এক সময় রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার চৈত্রকোল বিলের ২ হাজার ২’শ হেক্টর আয়তনের বেশির ভাগ অংশ জলাবদ্ধতার কারণে অনাবাদি পড়ে থাকতো। এতে স্থানীয় কৃষকদের জমি থাকতেও কোন বর্ষা মওসুমেই ফসল উঠত না তাদের ঘরে।

বছরে কেবল মাত্র একটি ফসল উৎপাদন সম্ভব হতো বিলের আশেপাশের প্রায় ১০ হাজার কৃষকের। চৈত্রকোল বিলের অবস্থান পীরগঞ্জ উপজেলার চৈত্রকোল ইউনিয়নে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য রংপুর বিএডিসি ১০ কিলোমিটার খালটি পুনঃ খননের উদ্যোগ নেয়।

“রংপুর অঞ্চলের ভূউপরিস্থ পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে ক্ষুদ্রসেচ উন্নয়ন ও সেচ দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ” প্রকল্প, বিএডিসি, রংপুর এর অর্থায়নে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে খালটি পুনঃখনন করা হয় প্রায় ১ কোটি টাকা ব্যয়ে। বিএডিসি’র উদ্যোগে খালটি পুনঃখনন করার ফলে বদলে গেছে সেই বিলের চিত্র ও স্থানীয় কৃষি ব্যবস্থা। এখন বিলের পানি খননকৃত খাল দিয়ে দ্রুত প্রবাহিত হয়ে করতোয়া নদীতে চলে যায়। ফলে বিলসংলগ্ন এলাকার ১৪ টি গ্রামের প্রায় ১২ হাজার মানুষ সুফল পেতে শুরু করেছে। এরইমধ্যে স্থানীয় কৃষকগণ আমন ও বোরো মৌসুমে ভালো ফসল পেয়েছে।

এ ছাড়া সুবিধাভোগীরা পানির প্রবাহ ঠিক রেখে খননকৃত খালে মাছ চাষ শুরু করেছেন। কৃষক সিরাজুল ইসলাম বলেন আগে আশেপাশের কিছুটা উঁচু জমিতে বোরো চাষ করলেও তারা ধান ঘরে তুলতে পারতেন না। সব সময় বৃষ্টির ভয় থাকত। এবারই প্রথম খননকৃত খালের দু পাশের অধিকাংশ কৃষক বোরো আবাদ করতে পেরেছেন।

স্থানীয় কৃষক রামচন্দ্রপুর গ্রামের জয়নাল আবেদীন,খালিশা গ্রামের আবদুর রহমান,দুর্গাপুর গ্রামের আবদুল মান্নান,ভরট্টজানপুর গ্রামের সোলায়মান আলী,অনন্তরামপুর গ্রামের কদম আলী,আব্দুল মমিন জানান, গত আমন মওসুমে প্রত্যেকেই ২ হতে ৩ একর জমিতে একর প্রতি ২০ হতে ২২ হাজার টাকা খরচ করে প্রতি একরে প্রায় ১৩০ মণ করে ধান পেয়েছেন।

অন্যদিকে খালের পানি শ্যালো বা এলএলপি দিয়ে সেচ দেয়ার কারণে উৎপাদন খরচ কমেছে আবার জলাবদ্ধতার আশংকাও ছিল না। এসব বিষয়ে রংপুর বিএডিসি’র নির্বাহী প্রকৌশলী এএইচএম মিজানুল ইসলাম জানান, প্রায় ২হাজার হেক্টর জমিতে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য খাল কেটে করতোয়া নদীর সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে। এতে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানের পাশাপাশি শুষ্ক মওসুমে ফসলে সেচ হিসেবে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার হয়েছে।

উল্লেখ্য, বিএডিসি কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের আওতায় ২০১৯-২০ অর্থ বছরে পীরগঞ্জ উপজেলায় আরও দুটি খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। একটি রায়পুর, রামনাথপুর ও কাবিলপুর ইউনিয়নে ২০ দশমিক ৪০ কি.মি. আখিরা মরা খাল এবং অপরটি ভেন্ডাবাড়ী, মদনখালী ও কুমেদপুর ইউনিয়নের ৮দশমিক ৭৫ কি.মি. দীর্ঘ সোনামতি খাল।

এ খাল দুটি খননের ফলে চলতি বছরের বর্ষা মওসুমে পীরগঞ্জ উপজেলার অধিকাংশ এলাকা বন্যার কবল থেকে রক্ষা পেয়েছে। এতে ফসলে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে হ্রাস করা সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া খালের আশেপাশের জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য খাল দুটির উভয় পাড়ে ৪২ টি ওয়াটার পাসিং স্ট্রাকচার নির্মাণ করা হয়েছে। খালের পানি ইতোমধ্যে কৃষকরা শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে পাশের জমিতে সেচ দেয়ার সুবিধে পাচ্ছে।

খালে মাছ চাষ সহ দু ’পাড়ে মাচা তৈরি করে সবজি চাষও হচ্ছে কোন কোন এলাকায়। খালের ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার করে সেচ দেয়ার জন্য নির্মিত হচ্ছে ১০টি বিদ্যুৎ চালিত এলএলপি ও ৫টি সৌরশক্তি চালিত এলএলপি। উল্লেখ্য,আখিরা মরা খালটি আখিরা নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে আবার ৩টি উপজেলা ঘুরে আখিরা নদীতে গিয়ে মিশেছে।

কাবিলপুর ইউনিয়নের চেরাগপুর গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী,আব্দুল মালেক ,নওশা মন্ডল জানান, আগে সামান্য বৃষ্টিতে ওই এলাকায় আশপাশে প্রায় শতাধিক একর জমিতে জলাবদ্ধতায় উৎপাদন ব্যাহত হতো। কিন্তু বর্তমানে খালটি খনন করার ফলে খালের আশপাশে জমিতে বর্ষা মওসুমেও ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে।

এ ব্যাপারে বিএডিসি (ক্ষুদ্রসেচ) সার্কেল এর প্রকল্প পরিচালক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সঞ্চয় সরকার বলেন- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা “ এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে” শ্লোগানকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জলাবদ্ধতা দূরীকরণে মূলত প্রকল্পের আওতায় রংপুর অঞ্চলে ২’শ কি.মি খাল পুনঃখনন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। প্রকল্পটি সম্পুর্ন বাস্তবায়িত হলে প্রকল্প এলাকায় জলাবদ্ধতার সমস্যা অনেকাংশে হ্রাস পাবে, ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি হওয়া ছাড়াও সেচ কাজে ভূ-গর্ভস্থ পানির উপর চাপ কমে ভূ-উপরিস্থ পানি নির্ভর সেচ ব্যবস্থাও গড়ে উঠবে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য