মুদ্রাপাচার ও সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন প্রতিরোধে বিশ্ব সংস্থার ‘কড়া নজরদারি’ থেকে রেহাই পাওয়ার চেষ্টার অংশ হিসেবে পাকিস্তান নিষিদ্ধ ঘোষিত ৮৮টি সন্ত্রাসবাদী সংস্থা ও ব্যক্তির উপর আরও কড়াকড়ি আরোপ করেছে।

পাকিস্তানের দ্য নিউজের তথ্য অনুযায়ী, ওই নিষেধাজ্ঞায় দেওয়া তালিকায় সন্ত্রাসবাদী বিভিন্ন গোষ্ঠীর নেতাদের সঙ্গে ভারতের শীর্ষ সন্ত্রাসী পলাতক মাফিয়া ডন দাউদ ইব্রাহিমের নামও রয়েছে। সেখানে করাচির তিনটি বাড়িকে তার ঠিকানা হিসেবে দেওয়া হয়েছে।

১৮ অগাস্ট দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা পরিপত্রে তাদের সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ও ব্যাংক হিসাব জব্দ করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়। আগে থেকেই আর্থিক লেনদেন, অস্ত্র বহন ও ভ্রমণে তাদের উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল।

ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, পাকিস্তান এতোদিন দাউদ ইব্রাহিমকে আশ্রয় দেওয়ার কথা অস্বীকার করে এলেও ওই পরিপত্রের মাধ্যমে ‘দেশটিতে তার অবস্থানের তথ্য স্বীকার করে’ নিল।

তবে পাকিস্তান এই দাবি অস্বীকার করে বলেছে, এটা তাদের তালিকা নয়। নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের তৈরি তালিকাটির আলোকে তার এই পরিপত্র জারি করেছে।

দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রোববার এক বিবৃতিতে বলেছে, পরিপত্রে থাকা তালিকার তথ্যকে সুনির্দিষ্ট কারও পাকিস্তানে অবস্থানের বিষয়ে ‘সরকারের স্বীকৃতি’ হিসেবে দাবি করা ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর। এই তালিকা প্রকাশ নতুন নয়, আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা পূরণে গতবছরও তা প্রকাশ করা হয়েছিল।

তবে দাউদ ইব্রাহিমের পাকিস্তানে অবস্থানের দাবিকে পাকিস্তান স্বীকার করুক বা না করুক, সেখানে যে তার সম্পদ ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে, তার ইঙ্গিত জব্দ করার নির্দেশের মধ্যে স্পষ্ট।

ভারতীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, করাচির অভিজাত এলাকা ক্লিফটনে সৌদি মসজিদের কাছে ‘হোয়াইট হাউস’ নামে একটি বাড়িকে দাউদের ঠিকানা হিসেবে দিয়েছে পাকিস্তান সরকার। একই সঙ্গে করাচির ডিফেন্স হাউসিং অথরিটির ৩০ নম্বর রাস্তায় ৩৭ নম্বর বাড়ি ও নুরবাদে পাহাড়ি অঞ্চলে প্রাসাদোপম বাড়ির মালিকও দাউদ।

এ তিন ঠিকানার সবকটিই সন্ত্রাসবাদীদের নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের তৈরি সমন্বিত তালিকায় দাউদ ইব্রাহিমের ঠিকানা হিসেবে দেওয়া হয়েছে। ওই তালিকায় ২০০৩ সালের ৩ নভেম্বর দাউদের নাম-পরিচয় প্রথম আসে, যা কয়েকদফার পর সর্বশেষ ২০১৬ সালের ২২ অগাস্ট সংশোধিত হয়।

১৯৯৩ সালে মুম্বাইয়ে সিরিজ বোমা হামলাসহ ভারতে একাধিক জঙ্গি হামলার পেছনের হোতা হিসেবে অভিযুক্ত দাউদ যে করাচির বাসিন্দা, ভারত তা বহু বছর ধরে দাবি করে আসছে।

আনন্দবাজার বলছে, দাউদের যে ঠিকানার কথা পাকিস্তানের তালিকায় দেওয়া হয়েছে, তা অনেক আগেই সেই ইসলামাবাদের হাতে তুলে দিয়েছিল ভারত। সেসঙ্গে গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের হেফাজতে করাচিতে সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের নাকের ডগাতে দাউদ বাস করে বলেও দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে ভারত। তবে পাকিস্তান তা বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে।

এর মধ্যে হঠাৎ করে দেশটির সরকারি পরিপত্রে ঠিকানা-সহ দাউদ ইব্রাহিমের উল্লেখ থাকায় ভারতীয় গণমাধ্যমে বিষয়টি শোরগোল শুরু হয়।

ভারতের জি নিউজের প্রতিবেবেদনে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধ সংস্থা ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স (এফএটিএফ) পাকিস্তানকে কড়া নজরদারিতে রাখতে ২০১৮ সালে ‘ধূসর তালিকাভুক্ত’ করে জঙ্গি অর্থায়ন ও মুদ্রাপাচার রোধে একটি কর্ম পরিকল্পনা দিয়ে ২০২০ সালের জুনের মধ্যে তা বাস্তবায়নের লক্ষ্য বেঁধে দেয়।

তা না হলে দেশটির উপর বৈদেশিক লেনদেনে কড়াকড়ি আরোপের হুমকি দেওয়া হয়। কিন্তু পাকিস্তান তাতে সফল না হওয়ায় গত জুনে প্লেনারি অধিবেশনে দেশটিকে ধূসর তালিকায় রাখার সিদ্ধান্ত নেয় এফএটিএফ।

জি নিউজ বলছে, মহামারীর মধ্যে চীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ভার্চুয়াল ওই অধিবেশনে লশকর-ই তৈয়্যবা ও জইশ-ই মোহাম্মদের মতো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে অর্থ প্রবাহ বন্ধ করতে পাকিস্তান ব্যর্থ হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত আসে।

এর ফলে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে থাকা দেশটির পক্ষে আইএমএফ, এডিবি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো সংগঠনগুলোর কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অক্টোবরের মধ্যে কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে না পারলে উত্তর কোরিয়া ও ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানেরও কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সে ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অনুদান বন্ধ হওয়ার শঙ্কায় চাপের মুখে পড়েই দাউদের বিষয়টি পাকিস্তান একভাবে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে বলে ভারতের গণমাধ্যমগুলো মনে করছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য