লালমনিরহাটে এবার বর্ষায় কয়েক দফা বন্যার পর ভাঙন আতঙ্কে রয়েছে তিস্তা পাড়ের কয়েক হাজার পরিবার। মাঝ খানে নদী ভাঙন কিছুদিন থেমে থাকলেও আবারও তিস্তার ভাঙন কবলে পড়েছে লালমনিরহাট জেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন। এর মধ্যে লালমনিরহাট সদর উপজেলার গোকুন্ডা ইউনিয়নের তিস্তাপাড়ের চর গোকুন্ডা গ্রামটি ধীরে ধীরে পানির নিচে নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে। লালমনিরহাট জেলার মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে গোকুন্ডা ইউনিয়নের এই গ্রামটি।

তিস্তা নদীর বিভিন্নস্থানে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করায় নদী গর্ভে চলে যাচ্ছে ফসলি জমি, বসতভিটা, ফলের বাগান। হুমকিতে রয়েছে আরও বসতভিটা ও আবাদি জমি।

নদীভাঙনের শিকার চর গোকুন্ডা গ্রামের কৃষক মোত্তালেব হোসেন (৫৯) দ্য বলেন, যেভাবে তিস্তার ভাঙন শুরু হয়েছে তাতে করে চর গোকুন্ডা গ্রামটি হয়তো আর কোনদিন এ জেলার মানুষ দেখতে পাবে না। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে লালমনিরহাটের বিভিন্নস্থানের মতো চর গোকুন্ডায় তিস্তার ভাঙন তীব্র আকার ধারন করেছে। সেই সাথে নদী ভাঙন রোধে জিও ব্যাগে বালু ভরাটের নামে ভাঙন কবলিত এলাকাতেই ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করছেন ঠিকাদার। আর এ কারণে নদী ভাঙন আরো তীব্র আকার ধারন করেছে। মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে ৫০টি বসতভিটা ও কয়েকশ বিঘা আবাদি জমি তিস্তার গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এর আগে গত দুই মাসে আরও ৬০টি বসতভিটা ও বিপুল পরিমানে আবাদি জমি তিস্তার গর্ভে বিলীন হয়েছে।

ভাঙনের শিকার অপর আরও এক কৃষক খাইরুল বসুনিয়া (৫৬) বলেন, ‘তিস্তার অব্যাহত ভাঙনে লালমনিরহাট সদর উপজেলার মানচিত্র থেকে গোকুন্ডা ইউনিয়নের চর গোকুন্ডা গ্রামটি হারিয়ে যেতে আর বেশিদিন সময় লাগবে না।
তিনি আরও বলেন, আমি বুঝতে পারছি না ভাঙন কবলিত এলাকায় ড্রেজার মেশিন বসিয়ে কিভাবে বালু উত্তোলন করতে পারে? যে কারণে এখানে ভাঙন আরো তীব্র আকার ধারন করেছে। অবশিষ্ট রয়েছে আর মাত্র কয়েকটি বসতিভটা। সেগুলোও রয়েছে ভাঙনের হুমকিতে। এভাবে ভাঙন অব্যহত থাকলে হয়তো দুই/তিন দিনের মধ্যেই মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে এই চর গোকুন্ডা গ্রামটি।

অথচ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার তিস্তা পাড়ের মানুষ গুলোর কথা চিন্তা করে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে নদী ভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ প্রদান করেছেন। সে মোতাবেক ভাঙন ঠেকাতে প্রায় দুইমাস আগে পানি উন্নয়ন বোর্ড ৬৭ লাখ টাকা খরচে ১৪ হাজার ৭৫০টি জিও-ব্যাগ ডাম্পিং করার কাজ হাতে নিলেও ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে সে কাজের কোনো অগ্রগতি নেই।

‘জিও-ব্যাগে বালু ভরাটের নামে ভাঙন কবলিত এলাকার নদীতে ড্রেজার বসিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। এ কারণে ভাঙন আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

ভাঙনকবলিত এলাকার রহিমা বেগম (৪২) বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ঠিকাদারের গাফলতির কারণে আজ চর গোকুন্ডা গ্রামের মানুষজন বসতভিটা, আবাদি জমি ও বেঁচে থাকার অবলম্বন হারিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন সরকারি রাস্তায় ও অন্যের জমিতে।

‘পরিবার নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছি উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘অনেকে গ্রাম ছেড়ে চলে গেছেন অজানা ঠিকানায়। শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা নদী থেকে এলাকার সরকার দলীয় কিছু নেতাকর্মী ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করায় এখানে ভাঙন তীব্র হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই গ্রামের এক স্কুল শিক্ষক অভিযোগ করে বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজ সময়মতো শেষ না করায় চর গোকুন্ডায় তিস্তার ভাঙন থামছে না। একের পর এক বসতভিটা ও আবাদি জমি হারিয়ে যাচ্ছে। যদিও ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদাসিনতাকেই দায়ী করেছেন তিনি। কেননা প্রায় দুইমাস আগে ভাঙন কবলিত এলাকায় জিও ব্যাগে বালু ফেলার নির্দেশনা থাকলেও ঠিকাদারগন তাদের খেয়াল খুশিমত কাজ করছেন। নিয়ম অনুযায়ী অন্য জায়গা থাকে বালু এনে জিও ব্যাগ ভরাট করে ভাঙন কবলিত জায়গায় ফেলার কথা থাকলেও ঠিকাদারগন ওই ভাঙন কবলিত নদীতেই ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন করছেন। যার ফলে ওই চর গোকুন্ডায় ভাঙন আরো তীব্র আকার করেছে। অতিদ্রুত জিও ব্যাগ প্রস্তুত করে ভাঙনকবলিত স্থানে তা ফেলে ভাঙন ঠেকানোর দাবি জানান তিনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভাঙন কবলিত চর গোকুন্ডা গ্রামের এক কলেজ ছাত্র বলেন, আমার জানা মতে ওয়ার্ক অর্ডারে ভাঙন কবলিত এলাকার নদীর কিনারা থেকে বালু তোলায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অথচ এখানে নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করবেন না ভাঙন কবলিত এলাকাতেই ড্রেজার মেশিন বসিয়ে ফসলী রোপা আমনের ক্ষেত গুলো কিভাবে বালু দিয়ে ভরাট করছে। আর এ কারনেই ভাঙন আরো তীব্র আকার ধারন করেছে।

ভাগে কাজ পাওয়া তদারকির দায়িত্বে থাকা জাতীয় পার্টির নেতা সেকেন্দার আলীর ছেলে শীষ বলেন, একটু দেরীতে হলেও নদী ভাঙন রোধে আমরা কাজ করছি। ওয়ার্ক অর্ডারে কাজ শেষ করার সময়সীমা বেঁধে দিলেও আমরা আমাদের গতিতেই কাজ করবো। তাতে কতোদিন লাগে লাগুক আমাদের দেখার বিষয় নাই।

লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, ‘রাজনৈতিক প্রভাবে একটি কাজ পাঁচ ভাগ করে পাঁচ ঠিকাদার করছেন। সে কারণে কাজের কোনো গতি নেই।

‘ঠিকাদারদের বারবার তাগিদ দেওয়া হলেও তারা কর্ণপাত করছেন না জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে জিও- ব্যাগ প্রস্তুত করে তা ডাম্পিং করা না হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে নতুন ঠিকাদারের মাধ্যমে কাজটি সম্পন্ন করা হবে।

জিও-ব্যাগে বালু ভরাটের নামে যাতে নদীর কিনারা থেকে বালু তোলা না হয় সেজন্য তারা বিশেষ নজর দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য