ভারতের ৮ কোটি দলিত নারী তাদের সম্প্রদায়ভুক্ত পুরুষদের মতোই কয়েকশ বছর ধরে চলে আসা হিন্দু ধর্মের বর্ণপ্রথার নিষ্ঠুর নিষ্পেষণের শিকার। ভারতে মোট নারীর এ ১৬ শতাংশকে সবসময় ‘তিনটি বোঝা’ নিয়ে চলতে হয়- লিঙ্গ বৈষম্য, জাতপাত ভেদ এবং অর্থনৈতিক বঞ্চনা।

“আমরা সহিংসতার শিকার হচ্ছি, কারণ আমরা গরিব, নিচু জাত এবং নারী; তাই সবার কাছেই অপদস্থ হই। কেউই আমাদের পক্ষে বলে না বা আমাদের সাহায্য করে না। আমরা সবচেয়ে বেশি যৌন নিপীড়নের শিকার হই, কারণ আমাদের কোনো ক্ষমতাই নেই,” কয়েক বছর আগে গবেষক জয়শ্রী মঙ্গুবাইকে এমনটাই বলেছিলেন এক দলিত নারী।

তার এ কথার সমর্থনে ভুরি ভুরি নজির হাজির করা সম্ভব। সর্বশেষ কয়েক সপ্তাহ আগেও উচ্চ বর্ণের চার পুরুষের বিরুদ্ধে উত্তর প্রদেশের হাথরাসে ১৯ বছর বয়সী এক দলিত নারীর উপর হামলা ও দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত সপ্তাহে ওই তরুণীর মৃত্যু হয়েছে।

হাথরাসের এই ঘটনা ফের ভারতের দলিত নারীদের উপর যৌন সহিংসতার বিষয়টিকে পাদপ্রদীপের আলোয় তুলে এনেছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে বিবিসি।

“দলিত নারীরা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে নিষ্পেষিত গোষ্ঠী। তারা বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয়ভাবেই সংস্কৃতি, কাঠামো ও অত্যাচারী প্রতিষ্ঠানের নির্যাতনের শিকার। এসবের কারণেই দলিত নারীরা চিরকাল ধরেই সহিংসতার শিকার হয়ে আসছে,” বলেছেন কাস্ট ম্যাটারস গ্রন্থের লেখক ড. সুরাজ ইয়েংদে।

দলিত নারীদের উপর হওয়া অন্য সব হামলার মতো হাথরাসে তরুণী ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাতেও একই ছক দেখা গেছে।

মামলা নিতে পুলিশের দেরি, তদন্তে ধীরগতি, ধর্ষণ নিয়ে কর্মকর্তাদের সন্দেহ পোষণ, এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে জাতপাত প্রথার কোনো সম্পর্ক নেই- এ ধরনের ইঙ্গিত দেওয়া এবং বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের উচ্চ বর্ণের অপরাধীদের পক্ষ নেওয়া।

উচ্চ বর্ণের সাংবাদিকদের আধিপত্য থাকায় এমনকি অনেক গণমাধ্যমও প্রশ্ন তোলে, কেন যৌন সহিংসতার সঙ্গে বর্ণপ্রথাকে সংযুক্ত করা হবে?

গত সপ্তাহে হাথরাসের ওই তরুণীর মৃত্যুর পর ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উচ্চ বর্ণের রাজনীতিক যোগী আদিত্যনাথের সরকার তড়িঘড়ি করে মরদেহের সৎকার করায়। তার প্রশাসন গণমাধ্যম ও বিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের মৃত তরুণীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে না দেওয়ার মাধ্যমে এই ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে কিনা, সে সন্দেহও বাড়ছে।

এটা যে দলবদ্ধ ধর্ষণের কোনো ঘটনা নয়, তার সপক্ষে ভাষ্য হাজির করতে নজিরবিহীনভাবে উত্তর প্রদেশের সরকার একটি পাবলিক প্রাইভেট রিলেশনস এজেন্সিকে ভাড়াও করেছে।

বিবিসি জানিয়েছে, ভারতের হিন্দু অধ্যুষিত বেশিরভাগ অঞ্চলেই ভূমি, সম্পদ এমনকি সামাজিক ক্ষমতাও মূলত উচ্চ ও মাঝারি বর্ণের হিন্দুদের হাতেই থাকে।

দলিতদের উপর বর্বর নির্যাতন ও নৃশংসতা বন্ধে ১৯৮৯ সালে একটি আইন করা ছাড়া ভারতের কোনো সরকারই দলিত নারীদের সহিংসতার হাত থেকে বাঁচাতে কোনো ধরনের পদক্ষেপই নেয়নি। এখনও এ নারীদেরকে লাঞ্ছনা, শারীরিক নিপীড়ন, ধর্ষণ ও হত্যায় সহজেই দায়মুক্তি মেলে।

ভারতে গত বছর প্রতিদিন গড়ে ১০ জন দলিত নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে সরকারি তথ্যেই দেখা গেছে।

উত্তর প্রদেশে ভারতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে; মেয়েদের উপর যৌন নিপীড়নের সংখ্যাও এ রাজ্যে সবচেয়ে বেশি।

অন্যদিকে ভারতে দলিতদের উপর যে পরিমাণ নিপীড়নের ঘটনা ঘটে, তার অর্ধেকের বেশিই দেখা যায় উত্তর প্রদেশ, বিহার ও রাজস্থানে। ২০০৬ সালে ভারতের চার রাজ্যের ৫০০ দলিত নারীর উপর চালানো এক জরিপে তাদের উপর হওয়া নানা ধরনের নির্যাতনের তথ্য উঠে আসে।

জরিপে অংশ নেওয়াদের মধ্যে ৫৪ শতাংশ শারীরিক নির্যাতন, ৪৬ শতাংশ যৌন হয়রানি, ৪৩ শতাংশ নিজেদের ঘরে সহিংসতার শিকার হওয়ার কথা জানান। ২৩ শতাংশ জানান তারা ধর্ষিত হয়েছেন; গালাগালির শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন ৬২ শতাংশ নারী।

কেবল অন্যদের হাতে নয়, দলিত নারীরা এমনকি তাদের সম্প্রদায়ের সদস্যদের হাতেও নিয়মিতই নির্যাতিত হয়ে আসছেন।

দলিতদের অধিকার নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর দলিত রাইটস গ্রুপ দলিত নারী ও মেয়েদের উপর ২০০৪ সাল থেকে ২০১৩ পর্যন্ত ১৬ জেলায় হওয়া ১০০ যৌন সহিংসতার ঘটনা যাচাই বাছাই করে দেখেছে। তাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে ৮৫ শতাংশ নির্যাতিত নারীর বয়স ৩০ এর নিচে; এর মধ্যে ৪৬ শতাংশের বয়স ১৮-র নিচে।

দলিত সম্প্রদায়ের সদস্য বিশেষ করে নারীরা এখন তাদের উপর নির্যাতন নিয়ে সরব হওয়ার কারণে বেশি সহিংসতার শিকার হচ্ছেন বলেও অনেকের ধারণা।

২০০৬ সালে জমির বিরোধকে কেন্দ্র করে উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের হাতে এক দলিত পরিবারের ৪ সদস্য খুন হওয়ার পর থেকেই মূলত দলিতরা তাদের উপর হওয়া অপরাধের প্রতিবাদের ব্যাপারে সচেতন হয়ে উঠতে শুরু করেন।

জমির বিরোধকে কেন্দ্র করে গ্রামের উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের বিরুদ্ধে দুই দলিত নারী থানায় অভিযোগ করতে যাওয়ার পর মহারাষ্ট্রের খাইরলাঞ্জি গ্রামে ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

“ভয়াবহ এ ঘটনা দলিতদের আলোড়িত করে এবং তাদের সামাজিক দুর্দশা ও বৈষম্যের বিষয়গুলো সামনে আসে,” বলেছেন ইতিহাসবিদ উমা চক্রবর্তী।

দলিতদের এ জেগে ওঠাকে ভালোভাবে নেয়নি উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা। তারা তাদের নিপীড়ন ও আক্রমণের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।

গত সপ্তাহে হাথরাসে ১৯ বছর বয়সী নারীর মৃত্যুর ঘটনাতেও তাদের পরিবারের সঙ্গে উচ্চ বর্ণের একটি হিন্দু পরিবারের দুই দশক ধরে চলা জমির বিরোধের যোগ থাকতে পারে বলে স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

ভারতজুড়ে অবশ্য এখন বিভিন্ন নারীবাদী সংগঠন ও সামাজিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দলিত মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর বন্দোবস্ত করছে, যার মাধ্যমে দলিত নারীদের কণ্ঠস্বর আরও জোরালো হয়ে উঠছে।

“আগে কখনও এমনটা হয়নি, দলিতদের শক্তিশালী নারী নেতৃত্ব এখন নিজেরাই তাদের দুর্দশার কথা প্রকাশ করছে এবং অন্যদের হস্তক্ষেপ ছাড়াই সংগ্রামে নেতৃত্ব দিচ্ছে,” বলেছেন লেখক ইয়েংদে।

দলিত নারীরা ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। যে কারণে প্রতিক্রিয়াও আগের তুলনায় বেশি নিষ্ঠুর মনে হচ্ছে।

“আগে এ সহিংসতা ছিল অদৃশ্য, হতো অগোচরে। এখন এগুলো দৃশ্যমান হচ্ছে। এখন আমরা শক্তিশালী এবং জেদি। বেশিরভাগ সহিংসতাগুলোই এখন আমাদেরকে আমাদের সীমানার কথা মনে করিয়ে দেয়,” বলেছেন শীর্ষস্থানীয় দলিত অধিকারকর্মী মঞ্জুলা প্রদীপ।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য