“এটা পুরো নরক,” জেল থেকে বেরিয়ে মন্তব্য করেছেন নাতালিয়া ডেনিসোভা – “আমাদের বাঁচান।”

নাতালিয়া বলছেন পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে জেলে নিয়ে যাবার পর বেলারুসের বেশিরভাগ মানুষের মতই পুলিশ তার ওপর নির্যাতন ও দুর্ব্যবহার করেছে।

“তারা আটকদের সবার ওপর নির্যাতন তো করছেই, এমনকী অল্পবয়সী মেয়েদেরও নির্যাতন করছে।”

জেল থেকে ছাড়া পাওয়া অন্যদের ভাষ্যের সঙ্গে তার বিবরণের যথেষ্ট মিল রয়েছে। সবাই বলেছে পুলিশ হেফাজতে তাদের ওপর মারধর করা হয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশানাল বলছে “ব্যাপক নির্যাতনের” খবর পাওয়া গেছে।

রোববারের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর যে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে তার পর থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে প্রায় ৬,৭০০ মানুষকে।

আলেক্সান্ডার লুকাশেংকো ক্ষমতায় আছেন একনাগাড়ে ১৯৯৪ সাল থেকে। নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ রোববারের নির্বাচনে তাকে বিজয়ী ঘোষণা করে বলে তিনি জিতেছেন ৮০.১% ভোটের ব্যববধানে। বিরোধী সমর্থকরা এই ফল প্রত্যাখান করে এবং এই সপ্তাহান্তেও আরও প্রতিবাদ বিক্ষোভের পরিকল্পনা নেয়।

প্রধান বিরোধী দলের নেত্রী স্ভেৎলানা তিখানোভস্কায়া সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানান। তবে নিজে সাত ঘন্টা আটক অবস্থায় থাকার পর মুক্তি পেয়েই তিনি পালিয়ে গেছেন লিথুয়ানিয়ায়।
‘আমি ভলান্টিয়ার হতে চেয়েছিলাম’

আটক বিক্ষোভকারীদের মুক্তির দাবিতে রাজধানী মিনস্কে নারীরা মিছিল করেছেন

“আমি চেয়েছিলাম নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক হতে, নির্বাচন যাতে সৎভাবে ও স্বচ্ছতার সাথে হয় তা নিশ্চিত করতে চেয়েছিলাম,” বলছেন মিজ ডেনিসোভা।

নাতালিয়া ডেনিসোভা বেলারুসের রাজধানী মিনস্কের একজন আইনজীবী। তিনি যখন তার স্থানীয় ভোট কেন্দ্রে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য সরকারি পারমিটের আবেদন করেছিলেন, তখন তিনি ভাবেননি যে এজন্য তাকে শেষ পর্যন্ত কারাভোগ করতে হবে।

“আমাকে ভোট কেন্দ্রের ভেতরে থাকতে দেয়া হয়নি,” তিনি বলছেন। “পাঁচ দিন আমি বাইরে দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষণ করেছি, কত লোক ভোট দিতে আসছেন তা নথিভুক্ত করেছি এবং নির্বাচন কমিশন পরে যে সরকারি সংখ্যা দিয়েছে তার সাথে সেটা মিলিয়ে দেখেছি।”

যারা ভোট দিতে ঢুকছেন, ঢোকা বা বেরনো – কোন পর্যায়ে তাদের সাথে পর্যবেক্ষকদের কথা বলার অনুমতি দেয়া হয়নি এবং তাদের সম্পর্কে ব্যক্তিগত কোন তথ্য জানারও অনুমতি ছিল না।

তিনি বলছেন, তিনি নিয়ম “অক্ষরে অক্ষরে” মেনে কাজ করেছেন, “আমি আইনজীবী। আইন মানাটা আমার রক্তে।”

বিক্ষোভে উত্তাল বেলারুশ: নিপীড়নের মুখে মানুষ এখন আরও নির্ভীক

বিক্ষোভকারীদের ওপর বেলারুশিয়ান পুলিশ সহিংস আচরণ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে

“নির্বাচনের প্রথম পাঁচদিনে আমি ব্যাপক প্রতারণা নথিভুক্ত করেছি,” বলছেন মিজ ডেনিসোভা।

“প্রত্যেক দিন আমি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কাছে, সেই সাথে পুলিশ প্রধান ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ জমা দিয়েছি। আমি তাদের বলেছি এই প্রতারণা বন্ধ করুন, কারণ এগুলো ফৌজদারি অপরাধ,” তিনি বলছেন।

তিনি বলেন ৯ই অগাস্ট “নির্বাচনের মূল দিনে” তিনি অন্যান্য নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষককে তার সাথে যোগ দেবার আহ্বান জানান।

কিন্তু মিজ ডেনিসোভা বলছেন, সাতজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে এবং নির্বাচন কমিশনের প্রধান তার ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের বাইরে দাঁড়ানো নিষিদ্ধ করে দেন।

“কমিশন প্রধান বলেন ‘তোমাকে সতর্ক করে দিচ্ছি’। আমি সেখান থেকে চলে যেতে অস্বীকার করি। তিনি তখন পুলিশ ডাকেন। পুলিশকে তিনি বলেন আমি একজন গুণ্ডা এবং আমি আগ্রাসীভাবে মানুষজনকে হয়রানি করছি,” বলেন নাতালিয়া ডেনিসোভা।

“তারা আমাকে থানায় নিয়ে যায় এবং গ্রেফতার করে তিনদিন আটক রাখে।”

মিনস্কে অকরেস্টিনা আটক কেন্দ্রের বাইরে অপেক্ষায় আটকদের আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুরা

নাতালিয়া বলছেন তাকে অন্যান্য প্রতিবাদকারীদের সাথে “ভয়াবহ ও অসহনীয় অবস্থার মধ্যে তিন দিন” আটক রাখা হয়।

প্রথমে তাকে নিয়ে যাওয়া যায় রাজধানী মিনস্কের অকরেস্টিনা আটক কেন্দ্রে।

“অকরেস্টিনা- এখানে এখন এই নামটা সবার কাছে চেনা। এটা পুরো নরক,” তিনি বলছেন। “নিজের কোন ব্যক্তিগত জিনিস সেখানে নেয়া নিষেধ। দাঁতের ব্রাশ কিংবা টুকরো সাবান কিছুই না, এমনকী পানীয় জলও না।”

তাকে সেখানে রাখা হয় পুরো একটা দিন, “এবং কেউ আমাকে কিছু খেতে দেয়নি,” তিনি বলেন।

জেলের মধ্যে তার সেলে আরেকজন বন্দী অজ্ঞান হয়ে গেলে তিনি সাহায্য চান। কিন্তু কেউ আসেনি।

“আমি দরোজায় ধাক্কা মেরে চিৎকার করছিলাম ‘এখানে চিকিৎসা সাহায্য দরকার!’ তখন একজন রক্ষী এসে আমাকে বলে ‘আবার যদি তুমি ডাক দাও, আমি তোমার হাত ভেঙে দেব’।”

“অকরেস্টিনা আটক কেন্দ্রে আমার সাথে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে, আমার সাথে অশালীন আচরণ করা হয়েছে,” বলছেন মিজ ডেনিসোভা। দুবার তাকে নগ্ন অবস্থায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে এবং অশালীনভাবে তার শরীর তল্লাশি করা হয়েছে।

“মনস্তাত্ত্বিকভাবে এটা অবশ্যই যন্ত্রণাদয়ক,” তিনি বলেন। কিন্তু তিনি বলেন তিনি “ভাগ্যবান”, কারণ পরদিন তাকে অন্য একটি জেলে সরিয়ে নেয়া হয়।

আটক যাদের শুক্রবার মুক্তি দেয়া হয় মিনস্কের আটক কেন্দ্রের বাইরে তাদের চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়

অকরেস্টিনা আটক কেন্দ্রে মিজ ডেনিসোভারে সাথে একই কারাকক্ষে ছিলেন মারিয়া মোরোজ। তিনি প্রধান বিরোধী প্রার্থী মিজ টিখানোভস্কায়ার প্রচারণা ম্যানেজার ছিলেন।

“তিনি খুবই সাহসী নারী। দারুণ। বেলারুসে যে এমন মানুষ আছেন তাতে আমি গর্বিত,” বলেন মিজ ডেনিসোভা।

তিনি বলেন “কিন্তু এটাও আমি বলতে চাই যে, আমার সেলে যে আটজন মেয়েকে আটক রাখা হয়েছিল, তাদের মধ্যে চারজনকে মুক্তি দেয়া হয়নি।”

মিজ ডেনিসোভার ধারণা অকরেস্টিনায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে: “ওরা সবাইকে নির্যাতন করছে। ওরা অল্পবয়সী মেয়েদেরও নির্যাতন করছে। ওদের খাবার বা পানি কিছুই দিচ্ছে না। যে সেলে ছয় থেকে আটজন থাকার কথা সেখানে ওরা ৫০ জন পর্যন্ত বন্দীকে গাদাগাদি করে রাখছে।”

তিনি বলছেন সময়ে সময়ে গরমে নি:শ্বাস নেয়া কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

“ওরা মানুষকে বেদম মারধর করছে। আটকদের বাপমায়েরা কেন্দ্রের বাইরে দাঁড়ানো। যখন ভেতরে তাদের মারা হচ্ছে তাদের আর্ত চিৎকার তারা বাইরে থেকে শুনতে পাচ্ছেন।”

অকরেস্টিনা আটক কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসার পর আটকরা আঘাতের চিহ্ণ দেখাচ্ছেন

নাতালিয়া যেসব অভিযোগ করছেন, বিবিসির সাংবাদিকদের কাছে রাস্তাঘাটে সেই একইধরনের অভিযোগ করেছেন অনেক সাধারণ মানুষ, যাদের মধ্যে রয়েছেন অনেক তরুণ। তারাও বর্ণনা

করেছেন তারা কীধরনের মারধরের শিকার হয়েছেন।

“তারা মানুষজনকে সহিংসভাবে বেদম প্রহার করছে। তাদের এজন্য রক্ষাকবচ দেয়া হচ্ছে এবং যাকে খুশি গ্রেফতার করা হচ্ছে। আমাদের সারা রাত ধরে চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করা হয়। মেয়েদের প্রহার করা হচ্ছে আমরা শুনতে পাচ্ছিলাম। এটা অবর্ণনীয় নিষ্ঠুরতা,” নিজের আঘাতের চিহ্ণ বিবিসিকে দেখিয়ে বলছিলেন এক ব্যক্তি।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশানাল বলছে আটক ব্যক্তিরা অভিযোগ করেছে তাদের নগ্ন করা ও প্রহার করা হয়েছে, এবং তাদের ধর্ষণ করার হুমকি দেয়া হয়েছে।

“যাদের আগে আটক করা হয়েছে, তারা বলেছে দেশটির আটক কেন্দ্রগুলো নির্যাতন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সেখানে বিক্ষোভকারীদের মাটিতে ধুলোর ওপর শুতে বাধ্য করা হচ্ছে, তারপর পুলিশ তাদের লাথি মারছে এবং লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছে, ” বলছেন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশানালের পূর্ব ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক পরিচালক মারি স্ট্রুথার্স।

বিবিসির একজন সাংবাদিক অকরেস্টিনা আটক কেন্দ্রের ভেতর থেকে আর্তচিৎকার রেকর্ডও করেছেন।

মুক্তি পাওয়া একজন সাংবাদিক নিকিতা তেলিঝেঙ্কো অত্যাচারের ভয়ঙ্কর একটি বিবরণ প্রকাশ করেছেন। তিনি বর্ণনা করেছেন আটক কেন্দ্রের ভেতরে মেঝেতে মানুষকে কীভাবে ফেলে রাখা হয়েছে একজনের ওপর আরেকজনকে স্তুপাকার করে – তারা পড়ে আছেন রক্ত ও মলমূত্রের মধ্যে।

বন্দীদের ঘন্টার পর ঘন্টা টয়লেট ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হচ্ছে না, এমনকী তাদের এক জায়গায় ঠায় একভাবে থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে, নড়তেও দেয়া হচ্ছে না বলে তিনি জানাচ্ছেন ।

বেলারুসের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ইয়ুরি কারায়েফ রাস্তায় যারা “অনিচ্ছাকৃতভাবে আঘাতপ্রাপ্ত” হয়েছেন তাদের প্রতি দু:খপ্রকাশ করেছেন, তবে রিমান্ড কেন্দ্রগুলোতে কারো সাথে দুর্ব্যবহার করার কথা তার মন্ত্রণালয় অস্বীকার করেছে।

মন্ত্রণালয় জোর দিয়ে আরও বলেছে যে তারা যথযাথ ও যেটুকু প্রয়োজন সেটুকু পদক্ষেপই নিয়েছে এবং জানিয়েছে শতাধিক পুলিশ আহত হয়েছে।

“এই অত্যাচার নির্যাতন এখনও চলছে। কাজেই বিশ্বের সরকারগুলো ও মানুষের কাছে আমার আহ্বান আমাদের বাঁচান, যে কোনভাবে আমাদের সাহায্য করুন,” বলছেন নাতালিয়া ডেনিসোভা।

“আমার কিছুই করার ক্ষমতা নেই। আমি শুধু আটক কেন্দ্রের মেয়েগুলোর জন্য প্রার্থনা করতে পারি।”

মুক্তি পাবার পর মিজ ডেনিসোভা অকরেস্টিনে এখনও আটক মারিয়া মোরোজ এবং অন্যান্য নারীদের সাহায্য করার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন বলে বলছেন।

“সেখানে ঠাণ্ডায় মারিয়া অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আমাকে তার জন্য কিছু কাপড়চোপড় পৌঁছে দেবার অনুমতি দেয়া হয়েছিল।”

তার ছয় বছরের সন্তানকে বাসায় দেখাশোনা করছেন তারা বাবামা।

বাচ্চাটাকে বলা হয়নি তার মাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। সে সবসময় কাঁদছে আর জানতে চাইছে আমার মা কোথায়?” জানাচ্ছেন মিজ ডেনিসোভা।

মিজ ডেনিসোভা বলছেন তিনি তার ছেলেকে বলেননি দেশের এই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তার ভূমিকার কথা।

কিন্তু তিনি বলছেন, “আমাকে ধরে নিয়ে যাবার দুদিন আগে আমার ছেলে জিজ্ঞেস করেছিল ‘মা তোমাকে কি ওরা জেলে ধরে নিয়ে যাবে?'”

“জানি না কেন সে জানতে চেয়েছিল। আমার মনে হয় চারপাশে একটা ভয়ের পরিবেশ বোধহয় সে ঠিকই বুঝতে পেরেছিল,” তিনি বলছেন।

“আমি বলেছিলাম ভয় না পেতে, কিন্তু কীভাবে যে সে বুঝতে পারছিল ভেবে অবাক লাগছে। চারপাশে ভয়ানক কিছু ঘটলে এমনকী শিশুরাও বুঝতে পারে।”

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য