আরিফ উদ্দিন, গাইবান্ধা প্রতিনিধিঃ দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম দ্বিতীয় পণ্য চামড়া। সেইসাথে চামড়া কেনা-বেচায় গোটা দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী পলাশবাড়ী পৌরশহরের কালীবাড়ী হাটে সুষ্ঠু-শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ও কঠোর পুলিশী নিরাপত্তার নজরদারির মধ্যদিয়ে চামড়া কেনা-বেচা সম্পন্ন করা হয়। মঙ্গলবার দুপুর হতে বুধবার রাত ৯টা পর্যন্ত হাটে আমদানিকৃত গরু ও ছাগলের চামড়া সমূহ নির্বিঘেœ কেনা-বেচা সম্পন্ন হয়েছে।

উত্তরাঞ্চলের অন্যতম একটি ঐতিহ্যবাহী হাট গাইবান্ধার পলাশবাড়ী পৌরশহরের কালীবাড়ী হাট। গত ১ আগস্ট শনিবার ছিল পবিত্র ঈদুল আযহা। সপ্তাহের প্রতি বুধবার কাকডাকা ভোরে হাটটিতে রাজধানী ঢাকা থেকে ছোট-বড় ক্রেতা, ট্যানারি-লেদার, বিভিন্ন সু-জুতা, সেন্ডেল ছাড়াও চামড়া দিয়ে উৎপাদিত নানা পণ্য তৈরির সাথে সম্পৃক্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নানা স্থান থেকে হাটটিতে সরাসরি আসা চামড়া ক্রেতা এবং বিক্রেতাদের বিপুল সমাগম-কোলাহল আর পাদচারণায় মুখরিত হয়ে বাৎসরিক মিলন মেলায় পরিণত হয়ে উঠতো।

চামড়ার ধপাস ধপাস আর মানুষের গুঞ্জনের শব্দ একটি অন্যরকম আবহের সূচনা হলেও এবারের ঈদহাট প্রেক্ষাপটের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। জল্পনা-কল্পনার সিমানা পেরিয়ে পরন্ত বৈকাল বেলায় চোঁখে পড়ার মত বেচা-কেনার মাত্রা বৃদ্ধি পায়। একপর্যায় চামড়া বিক্রেতা একে-অপরের মধ্যে গুঞ্জনের ধূম পড়ে যায়-কার কত লাভ আর কার কতইবা লোকসান।

চামড়ার দরপতনের অধঃপতন এবারই প্রথম নয়। এরআগেও নানা কারণে একাধিকবার এমন না হলেও দরপতনের ঘটনা ঘটেছে। অভিজ্ঞ চামড়া ক্রেতাদের অনেকেই জানান, বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ করোনা ভাইরাসের এ দুঃসময়ে প্রায় সবারই ধারনা চামড়ার বাজার দর আরো কম হবার যথেষ্ট আশঙ্কা বিদ্যমান। এবারের হাটে চামড়ার আমদানি অনেকটাই কম।

চামড়া বেচা-কেনায় দীর্ঘ ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন রংপুরের মীরবাগ থেকে আসা ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলামসহ অনেকের সাথে কথা বলে জানা যায়, বিগত যে কোন সময়ের তুলনায় করোনাকালীন এমন সময়েও এবারের ঈদে কোরবানি সম্ভাব্য বেশি হয়েছে।

তিনি বলেন গত বছর ছাড়াও বিগত বছর গুলোতে চামড়ার ভালো ছিল। দরপতন ধ্বংসের ধারাবাহিকতায় এ বছর চামড়া অন্ততঃ ৪-৫টি পৃথক গ্রেডে প্রথমত: ২’শ হতে ৪’শ হতে ৫’শ এবং দ্বিতীয়ত স্বল্প সংখ্যক চামড়া ৬’শ হতে ৯’শ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। এক্ষেত্রে লোকসান হোক অথবা লাভ হোক টাকার অংক ছিল যতসমান্য। আর ছাগল প্রতিপিস চামড়া ২ হতে ৫ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। কোন-কোন ক্ষেত্রে ৮০-৯০টি ছাগলের চামড়া একত্রে পালাভাও ১’শ টাকা হতে ২’শ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেছেন। ছাগল-ভেঁরির চামরা ক্রয় ও বিক্রয়ে ফঁড়িয়ারা বেশ লোকসান গুনেছেন।

সরেজমিন হাট ঘুরে তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, এবারে সবচেয়ে বঞ্চিত হয়েছে সমাজের অবহেলিত জনগোষ্ঠী। গরীব-দুঃখী, অসহায়-নিরুপায়, ফকির-মিসকিন, এতিমখানা-মাদ্রাসা ও মসজিদ-মোক্তব সমূহ। স্মরণকালের ভয়াবহ করোনাভাইরাসের একইসাথে চামড়ার বাজার মূল্যও দরপতন নিয়ে হাটে সমেবেতদের মাঝে লাভ-লোকসানের আলোচনা-সমালোচনা ও পর্যালোচনাসহ মিশ্র প্রতিক্রিয়ার যেন শেষ নেই।

হাটে আসা ক্রেতা-বিক্রেতা, ইজারাদার, উপজেলা চামড়া ব্যবসায়ি সমিতি, রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন চামড়া শিল্পের মালিক, উত্তরাঞ্চল-দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনতে সরাসরি হাটে আসেন। ট্যানারী শিল্পের প্রতিনিধি, অন্যান্য নামী-দামী কোম্পানির প্রতিনিধি, ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে হাটে সন্তোষজনক সংখ্যক ক্রেতাদের সমাগম ঘটে।

হাটে দাম কম কলেও বেচা-কেনা হয়েছে চাহিদার সহিত। বেচা-কেনার সময় বুধবার দুপুর নাগাদ এসময় লাগাতার প্রায় দু’ঘন্টা মুষলধারে বৃষ্টি পড়ায় কেনা-বেচা বন্ধ হয়ে পড়ে। বৃষ্টি বন্ধের পর দ্বিতীয় দফায় বিকেল ৩টা নাগাদ আবারো পুরোদমে কেনা-বেচা শুরু হয়ে তা রাত প্রায় ৯টা পর্যন্ত চলতে থাকে। আগেরদিন মঙ্গলবার দুপুর থেকেই ট্রাক-মিনি ট্রাক, ভটভটি, অটো ও চার্জার ভ্যানরিক্সা ছাড়াও বিভিন্ন পরিবহণ যোগে হাটে চামড়া আসতে শুরু করে।

রাত-দিন পেরিয়ে বুধবার প্রত্যুষে কাকডাকা ভোরে বিক্রেতারা তাদের চামড়ার লট সমূহ ধপাস-ধপাস শব্দে ওলট-পালট করতে ব্যস্ত হয়ে উঠেন। ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষনে চামড়ার লট সমূহ প্রদর্শনে একের পর এক ওলট-পালট করার প্রয়োজন পড়ে বলে তারা জানান।

হাট ইজারাদার গংদের পক্ষে শফিকুল ইসলাম মিন্টু জানান, গত ঈদের তুলনায় এবার হাটে অর্ধেকেরও কম আনুমানিক ২০ হাজার পিস গরুর চামড়া আমদানী ঘটে বলে তিনি জানান।

অপরদিকে; পলাশবাড়ী উপজেলা চামড়া ব্যবসায়ি সমিতির সভাপতি আলহাজ্ব আফতাব মোল্লা ও সাধারণ সম্পাদক মিনু মন্ডল ছাড়াও স্থানীয় ছোট-বড় ক্রেতা ও আড়ৎ মালিকসহ অনেকেই জানান গত ঈদুল আযহায় হাটে আমদানির প্রায় অর্ধেক ৩৫ থেকে ৪০ হাজার গরুর চামড়ার আমদানি ঘটে। যা যতসামান্য ছাড়া সমূদয় বিক্রি সম্পন্ন হয়। ছাগলের প্রতিপিস চামড়ার দাম ছিল ৫ থেকে ২০ টাকা। দিনভর বিক্রি না হলেও সন্ধা নাগাদ পুরোপুরি কেনা-বেচা সম্পন্ন হয়। পলাশবাড়ীর চামড়া ক্রেতাদের মধ্যে মিনু মন্ডল ৩’শ হতে ৯’শ টাকা দরে প্রায় এক হাজার চামড়া কিনেছেন। দুলাল কুমার দে এবং তার সহযোগি ক্রেতা সাইফুল ইসলাম নান্নু, আবুল কাওসার বাবলু প্রায় একই দরে কিনেছেন প্রায় দেড় হাজার পিস গরুর চামড়া। চামড়া ব্যবসায়ি ও মাংস বিক্রেতা মাহামুদুল হকও অন্ততঃ দেড় হাজার পিস চামড়া কিনেছেন বলে তিনি জানান। এমনি করে ঢাকা থেকে আসা আর.কে কোম্পানির পক্ষে মামুন, আজমেরি, আরামিরা, এ্যাপেক্সের পক্ষ থেকে পৃথক ৪ জন ক্রেতা, রিল্যায়েন্স, মোহাম্মদ আলী, জাইদুল ও মাসুদ ছাড়াও ছোট-বড় নামী-দামী অনেক ট্যানারি বা কোম্পানির একাধিক প্রতিনিধি ছাড়াও পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, পাবনা, নাটোর, করটিয়া, তারাগঞ্জ, সৈয়দপুর ও ময়মনসিংহ এলাকা থেকে আসা অসংখ্য ক্রেতাদের হাটে সমাগম ঘটে। সর্বস্তরের ক্রেতা-বিক্রেতা জানান হাটে আমদানীকৃত কতিপয় দুই-এক জন বিক্রেতার যৎসামান্য সংখ্যক ফেরত ছাড়া সমূদয় চামড়া সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ক্রয়-বিক্রয় সম্পন্ন হয়েছে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নানা স্থান থেকে হাটটিতে চামড়া ক্রয়-বিক্রয় করতে আসা ব্যবসায়িদের কেনা কাটায় অনাকাঙ্খিত এবং অপ্রত্যাশিত কোন অঘটন ছাড়াই নিরাপদ-নির্বিঘœ কেনাবেচা সম্পন্ন করতে সার্বক্ষণিক সাদা ও পোষাকধারী পুলিশী নিরাপত্তা টহল জোরদার ছিল বলে জানান থানার অফিসার ইনচার্জ মাসুদুর রহমান মাসুদ।

এদিকে কোনক্রমেই যেন অপ্রত্যাশিত কোন ঘটনা না ঘটে এজন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. কামরুজ্জামান নয়ন, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলহাজ্ব একেএম মোকছেদ চৌধুরি বিদ্যুৎ, পৌর প্রশাসক মো. আবু বকর প্রধান যৌথ এবং এককভাবে মঙ্গলবার সন্ধা নাগাদ থেকে পরদিন বুধবার রাত ৯টা পর্যন্ত চামড়া কেনা-বেচা অব্যাহত কালীন দফায় দফায় একাধিক বার সরেজমিন হাটস্থল পরিদর্শন করেছেন। কোন প্রকার কোন অঘটন ছাড়াই সুষ্ঠু পরিবেশের মধ্যদিয়ে চামড়া কেনাবেচা সম্পন্ন হওয়ায় হাট ইজারাদার সর্বস্তরের সবার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য