কুড়িগ্রাম জেলার হাজারো ভুক্তভোগী খামারি ও গৃহস্থ বিরল ‘লাম্পি স্কিন ডিজিজ’ ভাইরাসের সংক্রমনে গবাদি পশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। সামনে কোরবানির ঈদ। অথচ পশু বিক্রি দূরের কথা পশুর জীবন নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় তারা।

খামারি শাহীন জানান, তার দুটি গরুর একটি গত ফেব্রুয়ারিতে এনাপ্লাজমা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। পরে তিনি এই গাভীটিকে আকড়ে ধরে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন বুনেছিলেন। কিন্তু লাম্পি স্কিন ডিজিস তার সেই স্বপ্নও ভেস্তে দিয়েছে, শাহীনের এই গাভীটি মারা যায়। এ রোগে উপজেলায় আরও অনেকের গরু আক্রান্ত হয়েছে। কয়েকজনের গরু মারাও গেছে।

শাহীন বলেন, জমি বন্ধক এবং ঋণ করে গত বছর বগুড়া থেকে গরুটি কিনেছিলাম। বাছুর হওয়ার পর প্রতিদিন প্রায় ১৫ লিটার করে দুধ দিতো। জুনের প্রথম সপ্তাহে রোগে আক্রান্ত হলে দুধ দোয়ানো বন্ধ করে গাভীর চিকিৎসা শুরু করি। উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসসহ বিভিন্ন এলাকার চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা করাই। প্রায় ২৫ হাজার টাকা ব্যয় করেও গাভীটিকে বাঁচাতে পারলাম না। আমি একেবারে সর্বস্বান্ত হয়ে গেছি। আমার মূলধন বলতে আর কিছুই থাকলো না। আমি এখন ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ঘুরছি। বাছুরটি যাতে আক্রান্ত না হয় সেজন্য এক সপ্তাহ আগে বিক্রি করে দিয়েছি।

শাহীন আরও জানান সপ্তাহ দুয়েক আগে একই ইউনিয়নের তেলিপাড়া গ্রামের এক গৃহস্থের একটি দামড়া গরু মারা গেছে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে।

প্রাণী চিকিৎসকরা বলছেন, গত বছর (২০১৯) অক্টোবরে ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা এই আফ্রিকান ভাইরাসটি ব্যাপক হারে সংক্রমন ঘটাচ্ছে। তবে বর্তমানে অনেকটা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এ ভাইরাসের সংক্রমন রোধে সীমান্তপথে গরু অনুপ্রবেশ বন্ধ করার পরামর্শ দেন প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকরা।

চিলমারী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. রাশিদুল হক জানান, এ উপজেলার সাড়ে ৩শ’র বেশি গরু এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। যেগুলোর চিকিৎসা তারা দিয়েছেন। এর বাইরেও প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে অনেক গরু আক্রান্ত হয়েছে বলে খবর পেয়েছেন তারা। এখন পর্যন্ত তাদের চিকিৎসাধীন দুটি বাছুর এ রোগে মারা গেছে।

খামারিদের দাবি, এই ভাইরাসে উপজেলার অনেকের পশু আক্রান্ত হচ্ছে। যার প্রকৃত হিসাব উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কাছে পৌঁছাচ্ছে না। অন্যান্য উপজেলায়ও খামারসহ ব্যক্তি পর্যায়ে পালন করা গবাদি পশু আক্রান্ত হচ্ছে। অনেকে বাধ্য হয়ে এসব রোগাক্রান্ত গরু কসাইয়ের কাছে বিক্রি করছেন।

জেলা প্রাণিসম্পদ দফতর বলছে, কয়েক মাস ধরে এই ভাইরাসের ব্যাপকতা জেলার বিভিন্ন উপজেলার গবাদি পশু বিশেষ করে গরুর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। সুনির্দিষ্ট কোনও চিকিৎসা না থাকলেও প্রাণী চিকিৎসকরা বলছেন, এক ধরণের আরএনএ ভাইরাসের সংক্রমণে রোগটি হয়ে থাকে। আক্রান্ত পশুর চামড়া ফুলে গোটা গোটা সৃষ্টি হয়। পরে এসব গোটা ফেটে গিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ঘায়ের মতো হয়ে যায়, তারপর জ্বর আসে। এক সময় আক্রান্ত পশু অত্যন্ত দুর্বল হয়ে ওজন হ্রাস পায় এবং মারা যায়।

জেলা প্রাণিসম্পদ দফতরের তথ্য অনুযায়ী জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাসে এ পর্যন্ত সাড়ে তিন থেকে চার হাজার গরু আক্রান্ত হয়েছে। যার অধিকাংশই এখন সুস্থ। আক্রান্ত পশুর এক থেকে দুই শতাংশ মারা গেছে। তবে ভেটেরিনারি সার্জনরা বলছেন, আক্রান্ত পশুর মধ্যে বাছুরের মৃত্যু ঝুঁকি কিছুটা বেশি। রোগ প্রতিরোধে পশুকে মশা মাছি থেকে দূরে রাখতে মশারি ব্যবহারসহ পশুর বিচরণ স্থান পরিষ্কার রাখা এবং আক্রান্ত পশুকে অন্য পশু থেকে আলাদা রাখারও পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান জানান, এই রোগে আক্রান্ত পশুর সুনির্দিষ্ট কোনও চিকিৎসা এখনও পাওয়া যায়নি। সিন্ড্রোমেটিক ট্রিটমেন্ট (লক্ষণ দেখে চিকিৎসা) করেই আক্রান্ত পশু সুস্থ হয়ে উঠছে বলেও জানান তিনি।

ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, প্রথম দিকে এর চিকিৎসায় গোট টিস্যু ভেক্সিন প্রয়োগ করলেও তাতে খুব একটা ফল পাওয়া যায়নি। আক্রান্ত পশুর লক্ষণ অনুযায়ী বিভিন্ন মেডিসিন প্রয়োগ করে ইতিবাচক ফল পাওয়ার গেছে।’ তিনি জানান, আক্রান্ত পশুর রোগ লক্ষণ দেখে পেনিসিলিন, এন্টি হিস্টামিন, আইভার মেকটিন জাতীয় মেডিসিন এবং জ¦র হলে প্যারাসিটামল দেওয়া হচ্ছে।

আক্রান্ত পশুর ওজন কমে যাওয়াসহ চামড়ায় ক্ষত হওয়ায় ঈদের বাজারে এসব পশুর কাঙ্খিত দাম পাওয়া যাবে না বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন এই প্রাণি চিকিৎসক।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আব্দুল হাই সরকার বলেন, ‘দ্রæত ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাসের কারণে খামারিরা দুঃশ্চিন্তাগ্রস্থ হলেও এই রোগ এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এটি মূলত ট্রান্স বাউন্ডারি ডিজিস যা দেশে লাম্পি স্কিন ডিজিস হিসেবে ছড়িয়েছে। এটি সিজনাল রোগ যা প্রতিরোধে সীমান্ত পথে গরু অনুপ্রবেশ বন্ধ করা জরুরী।’ তবে কোনও পশু আক্রান্ত হলে বিলম্ব না করে প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে যোগাযোগেরও পরামর্শ দেন তিনি।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য