মহামারীর কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর চীনের উহান নগরীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু করোনাভাইরাসের উৎস হিসেবে বিবেচিত শহরটির অভিভাবক ও শিক্ষকদের শঙ্কা এখনও কাটেনি।

দীর্ঘ ৭ মাস পর স্কুল খোলার প্রথম দিন উহানের শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদেরকে উচ্ছ্বাস আর চোখের পানিতে স্বাগত জানিয়েছে, কিন্তু অভিভাবক ও শিক্ষকদের চোখ-মুখে উদ্বেগের ছাপ ঠিকই চোখে পড়ছিল বলে জানিযেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

তাদের ভাবনা,ফের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে? সে কারণেই সতর্কতা ভুলে ভাইরাসপ্রতিরোধী সব ধরনের বর্ম এখনি তুলে রাখা উচিত হবে না বলে মত শিক্ষক-অভিভাবকদের।

করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে জানুয়ারিতে স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এখন হুবেই প্রদেশের এ রাজধানীতে আপাতত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। তাই উহানের কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মঙ্গলবার থেকে শহরটির দুই হাজার ৮০০রও বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দ্বার প্রায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের কলকাকলি আর আশপাশে ব্যস্ততা, উলুও রোড এলিমেন্টারি স্কুলের বাইরের জীবন যেন ফিরে গেছে মহামারী পূর্ববর্তী স্বাভাবিক অবস্থায়। এক শিক্ষার্থীকে দেখা গেল, বাবাকে দেখে চিৎকার চেঁচামেচি করছে। কতদিন পর স্কুলে, আর বাবা কিনা এখনি বাড়ি নিয়ে যেতে এসেছে!

মানুষের জটলায় রাস্তায় গাড়ি চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে; সকালে নাস্তার স্টল আর বিভিন্ন দোকানে দেখা যাচ্ছে উপচে পড়া ভিড়।

“মহামারীর কারণে বাচ্চারা বছরের অর্ধেকটা সময়ই বাড়িতে ছিল, তারা ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারেনি যেমনটা স্কুলে পারতো,” ১২ বছর বয়সী ছেলের সঙ্গে সকালের নাস্তা খেতে খেতে বলছিলেন ওয়েই ফেনলিং।

সাত মাস পর ফের ছেলের স্কুলে যাওয়াটাই স্বস্তি দিচ্ছে এ নারীকে। যেন ‘একটা দৈত্য খাঁচা ছেড়ে বের হতে পারল’। অবশ্য এরপরও সতর্কতায় কমতি থাকছে না তার।

“যদিও এবারের প্রাদুর্ভাব শেষ, কিন্তু এরপরও আমরা একে হালকাভাবে নিতে পারি না,” বলেছেন ওয়েই।

উলুও স্কুলের কাছাকাছি আবাসিক এলাকাগুলোতে প্রায় ৪০ জনের দেহে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছিল বলে অভিভাবকরা জানিয়েছেন। কোভিড-১৯ উহানের তিন হাজার ৮৬৯ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে; এ সংখ্যা করোনাভাইরাসে চীনের মোট মৃত্যুর ৮০ শতাংশেরও বেশি। যদিও মে’র মাঝামাঝি থেকে হুবেই প্রদেশের এ রাজধানীতে স্থানীয়ভাবে সংক্রমণের একটি ঘটনাও ঘটেনি।

উহানের স্কুলগুলোকে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের গায়ের তাপমাত্রা মাপাসহ নানান সতর্কতামূলক ব্যবস্থাও নিতে হয়েছে।

সরকার শিক্ষার্থীদের স্কুলে আনা-নেওয়ার সময় অভিভাবকদেরকে গণপরিবহন এড়িয়ে চলতে পরামর্শ দেওয়ায় বেশিরভাগ বাসেরই অর্ধেক আসন ছিল খালি। অধিকাংশ শিক্ষার্থীকেই প্রাইভেট কার বা ইলেকট্রিক স্কুটারে চেপে স্কুলে যেতে ও ফিরতে দেখা গেছে।

সপ্তাহখানেক আগে খুলে দেওয়া উহান বিশ্ববিদ্যালয় প্রস্তুতি নিচ্ছে একঝাঁক নতুন শিক্ষার্থীকে বরণ করে নেওয়ার। অনুমতি ছাড়া বাইরের কেউ যেন ঢুকতে না পারে তা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয়টির ক্যাম্পাস সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার আগে সকল শিক্ষার্থীর করোনাভাইরাস পরীক্ষা হবে; বিদেশি শিক্ষার্থীদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট হাউসে ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে রাখা হবে।

৪০ বছর বয়সী কাইয়ো কাইয়ংয়ের ছেলে উলুও রোড স্কুলে পড়ে। ছেলের কয়েক মাসব্যাপী ‘হোম স্কুলিং’ শেষ হওয়ায় খুশি কাইয়ং। তারপরও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে এখনও অনেক সময় লাগবে বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এ শিক্ষক।

“ভাইরাস সামান্য জিনিস নয়, ফলে আমার মনে হয় আমাদের আরও সময় লাগবে। সম্ভবত কিছু জরুরি পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে, কিন্তু আমরাও তার জন্য ভালোভাবে প্রস্তুত,” বলেছেন এ নারী।

ডিসেম্বরে এ উহানেই চীনের প্রথম কোভিড-১৯ রোগীর খোঁজ মিলেছিল; পরে রোগটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের কোভিড-১৯ ড্যাশবোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত রোগটি বিশ্বের ৮ লাখ ৬৩ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য