ইরাকে করোনাভাইরাস সংক্রমণ বাড়তে থাকার সঙ্গে সঙ্গে উত্তরোত্তর সহিংসতার শিকার হচ্ছেন চিকিৎসকরা।

মারা যাওয়া এক করোনাভাইরাস রোগীর স্বজনদের মারধরের শিকার এমন একজন চিকিৎসক হচ্ছেন তারিক আল-শেইবানি।

মারের চোটে অচেতন হয়ে পড়েছিলেন ৪৭ বছরের বয়সী এই চিকিৎসক। ইরাকের দক্ষিণের নগরী নাজাফের আল-আমল হাসপাতালের পরিচালক তিনি।

দুই ঘণ্টা পর নগরীর অন্য একটি ক্লিনিকে শেইবানির জ্ঞান ফেরে। আঘাতে আঘাতে তার সারা শরীরে কালশিরা পড়ে গিয়েছিল।

গত ২৮ অগাস্টের ওই ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পর কুফায় নিজ বাড়িতে শেইবানি বলেন, ‘‘সব চিকিৎসকরা আতঙ্কে ভুগছেন। প্রতিবার একজন করে রোগীর মৃত্যু হয়, আর আতঙ্কে আমাদের দম বন্ধ হয়ে আসে।”

দেশটিতে মেডিকেল স্টাফদের ওপর শেইবানির মতো এমন হামলার ঘটনা বাড়তে থাকায় কোভিড-১৯ সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে চিকিৎসকদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের লড়াইও কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে।

বছরের পর বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধ এবং তহবিলের অভাবের কারণে ইরাকের স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। এর মধ্যে সংগ্রাম করে নিজ দায়িত্ব পালনের প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া চিকিৎসকরা এখন রোগীদের শোকার্ত, মরিয়া স্বজনদের কাছ থেকে শারিরীকভাবে হামলার শিকার হওয়ার নতুন হুমকিতে পড়েছেন।

এ বিষয় নিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স ইরাকের সাতজন চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলেছে। যাদের একজন দেশটির মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান।

তিনি করোনাভাইরাস মহামারী শুরু হওয়ার পর চিকিৎসা কর্মীদের উপর রোগীর স্বজনদের হামলা বাড়ার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, দেশজুড়ে এরইমধ্যে কয়েক ডজন চিকি‍ৎসককে এ ধরনের হামলার শিকার হতে হয়েছে।

ওদিকে, ইরাকে কোভিড-১৯ মহামারী নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। ইরাকে প্রতিদিনই কয়েক হাজার নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে। মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়ে গেছে। মারা গেছেন আট হাজারের বেশি মানুষ।

কিন্তু অর্থনীতি বাঁচাতে সরকার লকডাউন শিথিল করতে বাধ্য হয়েছে। রেস্তোরাঁ ও উপাসনালয় খুলে দেওয়া হয়েছে। যদিও এখনও সীমান্ত বন্ধ আছে।

‘আমি নিজেকে ঘৃণা করি’

ডা. শেইবানিকে মারধরের ঘটনার সিসিটিভি ভিডিও অনলাইনে ভাইরাল হয়ে যায়। ভিডিওতে দেখা যায়, মারা যাওয়া রোগীর স্বজনরা হাসপাতাল কর্মীদের এজন্য দায়ী করে তাদের উপর চড়াও হয়েছে। অথচ ওই রোগীকে আশঙ্কাজনক অবস্থাতেই হাসপাতালে আনা হয়েছিল।

ওই ভিডিও কীভাবে ভাইরাল হল তা জানেন না জানিয়ে ডা. শেইবানি বলেন, ‘‘আমি নিজেকে ঘৃণা করি। আমি ওই দিনটিকে ঘৃণা করি যেদিন আমি ইরাকের চিকিৎসক হয়েছি।

‘‘তারা রোগীর শেষ সময়ে তাকে আমাদের কাছে নিয়ে এসেছিলেন এবং তিনি মারা যান। অথচ রোগীর স্বজনদের দাবি, আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে এ মৃত্যুর দায় নিতে হবে।’’

হাসপাতালে স্বাস্থ্য সুরক্ষার সব নির্দেশনা ঠিকঠাক মত পালন করা সহজ নয় বলে মনে করেন শেইবানি। তিনি বলেন, ‘‘বিশেষ করে তখন, যখন রোগীর পরিবার ও হাসপাতাল কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা চরমে থাকে।”

রয়টার্সের পক্ষ থেকে শেইবানির হাসপাতাল দেখতে যাওয়া হয়েছিল, হাসপাতালটিকে কোভিড-১৯ রোগীদের আইসোলেশন সেন্টার করা হয়েছে। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, রোগীর স্বজনরা সুরক্ষা পোশাক ছাড়াই ওয়ার্ডের ভেতরে-বাইরে যাতায়াত করছেন। কেউ কেউ তো মুখে শুধু সার্জিক্যাল মাস্ক পরে আছেন।

ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার সরকারের:

চিকিৎসা কর্মীদের উপর হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা করে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী মুস্তফা আল-কাদিমি বলেছেন, হামলায় জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা হবে।

গত কয়েক মাসে চিকিৎসকদের উপর হামলা বেড়েছে বলে জানান ইরাকের মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান আব্দুল আমির হুসাইন। তিনি বলেন, অ্যাসোসিয়েশন সব ঘটনার রেকর্ড রাখতে পারেনি। তবে চিকিৎসাকর্মীদের গালাগালি, মারধর এমনকি ছুরিকাঘাতও করা হয়েছে।

শেইবানি তার উপর হামলার ঘটনায় থানায় মামলা করেছেন। কিন্তু হামলাকারীরা এখন মামলা তুলে নেওয়ার জন্য তাকে হুমকি দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

শেইবানি বলেন, ‘‘তারা হয়ত আমি বা আমার পরিবারের উপর হামলা করবে। আমি এখন একা বাড়ির বাইরে যাই না।”

সরকার কঠোর সুরক্ষা ব্যবস্থা না নেওয়াতেই এমনটি হচ্ছে বলে মনে করেন চিকিৎসকরা। মহামারীর আগে থেকেই চিকিৎসকরা এমন পরিস্থিতির শিকার হয়ে আসছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য