করোনাভাইরাস মহামারি আকারে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার পর লকডাউনে আমরা প্রতিনিয়ত শুনেছি – মাস্ক পরুন এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন। কিন্তু প্রথম দিকে সবচেয়ে জোর দেয়া হয়েছিল কোভিড জীবাণু নিধনে সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়ার ওপর। আমরা কি সে পরামর্শের কথা ধীরে ধীরে ভুলতে বসেছি?

হাত ধোয়াটা মানুষের একটা সহজাত প্রবৃত্তি। হাত নোংরা হলে আমরা হাত ধুই। প্রাত্যহিক জীবনে অনেক সময় অভ্যাসের বশে হাত ধুই। কিন্তু গত ছয় মাসে হাত ধোয়া আমাদের জীবনে মরা-বাঁচার সাথে জড়িয়ে গিয়েছিল।

করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যেসব অস্ত্র নিয়ে আমরা লড়তে নেমেছিলাম – যেমন মাস্ক, সামাজিক দূরত্ব, নিজেকে আলাদা রাখা বা সেলফ আইসোলেশন এসবের ভিড়ে যে সহজ অস্ত্রটির কথা সহজেই আমরা ভুলে যেতে বসেছি সেটি হল: হাত ধোয়া।

ফেব্রুয়ারিতে যখন করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী জরুরিকালীন একটা স্বাস্থ্য সমস্যায় রূপ নিল, তখন স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো তড়িঘড়ি মানুষকে পরামর্শ দিয়েছিল নতুন ভাইরাস থেকে বাঁচতে আমাদের কী করতে হবে।

একটা পরামর্শ – যা দিনের পর দিন প্রতিদিন আমরা শুনেছি, পড়েছি, দেখেছি – সংবাদ বুলেটিনে, খবরের কাগজের পাতায়, বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে, বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকারে – সেটা ছিল সাবান এবং গরম পানি দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে ভাল করে হাত ধুতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কীভাবে ঠিকমত হাত ধুতে হবে তার যেসব গ্রাফিক্স চিত্র প্রকাশ করেছিলে, তা সারা বিশ্বে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই চিত্র আমরা মহামারির শুরুর দিকে দেখেছি সর্বত্র- রেস্তোরাঁয়, পানশালায় যেখানেই জনসাধারণের হাত ধোবার ব্যবস্থা আছে।

করোনা মহামারি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার পর ছয় মাস পার হয়েছে। কোথায় সংক্রমণ এখনও শীর্ষে, কোথায় কমছে বা কমে আবার বাড়ছে, কোথায় স্থানীয়ভাবে লকডাউন জারি হচ্ছে বা সংক্রমণ ঠেকাতে কোথায় কারফিউ দিতে হবে এসব নিয়ে নানা বিভ্রান্তির মধ্যে হাত ধোয়ার বিষয়টি এখন কিছুটা গৌণ হয়ে পড়েছে।

লকডাউন যত শিথিল হচ্ছে, যত সব কিছু খোলা হচ্ছে, তত ফেস মাস্ক পরা বা মুখ ঢাকা রাখার গুরুত্বটা বেশি করে সামনে আসছে। কোথায়, কখন, কীভাবে মাস্ক পরা হবে এটাই এখন আলোচনার কেন্দ্রে। ফলে এই ভাইরাস ঠেকানোর আদি মূলমন্ত্র এখন কি অন্য পরামর্শের ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে?

ইথিওপিয়ায় একটি জরিপে সম্প্রতি দেখা গেছে হাসপাতালে যাওয়া এক হাজারের ওপর মানুষের মধ্যে ১ শতাংশেরও কম সঠিকভাবে হাত ধুচ্ছে। তাহলে কি পরামর্শ বদলে গেছে?

মোটেই না- বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। তারা বলছেন হাত ধোয়ার প্রয়োজনীয়তা এখন আগের থেকে দ্বিগুণ বেড়েছে। কারণ মানুষ এখন আগের মত ঘরবন্দি নেই। অনেক মানুষ বেরতে শুরু করেছে। ফলে তাদের সাথে সাথে ভাইরাসের চলাচলও বেড়েছে।

আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস রাজ্যের বস্টনে নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির রসায়ন ও জৈব রসায়নের অধ্যাপক টমাস গিলবার্ট বলছেন করোনাভাইরাসের যে রাসায়নিক গঠন তাকে ভাঙতে সবচেয়ে কার্যকর সস্তার সাবান এবং গরম পানি।

অনেকে অ্যান্টি ভাইরাল হ্যান্ডওয়াশ ব্যবহারের পক্ষে সুবিধার কারণে নয়, কারণ তারা মনে করে সাধারণ সাবানের থেকে অ্যান্টি ভাইরাল হ্যান্ডওয়াশ বেশি কার্যকর। কিন্তু অধ্যাপক মিকেলিস বলছেন সেটা সঠিক নয়।

”এসবের আসলে কোন দরকার নেই,” তিনি বলছেন।

”অনেকে সাধারণ সাবানের বদলে জীবাণু নাশক বা অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল ব্যবহার করতে পছন্দ করে। এসব খুব বেশি ব্যবহারের আবার অন্য ঝুঁকি রয়েছে। খুব বেশিদিন এসব জীবাণু নাশক ব্যবহার করলে বর্জ্য পানিতে এই জীবাণু নাশক জমা হয় এবং অনেক জীবাণু এসব রাসায়নিকের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যখন এসব জীবাণু নাশক আর কাজ করে না। দীর্ঘ মেয়াদে এগুলোর ব্যবহার পরিবেশেরও ক্ষতি করে,” বলছেন অধ্যাপক মিকেলিস।

অধ্যাপক গিলবার্ট এবং অধ্যাপক মিকেলিস দুজনেই বলছেন নির্ভরযোগ্য মানের পানি থাকলে সাবান পানিতে হাত ধোয়াই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সবচেয়ে ভাল অস্ত্র।

তবে পৃথিবীর অনুন্নত বা স্বল্পোন্নত অনেক দেশে মোটামুটি বিশুদ্ধ পানির অভাব রয়েছে। অনেক জায়গায় পানিই দুষ্প্রাপ্য। এ মাসেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের একটি রিপোর্টে বলেছে করোনা মহামারি ছড়িয়ে পড়ার আগেও বিশ্বে প্রতি পাঁচটির মধ্যে দুটি স্কুলে হাত ধোবার যথেষ্ট সুযোগ ছিল না।

পৃথিবীর অনেক জায়গায় নিয়মিত হাত ধোয়ার ব্যবস্থা খুব সহজ নয়। কারণ অনেক জায়গায় তীব্র জলাভাব রয়েছে।

তবে করোনাভাইরাস ঠেকাতে হাত ধোয়ার পানি খাবার পানির মত বিশুদ্ধ হবার প্রয়োজন নেই বলে তারা বলছেন। ”হাতের কাছে সাবান বা সাবান জাতীয় কিছু থাকলেই কাজ হবে।”

বিজ্ঞানীরা বলছেন শুধু কোভিড-১৯ জীবাণু নয়, ইনফ্লুয়েঞ্জা সহ অন্য আরও রোগ জীবাণু ঠেকাতে হাত ধোয়া একটা ভাল অভ্যাস। করোনা ঠেকাতে যেভাবে হাত ধোয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে, একইভাবে এই অভ্যাস যদি আমরা প্রাত্যহিক জীবনের অংশ করে নিতে পারি তাহলে অনেক সংক্রামক রোগ ঠেকানো সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন।

শীতের মরশুমে যখন সর্দিজ্বর বা ফ্লু ছড়ায়, তখনও যদি হাত ধোয়ার অভ্যাস আমরা বজায় রাখতে পারি, তাহলে ”সেটা আমাদের রোগ ঠেকানোর একটা সুযোগ করে দেবে” বলে মনে করছেন অধ্যাপক মিকেলিস।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য