ধর্ষিত, প্রেমিকের কাছে ধর্ষিত, শিক্ষকের কাছে ধর্ষিত, বখাটের কাছে ধর্ষিত, হাটে ধর্ষিত, মাঠে ধর্ষিত, বাড়িতে, মাদ্রাসায়, মন্দিরে গর্জায়, রাস্তাঘাটে, স্কুলে, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস সবখানে ধর্ষিত হচ্ছে মেয়েরা। বেশ কদিন খবরে পেলাম বাবার কাছে দীর্ঘদিন ধরে ধর্ষিত, শ্বশুরের হাতে ছেলে বউ ধর্ষিত।

ঘটনা গুলো এতটাই জঘন্য যে এবিষয়ে আমি আর ভাবতেও পারছি না কত বড় নরপশু হলে এমন ঘটনা ঘটাতে পারে। এই দেশের মেয়েরা তাহলে কাকে বিশ্বাস করবে। বাংলাদেশে মেয়েদের বিশ্বাস করার মত পুরুষ মানুষের সংখ্যা পাতিলের তলানিতে, সব পুরুষ ধিরেধিরে দেহ লোভি দেহ ভোগি হয়ে উঠচ্ছে। এখন নিজ পরিবারের কাছেও কোন মেয়ে নিরাপদ নয়। দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে তারা কোথাও নিরাপদ না। ধর্ষকদের সমর্থনে পত্রিকা গুলো ইদানিং ধর্ষন করেছে লিখে না, লিখে ধর্ষনের চেষ্টা করেছে।

আমাদের দেশ মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় এখানে ইসলাম ধর্মের প্রভাব বেশি। প্রতিটা বাবা মা চায় তাদের সন্তান ধর্মীয় ভাবে শিক্ষিত হোক। ইসলাম কখনও ধর্ষনকে সমর্থন করে না। যদিও ধর্মের বাহকরা বরাবর ধর্ষিতাকে দোষারোপ করে থাকে তার নিজের সর্নাশের জন্য। তারা বোঝাতে চায় ধর্ষিতা আমন্ত্রনে ধর্ষন, ধর্ষক নির্দোষ।

ব্যপারটা আসলে প্রাচীন ভারতীয় সনাতন ধ্যানধারণা থেকে আগত। সময়ের বিবর্তনে তারা পরিবর্তন হলেও প্রথাটা এই উপমহাদেশের ইসলাম পন্থীরা আকড়ে ধরে রেখেছে। ঘরের বউ করতে কুমারি কিশোরী মেয়ের খোঁজে, তল্লাটে তল্লাটে ঘুরে ঘুরে পাড়ামহল্লা, জেলা একাকার করে ফেলছে মুসলমানরা। অথচ নবীজির স্ত্রীরা তার চেয়ে বয়সে বড়, অসহায় বিধবা, নির্যাতিত নারী ছিল সেই উদাহরনে থেকে বহু দুরে বর্তমান।

কিছু কিছু প্রথা যা এক সময় সনাতন ধর্মের অন্তরভুক্ত ছিল। বাড়ীর বউদের অন্দর মহলে বাস, পৃথিবীর সাথে তাদের আর কোন যোগাযোগ নেই, বিয়ের পর বাবা মা, ভাই বোনের সাথেও যোগাযোগ করতে দেওয়া হতো না। এধরনের প্রাচীন সনাতন প্রথা এসে উপমহাদেশে ইসলাম ধর্মে ঢুকেছে।

সমতা, শিক্ষা, মানবতা সবকিছু বাদ দিয়ে এখন মেয়েদের পর্দায় রাখতে আন্দলোনে মগ্ন আলেম ওলামারা। তাদের জ্ঞান ভান্ডার জুড়ে শুধু পর্দা, মেয়েদের পর্দায় রাখতে হবে এবং তাদের পর্দা ফাটাতে হবে ছাড়া আর কোন সমাধান নেই।

তবে দেশের পুরুষত্বের যা অবস্থা আলেম ওলামাদের কথা না শুনে আর কি করা। অন্যদিকে যদি কোন উঠতি বয়সের মেয়েকে ধর্মগ্রন্থ বা সাধারন শিক্ষার প্রয়োজনে কোন বাড়িতে গৃহশিক্ষক, হুজুর বা ঠাকুর নিয়োগ দেওয়া হয়, কিছুদিনের ভেতরে তাদের আধিকাংশই পর্দা ভেদ করে ওই বাড়ীর জামাইতে রুপান্তরিত হয়ে যান কিংবা শিক্ষার্থীকে অন্তঃসত্ত্বা করে পলাতক। পরে ধরা পড়লে বিচারে মেয়ের ছলনায় বিপথগামী হয়েছিল বলে সেই নির্যাতিত মেয়েটাকেই বজ্জাত বেশ্যা প্রমান করে সসম্মানে সেই এলাকা ত্যাগ করতে পারে ওই ধর্ষক।

এ হলো আমাদের ধর্মের কিছু খারাপ অভিজ্ঞতা, গত পরশু দেখলাম রাজশাহির এক গর্জায় কিশোরীকে তিনদিন ধরে আটকে রেখে ধর্ষন করেছে সেখানকার ফাদার। ঘটনা পুলিশে যাওয়ার পর সে বলেছে কিশোরী তাকে ছলনা ফেলার চেষ্টা করেছে। তিনি নিরপরাধ। সংখ্যা কম বলে খ্রীষ্টান জাতির ভেতরে ঘটা এধরনের অশ্লিল ঘটনা গুলো নিজেদের ভেতরে লিকিয়ে রাখতে পারে, খুব কম সংখ্যার ঘটনা প্রকাশ পায়।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এক কিশোরী যে মাঠ থেকে ঘাস কেটে না নিয়ে গেলে বাসায় ভাত দেয় না সে কি করে এরকম ছলনা করলো বা শিখলো। সংখ্যা গরিষ্ঠ রাই শুধু এ অপকর্ম করছে না। এরকম অন্য ধর্মেও দেখেছি। অসংখ্য মন্দির আছে যেখানে নারী প্রবেশ নিষিদ্ধ, আবার সেখানকার সাধু পুরোহিত বাবাদের যৌন লালসার খবর গোপন থাকেনি। সাংবাদিকতা করতে গিয়ে জীবনে এধরনের বহু অভিজ্ঞতা হয়েছে। যেখানে সব শেষে মেয়েরাই দোষী প্রমানিত হয়।

আমার ই-মেইলে নোয়াখালিতে ৩৫ বছর বয়সের এক বিধবাকে দলবেধে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়েছিল এক মানবাধিকার সংগঠন। এদেশের মানুষ কতটা নিচে নামেছে যা আসলে চোখে না দেখলে বোঝা সম্ভব না।

ঘটনার কারন আমি মনে করি সেই নির্যাতিতা ওই সন্ত্রসী বাহিনির কারো কুপ্রস্তবে সাড়া না দেওয়ায় এমন হিংস্র ভাবে নির্যাতিত হয়েছে। এদিকে সিলেটে কলেজের ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে রেখে তরুণী গৃহবধুকে গনধর্ষন। মানুষের মন মানসিকতার অধপতন কি এক দিনে হয়েছে? আমি তা বিশ্বাস করি না। এরকম হাজার হাজার ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায়, প্রভাবশালীদের ক্ষমতার প্রভাবে।

বৃটিশ শাসন আমলে মানুষের এরকম পুশুবৃত্তিকে শান্ত করার জন্য বিভিন্ন এলাকায় পতিতালয় উন্মুক্ত করা হয়েছিল। পতিতালয় বা কুঠিবাড়ী তার আগেও ছিল, তবে তা ছিল শুধু রাজা এবং রাজ দরবারের পদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য। বৃটিশরা নিজেদের সৈন্যদের জন্য এসব উন্মুক্ত করে দেয়, যেখানে সাধারন মানুষ যাতায়াত করতে পারতো।

বাংলাদেশে এরশাদ সরকারের শাসনামলে মৌলবাদি সংগঠনের চাপে অধিকাংশ পতিতালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়। পতিতাবৃত্তি অবশ্যই গুনহা। কিন্তু পতিতালয় গুলো বন্ধ করায় দেশের পাড়ায় পাড়ায় মিনি পতিতালয় চালু হয়ে গেছে। যেখানে সমাজের গন্যমান্য ব্যাক্তিদের আনাগোনা। আর সেই গন্যমান্য ব্যক্তি ও পতিতা বা তাদের সন্তানদের সংস্পর্শে এসে সমাজের অনেক ভাল ভদ্র ঘরের ছেলেমেয়েরা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

একটা বিষয় যা না বললেই নয়, প্রযুক্তির প্রভাব এসবের আরো একটি কারন। মাত্র ২০/৩০ টাকার বিনিময়ে যে কোন কম্পিউটারের দোকানে পাওয়া যায় গিগাবাইট ভর্তি রগরগে পর্ণ ভিডিও। পর্ণ ভিডিওর প্রভাব শহর তো শহর, গ্রামগঞ্জে এমন ভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, যেভাবে করোনা ভাইরাস বাংলাদেশে ছড়াতে পারেনি। মাত্র বিশ তিরিশ টাকার লোভে কিছু অসাধু ব্যক্তি এসব ছড়িয়ে দিচ্ছে যুব সমাজে।

সেক্স এবং সেক্স সম্পর্কিত আলোচনা এই উপমহাদেশে একেবারে নিষিদ্ধ ব্যপার। ইসলামে সেক্স মানে জেনা করা। কোন মহফিলে জেনা সম্পরকে আলোচনা করার সময় হুজুর জেনা শব্দটাকে এমন ভাবে উচ্চারন করেন, যেন স্ত্রীর সাথে সেক্স করাও জেনা। তাদের বক্তব্যে মেয়েদের পোশাক আর সেক্স সম্পর্কে এতটাই ঘৃনা বেরিয়ে আসে যেন তারা বাবা মায়ের সেক্স ছাড়াই পৃথিবীতে এসেছেন। তাদের ভন্ডামির কারনে মানুষের মধ্যে সেক্স সম্পর্কে আগ্রহ বাড়ে যায়। আগেই বলেছি নিষিদ্ধে প্রতি মানুষের আগ্রহের কোন সীমা নেই।

প্রসাব পায়খানার মত শারীরে সেক্সের চাহিদাটা প্রাকৃতিক। এসম্পর্কে যত আলোচনা হবে ততই মানুষের ধারনা বৃদ্ধি পাবে। অন্তত পুরুষরা জানবে যৌনাঙ্গে আঘাত পেলে তারা যেমন ব্যথা এবং কষ্ট পায় তেমন মেয়েরাও ব্যথা ও কষ্ট অনুভব করে। তাদের শরীরে দেওয়া প্রতিটা আচোড়, কামোড়, আঘাত তাদের সমপরিমা কষ্ট ও যন্ত্রনা দেয় যা একজন পরুষের শরীর অনুভব করে। আর ধর্মীয় ভাবে বিভিন্ন মাসালা উদাহরন সহকারে সেক্স সম্পর্কে আলোচনা হলে ধর্ষন জাতিয় জঘন্য অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব হতো। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কে করবে?

প্রাচীন সনাতন প্রথায় আসক্ত অযোগ্য অশিক্ষিত মুর্খদের দিয়ে এ ধরনের কাজ কখনও সম্ভব নয়। তারা মানতে চায় না তাদের চেয়ে বেশি কেউ জানতে পারে, শিক্ষিত হতে পারে। তারা তাদের প্রভাবে ভাগ বসাতে দিতে চায় না। আল্লাহ্ যদি কাউকে পাঠায় তখন ওই মল্লারা দল বেধে তার পেছনে লেগে পড়ে তাকে বিতাড়িত করার জন্য। আমি বারবার হয়তো ধর্মকে দোষারোপ করে যাচ্ছি, আসলে দোষি ব্যক্তিদের যদি দৃষ্টান্তমুলক সাজা না নিশ্চিত করা যায় সেখানে সামাজিক অবক্ষয় নেমে আসবেই, যেকারনে ভুক্তভুগি দেশের অসহায় নারীরা।

সময়ে পরিবর্তনে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রছাঁয়ায় এবং তাদের প্রশ্রয়ে ধর্ষকদের উত্থান। ধর্ষকরা জামিনে বেরিয়ে এসে প্রভাব খাটিয়ে মামলার মিমাংসা করেছে, হুমকি ধুমকি দিয়ে বাদিকে মামলা তুলে নিতে বাধ্য করেছে, এই দেশে এরকম ঘটনার অভাব নেই। ধর্ষকের সাজা এবং আইনের ব্যবহার যতক্ষণ পর্যন্ত না নিশ্চিত করা যাচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশ মেয়ে জাতির জন্য কোন ভাবে নিরাপদ না। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে যা বোঝায় এখন কেউ গ্যারান্টি দিতে পারবে না, তার স্ত্রী, বোন অথবা মেয়ে আজ ধর্ষিত হবে না।

আজাদ জয়
সম্পাদক দিনাজপুরনিউজ

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য