দিনাজপুর সংবাদাতাঃ বিপন্ন পেশা ঝিনুক পুড়িয়ে সংসার চালাচ্ছেন দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার জোতবানি ইউনিয়নের কেটরাগ্রামের রীনা রানি (৩৫)নামের এক নারী। বেশি টাকা আয় না হলেও অভাবের সংসারে এটাই অনেক। অনেকটা চুনের চুল্লির সাদাধোঁয়ায় আচ্ছন্ন রীনার অভাবের সংসার। পোড়া ঝিনুকের সাদা চুনের আয় দিয়েই চলে রিনা রানীর সংসার।

“ঝিনুক পোড়া চুনেই চলে রীনা রানির সংসার” শিরোনামে সোসাল মিডিয়ায় বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ায় উপজেলা প্রশাসনের নজরে আসলে উপজেলা সহকারি কমিশনার মোহসিয়া তাবাসসুম রীনা রানির বাড়ীতে গিয়ে খোঁজ খবর নেন।

অবশেষে রীনা রানির পাশে দাঁড়াতে তার জীর্ণকুঠিরে আশার আলো নিয়ে হাজির হন বিরামপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার পরিমল কুমার সরকার ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রাজুল ইসলাম ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক। এসময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা তাকে একটি ভাতার কার্ড উপহার দেন। রীনা রানির সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতেই এমন উদ্যোগ গ্রহণ করেন উপজেলা প্রশাসন।

সমাজসেবা কর্মকর্তা রাজুল ইসলাম বলেন,‘ প্রাথমিক ভাবে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে রীনা রানিকে দলিত হরিজন ও বেদে সম্প্রদায়ের বরাদ্দের জন্য একটি ভাতার কার্ড করে দেওয়া হয়েছে। তিনি ২০১৯ সালের জুলাই মাস থেকে প্রতিমাসে ৫শত টাকা করে পাবেন।

রীনা রানি বলেন,‘ভগবান হামার দিকে চায়া দেখিছে। তিন ছোয়াল নিয়ে বেশ কষ্টে ছিলাম। সরকার হামার ভাতার কার্ড করে দিছে এতেই হারা অনেক খুশি। ভগবান প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনাক ভালো রাখুক।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইউএনও পরিমল কুমার সরকার বলেন,‘ সোসাল মিডিয়ায় রীনা রানিকে নিয়ে সংবাদের মাধ্যমে তার বিষয়ে আমরা বিস্তারিত জেনেছি। এরপর উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) পাঠিয়ে তার সংসারের খোঁজ খবর নিয়েছি। প্রাথমিক ভাবে উপজেলা চেয়ারম্যান খায়রুল আলম রাজুর পরামর্শে উপজেলা সমাজসেবার অধিদপ্তরের আওতায় তাকে একটি ভাতার কার্ড প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও “জমি আছে ঘর নেই” সেই তালিকায় তাকে সংযুক্ত করা হয়েছে। আগামীতে সরকারি কোন সুযোগ সুবিধা এলে তাকে সেটিও প্রদান করা হবে।

কি ভাবে চুন ঝিনুক পুড়িয়ে চুন তৈরী করা হয়?
ঝিনুক পুড়িয়ে চুন তৈরী করতে প্রথমে মাটির বড় একটি চুল্লি তৈরী করতে হবে। সেখানে ফাঁকা করে ভাঙা ইটের ওপর ভাঙা মাটির পাতিলের টুকরোগুলো সাজিয়ে দিতে হয়। তারপর শুকনো কাঠের খড়ি দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে তার ওপর ঝিনুক বসিয়ে দিতে হবে। আবার কাঠের টুকরো দিয়ে তার ওপর আবার থরে থরে ছিনুক দিয়ে চুল্লিটি ভরিয়ে দিতে হবে। নিচের কাঠের আগুনে একটু একটু করে পুড়তে শুরু করবে ঝিনুক। পরে সেই পোড়া ঝিনুকের অংশগুলো ছাকনিতে ভালো ভাবে পরিষ্কার করার পর আবার মাটিতে ছোট চুল্লির ভেতর রেখে পরিমাণ মত পানি দিয়ে ভালো করে মাখিয়ে নিলেই চুন তৈরী হবে।

এতো ঝিনুক কিভাবে সংগ্রহ করেন রীনা?
রীনা রানির স্বামী বিজয় চন্দ্র সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে পাশ্ববর্তী আদিবাসি গ্রামগুলো থেকে ঝিনুকের খোলস সংগ্রহ করেন। অনেক সময় এক এলাকায় না পাওয়া গেলে পাশ্ববর্তী উপজেলাতে গিয়ে সেই ঝিনুকের খোলস সংগ্রহ করতে হয়।এক চুল্লি চুন তৈরীতে ব্যবহার হয় ৫ ডালি ঝিনুকের খোলস।এক চুল্লি থেকে ১ মণ চুন উৎপাদন করা হয়। বর্তমান বাজারে সেই চুনের মূল্য ১৮শ থেকে ২ দুই হাজার টাকা।

রীনা রানীর স্বামীর বিজয় চন্দ্রের বলেন,‘ পনের বছর পূর্বে রংপুরের পীরগঞ্জ থেকে এক প্রকার বিপদে পড়েই এখানে এসেছি। চুন তৈরির কলাকৌশল আমার স্ত্রীকে শিখিয়েছি। প্রায় দিন আমি অন্যের জমিতে দিনমজুরি করি। করোনার কারণে এখন ঠিকমত কাজও পাইনা। চুন ব্যবসার মূলধন বাড়ানোর জন্য সরকার থেকে সহজ শর্তে ঋণ পেলে আমরা খুব উপকৃত হব।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য