চীনের কর্তৃপক্ষের হাতে আটক হতে পারেন, এ ভয়ে তড়িঘড়ি নিজ দেশে পাড়ি দিয়েছেন দুই অস্ট্রেলীয় সাংবাদিক।

বেইজিং ও ক্যানবেরার মধ্যে পাঁচ দিনের কূটনৈতিক টানাপোড়েন শেষে অস্ট্রেলিয়ান ফাইন্যান্সিয়াল ব্যুরোর চীন প্রতিনিধি মাইকেল স্মিথ ও অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের প্রতিনিধি বিল বার্টলস মঙ্গলবার সকালে সিডনিতে গিয়ে পৌঁছান বলে নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

স্মিথ ও বার্টল যে দুই প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, তারাই তাড়াহুড়ো করে দুই সাংবাদিকের জন্য ফ্লাইটের ব্যবস্থা করেছিল। এ দু’জনই ছিলেন চীনে কাজ করা অস্ট্রেলীয় সংবাদ মাধ্যমের শেষ দুই প্রতিনিধি।

কয়েকদিন আগে চীনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা সাংহাই ও বেইজিংয়ে স্মিথ ও বার্টলসের বাসায় আচমকা হানা দেওয়ার পর থেকেই এই দুই সাংবাদিক আটক হওয়ার আতঙ্কে ভুগছিলেন। কূটনৈতিক দরকষাকষি শেষে বেইজিং তাদের উপর থেকে চীন ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে তারা অস্ট্রেলিয়া রওনা দেন।

এই ঘটনা বেইজিং ও ক্যানবেরার মধ্যে সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটাবে বলে অনুমান বিশ্লেষকদের। তাদের অনেকে একে চীনের ভেতর স্বাধীন সাংবাদিকতাকে সীমাবদ্ধ করে রাখতে চাওয়া বেইজিংয়ের দমনপীড়নমূলক কৌশলের অন্যতম উদাহরণও বলছেন।

“চীনের সঙ্গে টানাপোড়েন চলছে এমন দেশগুলোর এ থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত; যদি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে, তাহলে চীনে থাকা সেসব দেশের নাগরিকরাও বিপদে পড়তে পারেন,” বলেছেন লোয়ি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো, ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস ও দ্য অস্ট্রেলিয়ানের সাবেক চীন প্রতিনিধি রিচার্ড ম্যাকগ্রেগর।

নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, গত সপ্তাহের বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পর প্রায় একই সময়ে চীনের নিরাপত্তা বাহিনীর সাত কর্মকর্তা সাংহাইয়ে স্মিথ এবং বেইজিংয়ে বার্টলসের বাসায় নোটিস ছাড়াই হাজির হন।

তারা দুই সাংবাদিককে চীনে জন্ম নেওয়া অস্ট্রেলীয় সাংবাদিক চেং লি সংক্রান্ত নানান প্রশ্ন করেন বলে জানিয়েছে অস্ট্রেলিয়ান ফাইন্যান্সিয়াল রিভিউ। চীনের সিজিটিএন টেলিভিশনের বিজনেস নিউজ উপস্থাপক চেং’ কে চলতি বছরের অগাস্টে আটক করা হয়েছিল।

স্মিথ ও বার্টলস এ বিষয়ে বিস্তৃত প্রতিবেদন করেছিলেন; চেং যে দীর্ঘদিন ধরে ‘আবাসিক নজরদারি’তে ছিলেন তাদের প্রতিবেদনে তাও জানানো হয়েছিল। এই ‘আবাসিক নজরদারি’ অবস্থায় চীনের কর্তৃপক্ষ যে কাউকে ছয় মাস পর্যন্ত আটকে রাখতে এবং আত্মীয়-স্বজন ও আইনজীবীর কাছ থেকে দূরে রাখতে পারে।

চীনের কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত চেং এর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ না আনলেও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে কাজ করা এ বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।

স্মিথ বলছেন, তাকে ও বার্টলসকে চেং এর সঙ্গে জড়ানোর ঘটনায় ভয় দেখানোর চেষ্টা ছাড়া আর কোনো সৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে না।

মঙ্গলবার এক সাক্ষাৎকারে অস্ট্রেলিয়ান ফাইন্যান্সিয়াল ব্যুরোর এ চীন প্রতিনিধি বলেন,“তারা (চীনা কর্মকর্তা) আমাকে সাধারণ কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছিল। যেমন, আপনি কি তাকে (চেং) চেনেন? তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল কখনও?

“আমার সঙ্গে তার (চেং) একবারই দেখা হয়েছিল, বেইজিংয়ের একটি বারে। আরও অনেক সাংবাদিকও ছিলেন। আমি তার সঙ্গে কথা বলিনি।

“তাদেরকে (চীনা কর্মকর্তা) দেওয়ার মত তেমন কোনো তথ্যই ছিল না আমার কাছে। চেং এর সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ না থাকা সত্ত্বেও কেন আমাকেই তদন্তের লক্ষ্যস্থল করা হল, তা আমাকে হতবুদ্ধি করে দিয়েছিল।”

তারই ধারাবাহিকতায় রোববার বার্টলসকে জিজ্ঞাসাবাদ করে চীনের কর্তৃপক্ষ; সেসময় অস্ট্রেলীয় এ সাংবাদিকের সঙ্গে ছিলেন চীনে অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রদূত গ্রাহাম ফ্লেচার।

নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তাদের হানা দেওয়ার আগেই গত সপ্তাহের শুরুর দিকে অস্ট্রেলিয়ার কূটনীতিকরা স্মিথ ও বার্টলসকে চীন ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। ক্যানবেরা ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক এবং চেংকে নিয়ে প্রতিবেদনের সূত্রে বাড়তে থাকা চাপের কারণেই কূটনীতিকরা এমন পরামর্শ দিয়েছিলেন বলে ধারণা দুই সাংবাদিকের।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য