ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের হাথরাসে গণধর্ষিতা এক তরুণী মারা যাওয়ার পরে পুলিশ বলছে, ময়নাতদন্তে ধর্ষণের প্রমাণ পাওয়া যায় নি। নির্যাতিতার পরিবার থেকে শুরু করে স্থানীয় মানুষ এবং বিরোধী দলগুলি উত্তরপ্রদেশ পুলিশের ধর্ষণ-তত্ত্ব খারিজ করে দেওয়ার প্রবল সমালোচনা করছে।

একদিকে যেমন পুলিশ বলছে যে ধর্ষণের প্রমাণ তারা পায় নি, অন্যদিকে হাথরাসের ওই গ্রামে সংবাদমাধ্যমকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না – যাতে পরিবারের সদস্যরা সরকারের সমালোচনা করে কিছু না বলতে পারেন। তাদের ফোনও নিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।

নির্যাতিতার পরিবারের অভিযোগ এভাবেই তদন্ত ধামা দিতে চেষ্টা করছে পুলিশ।

অন্যদিকে হাথরাসের গণধর্ষিতা তরুণী দিল্লির এক হাসপাতালে মারা যাওয়ার পর শুক্রবার দ্বিতীয় দিনের মতো ওই ঘটনা নিয়ে প্রতিবাদ বিক্ষোভ চলছে।

কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে হাথরাসে যাওয়া থেকে আটকানোর জন্য বৃহস্পতিবার যেভাবে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিল উত্তরপ্রদেশ পুলিশ, শুক্রবার একই ভাবে তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য ডেরেক ও ব্রায়েনকেও ফেলে দেওয়া হয়েছে। প্রতিবাদ বিক্ষোভ চলছে দিল্লিতেও।

যদিও উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ শুক্রবার দুপুরে ঘোষণা করেছেন যে দোষী ব্যক্তিদের এমন শাস্তি দেওয়া হবে, যা ভবিষ্যতের উদাহরণ হয়ে থাকবে।

কিন্তু তার পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধেই অভিযোগ উঠছে যে তারা আসলে তদন্ত ধামা চাপা দিতে চাইছে।

একদিকে যেমন বলে দেওয়া হচ্ছে যে ময়নাতদন্তে ধর্ষণের প্রমাণ পাওয়া যায় নি, আবার মধ্যরাতে নির্যাতিতার মরদেহ বাড়ি থেকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে দাহ করে ফেলেছে পুলিশ – যাতে দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তের সুযোগ না থাকে।

হাথরাসে এই ঘটনার খবর সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন বিবিসি-র সহকর্মী দিলনাওয়াজ পাশা।

তিনি বলছিলেন, “ধর্ষণের প্রমাণ না পাওয়ার কথা পুলিশ জানানোর পরে নির্যাতিতার মা এবং ভাইসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আমি কথা বলি। তারা জানিয়েছেন যে পুলিশের তদন্তের ওপরে পরিবারের আর ভরসা নেই। পুলিশ যেকোনও প্রকারে তদন্ত ধামা চাপা দিতে চাইছে, এই অভিযোগও করছে নির্যাতিতার পরিবার।”

বিষয়টা এখন রাজনৈতিক মোড় নিয়ে নিয়েছে, সেজন্যই তদন্তের অভিমুখ ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানাচ্ছিলেন দিলনাওয়াজ পাশা।

যদিও পুলিশ বলছে যে ময়নাতদন্তে ধর্ষণের প্রমাণ পাওয়া যায় নি, কিন্তু হাসপাতালে নির্যাতিতার একটি ভিডিও বয়ান রেকর্ড করা হয়েছিল, যেখানে তিনি দুজন ব্যক্তি দ্বারা ধর্ষিতা হওয়ার কথা বলেছিলেন।

যারা পুলিশের সমালোচনা করছেন তারা বলছেন, একদিকে যেমন মরদেহ দাহ করে দেওয়া হয়েছে, তেমনই ময়নাতদন্ত হয়েছে ঘটনার প্রায় দু’সপ্তাহ পরে।

কিন্তু এখন যেহেতু ওই তরুণী মারা গেছেন, তাই আইন অনুযায়ী ওই বয়ানই মৃত্যুকালীন জবানবন্দী হিসাবে আদালতে গ্রাহ্য হওয়ার কথা বলে জানাচ্ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রবীন আইনজীবী ভারতী মুৎসুদ্দি।

“ডাইয়িং ডিক্লারেশনের গুরুত্ব অপরিসীম। সেখানে ওই ধর্ষিতা যা বলেছেন, সেটা আদালত-গ্রাহ্য প্রমাণ। মামলাও সেভাবেই চলা উচিত। কিন্তু এই ঘটনায় দেখা যাচ্ছে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আগ বাড়িয়ে ঘোষণা করে দিল। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট বদলে দেওয়ার বহু নজির রয়েছে। এদিকে আবার দেহটি পুড়িয়ে ফেলা হল। এর ফলে ওই পরিবারটি, বা যাদের মনে সন্দেহ রয়েছে, তাদের তো আর কোনও সুযোগ থাকবে না,” মন্তব্য মিসেস মুৎসুদ্দির।

তিনি আরও বলছিলেন, মৃত্যুকালীন জবানবন্দী আছে , প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান আছে – তা স্বত্ত্বেও যেভাবে পুলিশ গোটা ঘটনার তদন্ত চালাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে যে অপরাধীরা যাতে খালাস পেয়ে যায়, সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

একদিকে যেমন ধর্ষণ হয়েছে কি না, তা নিয়ে পুলিশ বিভ্রান্তি তৈরি করছে, অন্যদিকে ওই গ্রামে কোনও রাজনৈতিক নেতা বা সংবাদমাধ্যমকে বাইরে থেকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। শয়ে শয়ে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে গ্রামটিতে।

শুক্রবার দুপুরের দিকে নির্যাতিতার এক ভাই চাষের ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে পালিয়ে বাইরে আসেন।

সেখানে হাজির সংবাদমাধ্যমগুলিকে তিনি বলেন, “ঘরের ভেতরে, বাইরে, ছাদে – সর্বত্র পুলিশ রয়েছে। পরিবারের কয়েকজনকে মারধরও করা হয়েছে বলে। আমরা যাতে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ না করতে পারি সেজন্য ফোন কেড়ে নেওয়া হয়েছে।”

এর আগে একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে নির্যাতিতার পরিবারকে হাথরাসের জেলাশাসক বলছেন, সংবাদমাধ্যম কদিন পরেই চলে যাবে, কিন্তু পরিবারটিকে গ্রামেই থাকতে হবে।

এই বক্তব্যকে অনেকেই মনে করছেন হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

সহকর্মী দিলনাওয়াজ পাশা বলছিলেন, ওই পরিবারটি দলিত শ্রেণীর হলেও তারা স্পষ্ট বক্তা, সেজন্যই প্রশাসন তাদের চুপ করিয়ে দেওয়ার নানা চেষ্টা চালাচ্ছে।

দিলনাওয়াজ পাশার কথায়, “প্রশাসন চাইছিল যে একটা বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ, একটা বাড়ি আর পরিবারের একজনের চাকরি করে দিলে তারা চুপ করে যাবে আর যে বিক্ষোভ চলছে, সেগুলোও ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু ঘটনা হল, পরিবারটি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছে, তারা যে তদন্ত নিয়ে খুশি নয়, সেটাও স্পষ্ট করে বলেছে।”

এটা বন্ধ করার জন্য গ্রামটিকে করোনা কন্টেমেন্ট এলাকা হিসাবে ঘোষণা করে বাইরের কারও প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দিয়েছে সরকার। পরিবারের সব সদস্যের করোনা পরীক্ষাও করা হচ্ছে।

গ্রামের প্রতিটা বাড়ির বাইরে অন্তত দশজন করে পুলিশ মোতায়েন করা রয়েছে বলে জানাচ্ছিলেন দিলনাওয়াজ পাশা।

হাথরাসের ঘটনা নিয়ে যখন সারা দেশে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে, সেইসময়েই উত্তরপ্রদেশেই আরও একটি গণধর্ষণের পরে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। বলরামপুরে ২১-২২ বছর বয়সী এক দলিত তরুণীকে গণধর্ষণ করা হয়, যিনি গত বুধবার মারা গেছেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য