দিনাজপুর সংবাদাতাঃ তখন সময় রাত ১টা ১৪ মিনিট দিনাজপুর সরকারি কলেজ মোড়ে তিনি রিক্সা নিয়ে বসে আছেন, তাকে জিজ্ঞাসা করলাম চাচা এত রাতে রিকশা নিয়ে।

কি করব বাবা দিনেতো রিকশা চালাতে পারি না, পেট খায় তাই রিক্সা নিয়ে আছি, যদি কোন যাত্রী পাওয়া যায়।

বয়সের ভারে নিজেই কুপোকাত অথচ পেটের দায়ে রিকশা নিয়ে এত রাতে বাহিরে আছেন। জিজ্ঞাসা করলাম চাচা সারাদিনে কয় টাকা ভাড়া মারলেন চাচার উত্তর হবে ১৫০ টাকা?

চাচা সারা দিনে মাত্র ১৫০ টাকা, না আমি তো দুপুরের পর বের হয়েছি দুপুরের পর থেকে এ ভাড়া টা মেরেছি। সকালের দিকে ভাড়া মারতে পারি না তাই প্রতিদিন দুপুরের পরে বের হই বাসায় ফিরতে ফিরতে এই রাত হয়ে যায়।

সেই রিকশাচালক চাচার নাম মোহাম্মদ তসলিম, বাসা দিনাজপুর সদর উপজেলার ১নং চেহেলগাজী ইউনিয়নের পশ্চিম শিবরামপুরে, চাচার বয়স হবে হবে প্রায় ৭০ বছর।

আজ থেকে প্রায় ১৫ বছর আগে নিজে রিকশা চালিয়ে স্ত্রীকে সাথে নিয়ে কোন এক আত্মীয়র বাসায় যাচ্ছিলেন।

শহরের কলেজ মোড় এর কাছাকাছি আসতেই অপরপ্রান্তের দিক থেকে আসা একটি গাড়ি সেই চাচার রিক্সায় ধাক্কা মারেন। সেই গাড়ির ধাক্কায় তসলিম চাচা প্রাণে বেঁচে গেলও ঘটনাস্থলেই নিহত হন চাচার স্ত্রী।

তসলিম চাচা যুদ্ধের আগেই বাবা আজিম কে হারিয়েছেন, ধরার চেষ্টা করেছেন পরিবারের হাল। জিয়া সরকার যখন ক্ষমতায় (জিয়ার আমল) তখন থেকেই রিক্সা চালান এমনটাই জানিয়েছেন তিনি।

তসলিম চাচা আরো জানান তার জীবনে কোনদিন স্কুলে যাওয়া হয়নি, কোন অক্ষর হরফ তিনি চিনেন না। ১ লেখা না ২ লেখা বলতে পারেন না তিনি, শুধু মৌখিকভাবে টাকার হিসাব নিকাশ শিখেছেন এবং টাকার নোট গুলো দেখে কত টাকার নোট তা তিনি চিনেছেন। আমি যখন খাতা কলম বের করে তার তথ্যগুলো লিখছিলাম তখন তিনি বলছিলেন শিক্ষার ব্যাপারে এসব কথা।

তসলিম চাচার পরিবারে তিনটি কন্যা সন্তান কষ্ট করে মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন।

বর্তমানে তসলিম চাচা তার বড় মেয়ে ও জামাই এর সাথে থাকেন। তার বড় জামাই মিলের একজন শ্রমিক, অভাব-অনটনের সংসার সারাদিনে রিক্সা চালিয়ে যা আয় করেন নিজের খরচের জন্য ৩০ থেকে ৫০ টাকা রেখে সাংসারিক খরচের জন্য তার সবটাই দিয়ে দেন বড় মেয়েকে।

সেই বড় মেয়ের আবার দুটি কন্যা একটির বয়স প্রায় ১০ বছর সে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে, ছোটটির এর বয়স প্রায় ৭ বছর সে ক্লাস থ্রিতে পড়ে। তসলিম চাচার নাতনিরা স্কুল গেলে তাদের খাওয়ার জন্য ন্যূনতম 5 টাকা দিতে হয় নয়তো নাতনিদের বায়নায় দোকান থেকে কিছু খাবার কিনে দিতে হয়।

এত অভাব-অনটনের মাঝে এত বয়সের ভারে নিজেই কুপোকাত হয়ে রিকশা চালিয়ে যাচ্ছেন। তা দেখে তসলিম চাচাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম চাচা এ বয়সে এখনো রিকশা চালান কোন অনুদান বা বয়স্ক ভাতার কার্ড আপনি পাননি।

আমার কথাটি শুনে দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে বলল কিসের কার্ড আমার তো এখনো বয়স হয়নি, আমি বলেছিলাম তার মানে কি চাচা?? তসলিম চাচা প্রতি উত্তরে বলে গত কয়েকদিন আগে অনুদান বয়স্ক ভাতার কার্ড এর জন্য বোর্ডে গেছিলাম। সেখানে একজন আমাকে বলল আপনার এখনো বয়স হয়নি।

সে কথা শুনে আমি বাড়িতে চলে আসি। (১ নং চেহেলগাজী ইউনিয়ন পরিষদে অনুদান বা বয়স্ক ভাতার কার্ড চাইতে গেলে জৈনিক এক ব্যক্তি তাকে বলেন তার নাকি এখনো বয়স হয়নি।)

তসলিম চাচাকে বললাম চাচা রিকশা চালাতে তো অনেক কষ্ট হয় অটো চালাতে পারেন না। তা শুনে চাচা বলে একটি অটোরিকশা ভাড়া নিয়েছিলাম চালাবো বলে। কিন্তু অটোরিকশা নিয়ে রাস্তা ঘোরাতে আমার খুব সমস্যা হয়।
রিকশা নিয়ে রাস্তা পারাপার হতে পারি কিন্তু অটো নিয়ে রাস্তা পারাপার হতে পারি না। তাই অটো আবার ফেরত দিয়েছি।

অশ্রুঝরা চোখে তিনি জানান বাবা পেট যেহেতু খায় তখন রিকশা চালাতে হবে, যতদিন বাঁচবো এই রিক্সা চালাবো।

চাচাকে বলেছিলাম চাচা আপনাকে ও আপনার বিষয় নিয়ে একটু লিখব তাই কয়েকটি ছবি তুলব।

যদি এতে আপনার কোন উপকার হয়, মুখভর্তি হাসি নিয়ে বলেছিল ঠিক আছে বাবা আমি রিক্সায় বসি তুমি ছবি তোল।

বিশেষ দ্রষ্টব্য- সমাজের কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজনৈতিক- সামাজিক নেতৃবৃন্দ, সমাজের সুশীল মানুষের কাছে একটি আবেদন যদি কারো পক্ষে সম্ভব হয় তবে তসলিম চাচার জন্য কিছু অনুদান বা বয়স্ক ভাতার কার্ড করে দেওয়ার আকুল আবেদন জানালাম।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য