পঞ্চাশ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে বিশ্বে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি কমে গেছে বলে বিপন্ন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে নিয়োজিত ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচারের (ডব্লিউডব্লিউএফ) এক বিস্তৃত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

বিবিসি জানিয়েছে, বন্যপ্রাণীর ‘সর্বনাশা এ পতনের’ হার কমার কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না এবং মানুষ যে হারে প্রকৃতি ধ্বংস করছে তা এর আগে কখনো দেখা যায়নি বলে সংস্থাটির প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।

ডব্লিউডব্লিউএফের প্রধান নির্বাহী তানিয়া স্টিল বলেছেন, বনাঞ্চল ধ্বংস, বিপুল পরিমাণ সামুদ্রিক মাছ ধরা এবং বনে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার মতো কারণে বিশ্বে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা ‘হু হু করে কমছে’।

“যাকে আমরা আমাদের বাড়ি বলছি, সেই পৃথিবীর সর্বনাশ করে চলেছি আমরা; নিজেদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও পৃথিবীতে টিকে থাকার সম্ভাবনাকে ঝুঁকিতে ফেলছি। প্রকৃতি এখন মরিয়া হয়ে আমাদের বিপদসঙ্কেত পাঠাচ্ছে, সময় ফুরিয়ে আসছে,” বলেছেন তিনি।

বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর কয়েক হাজার প্রজাতি এবং তাদের বাসস্থান নিয়ে বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণের উপর ভিত্তি করে ডব্লিউডব্লিউএফ এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে।

বিজ্ঞানীরা ১৯৭০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৪৬ বছরে স্তন্যপায়ী, পাখি, উভচর, সরীসৃপ ও মাছের বিভিন্ন প্রজাতির ২০ হাজারের বেশি প্রাণীর মধ্যে গড়ে ৬৮ শতাংশই কমে গেছে বলে দেখতে পেয়েছেন।

বন্যপ্রাণীর সংখ্যার এ ক্রমাবনতিকে মানুষের কর্মকাণ্ডে পৃথিবীর যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে তার সুস্পষ্ট প্রমাণ বলছেন লন্ডনের জুওলজিকাল সোসাইটির (জেডএসএল) বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিষয়ক পরিচালক ড. অ্যান্ড্রু টেরি।

জেডএসএলই ডব্লিউডব্লিউএফের প্রতিবেদনে তথ্য সরবারহ করেছে।

“যদি কোনোকিছুই না বদলায়, তাহলে সন্দেহাতীতভাবে বন্যাপ্রাণীর সংখ্যা কমতে থাকবে; একসময় তা বন্যপ্রাণীগুলোকে বিলুপ্ত করে দেবে এবং আমরা যে বাস্তুসংস্থানের উপর নির্ভর করছি তার অখণ্ডতাকে ঝুঁকিতে ফেলবে,” বলেছেন টেরি।

মানুষ এবং প্রকৃতি যে একে অপরের পরিপূরক, কোভিড-১৯ মহামারী তা ভালোমতোই মনে করিয়ে দিয়েছে বলেও ডব্লিউডব্লিউএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

বাসস্থান ধ্বংস, বন্যপ্রাণীর ব্যবহার ও বেচাকেনাসহ এবারের মহামারীর আবির্ভাবের পেছনে যেসব কারণকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে, তার অনেকগুলো বন্যপ্রাণীর সংকোচনের পেছনেও দায়ী বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের।

তবে এখনও যদি দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া যায় এবং উৎপাদন ও খাদ্য গ্রহণের প্রক্রিয়া বদলে ফেলা যায় তাহলে বিপন্ন বন্যপ্রাণীর বাসস্থান ধ্বংস হওয়া বন্ধ এমনকী অনেকক্ষেত্রে পরিস্থিতি উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দেওয়াও সম্ভব হবে বলে বিজ্ঞানীদের বেশকিছু মডেলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

“সেরকমটা করতে হলে আমাদেরকে খাদ্য উৎপাদন, শক্তি তৈরি, সমুদ্রের ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন জিনিসের ব্যবহার সংক্রান্ত ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। তবে সবার আগে লাগবে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। ‘আছে যখন ভালোই’ বা ‘জরুরি কিছু নয়’ এরকমটা না দেখে পৃথিবীর ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রকৃতিকে একক সর্বশ্রেষ্ট মিত্র হিসেবে দেখতে হবে,” বলেছেন ব্রিটিশ টিভি উপস্থাপক ও প্রকৃতিবিদ স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো।

ডব্লিউডব্লিউএফের এ প্রতিবেদনে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা বাড়ছে না কমছে সে সংক্রান্ত তালিকা ব্যবহার করা হলেও এতে কী পরিমাণ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে, সে সংক্রান্ত কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

১৯৭০ সালের পর থেকে ৪৬ বছরে বিশ্বের অন্য অঞ্চলগুলোর তুলনায় লাতিন আমেরিকার ও ক্যারিবীয় অঞ্চলেই বন্যপ্রাণীর পরিমাণ সবচেয়ে বেশি হ্রাস পেয়েছে বলে এ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। অঞ্চলটির সরীসৃপ, উভচর ও পাখি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে বলে জানিয়েছে ডব্লিউডব্লিউএফ।

“এই প্রতিবেদনে বৈশ্বিক চিত্র এবং বন্যপ্রাণী সংকোচনের গতিমুখ ঘুরিয়ে দিতে শিগগিরই পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার দিকে নজর দেওয়া হয়েছে,” বলেছেন জেডএসএলের লুইজ ম্যাকরে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য