সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে কর্মরত নয় আফ্রিকান নারী করোনাভাইরাস লকডাউনের কারণে যখন চাকরি হারালেন, তখন নিয়োগকারী দালাল কয়েকটা পাতলা মাদুর দিয়ে তাদের একটি খালি ঘরে ঢুকিয়ে তালাবদ্ধ করে রেখেছিল।

এদের কেউ কেউ মার্চ থেকে সেখানে আছেন। একজন এখন ছয় মাসের গর্ভবতী হলেও কোনো যত্ন পাচ্ছেন না। আরেকজন মানসিকভাবে এমন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন যে নিজের কাপড় ছিঁড়ে ফেললে তাকে দেয়ালের সঙ্গে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।

ওই নারীরা বলছেন, তাদের দিনে একবার খাবার দেওয়া হয়। দেশে ফিরে যাওয়াতো দূরের কথা তারা সেখান থেকে কখন বের হতে পারবেন সেটাই জানেন না।

তাদের মধ্যে কেনিয়া থেকে আসা আপিসাকির সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে নিউ ইয়র্ক টাইমসের কথা হয়। তিনি বলেন, “আমরা সবাই আতঙ্কিত।এখানকার পরিবেশ মোটেই ভাল না। কেউ আমাদের আওয়াজ শুনতে পায় না।”

অনেক আরব দেশে পরিবারগুলি গাড়ি চালানো, ঘরদোর পরিষ্কার রাখা এবং শিশু ও প্রবীণ স্বজনদের যত্ন নেওয়ার জন্য এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে আসা লাখ লাখ প্রবাসী কর্মীর উপর নির্ভর করে। কিন্তু তাদেরকে স্বল্প বেতন দিয়ে এমন পরিস্থিতিতে রাখা হয়, মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলি যেটাকে দীর্ঘদিন ধরে ‘শোষণ ও নির্যাতনমূলক’ হিসেবে বর্ণনা করে আসছেন।

শ্রমিক অধিকারকর্মীরা বলছেন, এখন মহামারী ও তার কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দা তাদের বিপদকে বহুগুণে বাড়িয়ে তুলেছে। ভাইরাস বয়ে নিয়ে আসবে ভয়ে অনেক পরিবার গৃহকর্মীদের ঘর থেকে বের হতে দিচ্ছে না। লকডাউনের কারণে পুরো পরিবার ঘরে থাকায় গৃহকর্মীদের কাজও অনেক বেড়ে গেছে।

অনেক প্রবাসী শ্রমিককে বেতন না দিয়ে ছাঁটাই করা হয়েছে। স্বদেশ থেকে অনেক দূরে অসহায় অবস্থায় আটকা পড়ে আছেন তারা।

অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বেতন দিতে না পেরে লেবাননের বৈরুতে নিয়োগকর্তারা অনেক ইথিওপীয় নারীকে ফেরত পাঠাতে তাদের দেশের কনস্যুলেটের সামনে জড়ো করেছেন।

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের শ্রমিক অভিবাসন নিয়ে কর্মরত আবুধাবি ডায়ালগের এক গবেষণায় দেখা যায়, শুধু এই দেশগুলিতে ২০১৬ সালে প্রায় ৪০ লাখ অভিবাসী গৃহকর্মী ছিল, যাদের অর্ধেকেরও বেশি নারী। তবে এই সংখ্যা এখন অনেক বেড়েছে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) হিসাবে, লেবানন ও জর্ডানসহ অন্যান্য আরব অঞ্চলে যে পরিমাণ বিদেশি গৃহকর্মী ও আয়া কাজ করেন, তা বিশ্বের অন্য কোনও অঞ্চলের চেয়ে বেশি।

এদের বেশিরভাগ নিয়োগ দালালদের মাধ্যমে এবং বাধ্যতামূলক আবাসিকতাসহ স্পনসরশিপ ব্যবস্থার আওতায় হয় বলে তাদের উপর নিয়োগকর্তার ব্যাপক ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আবাসিকতা না হারিয়ে তা চাকরি ছাড়তে পারে না বা নতুন চাকরিতে চলে যেতে পারে বা নিয়োগকর্তার অনুমতি ছাড় দেশও ছাড়তে পারে না।

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, অনেক নিয়োগকর্তা শ্রমিকদের পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করেন এবং তাদের কোনো ছুটি দেন না। কেউ কেউ কর্মীদের মোবাইল ফোন বা ইন্টারনেট ব্যবহার করতে দেন না। এছাড়ার শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের ঘটনাতো খুবই সচরাচর।

মাইগ্রান্ট-রাইটস নামে একটি অধিকার গোষ্ঠীর সহযোগী সম্পাদক বানী সরস্বতী বলেন, লিঙ্গ, স্পন্সরশিপ ব্যবস্থা ও বিচ্ছিন্নতা মিলে নারী গৃহকর্মীদের পরিস্থিতি বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

“কেউ আপনার প্রতিটি নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করছে এবং সপ্তাহের সাত দিন ২৪ ঘণ্টাই তার বাড়িতে আছেন। তাহলে কল্পনা করুন, নিয়োগকর্তাদের কী পরিমাণ ক্ষমতা!”

কোভিড-১৯ মধ্য প্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ায় এবং বহু অভিবাসীর উপার্জনের জন্য অনিবার্য এসব দেশের অর্থনীতি সংকটে পড়ায় তাদের বিপদ বেড়েছে।

সরস্বতী বলেন, এমনকি চরম নির্যাতিত হয়েও সম্পূর্ণ গৃহহীন হওয়ার ভয়ে শ্রমিকরা তাদের নিয়োগকর্তাকে ছাড়তে দ্বিধা বোধ করেন।

কেনিয়ার একটি গৃহকর্মীদের সংগঠনের চেয়ারওম্যান রুথ খাকমে বলেন, সৌদি আরবে কয়েক ডজন কেনীয় নারী ‘পর্যাপ্ত খাবার ও বিশ্রাম না থাকা, সহিংসতা, এমনকি হুমকি, আটকে রাখা ও নজরদারির’ অভিযোগ করেছেন।

“আপনাকে আপনার ফোন ব্যবহার করতে দেওয়া হচ্ছে না। সুতরাং আপনি লড়াই করছেন, সম্পূর্ণ একা। আপনার কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।”

সংক্রমণের ভয় অনেক গৃহকর্মী ও নিয়োগকর্তাদের মধ্যে সম্পর্ক বিষিয়ে তুলেছে। নিয়োগকর্তারা অফিসে চলে যাওয়ার পর যেসব কর্মীরা কিছুটা বিরতি নিতে পারতেন তাদের এখন সারাদিন ঘড়ে আটকে পুরো পরিবারের সেবা করতে হচ্ছে। থাকার পরে পরিবেশন করতে হবে এবং পরিষ্কার করতে হবে। অনেক পরিবার কর্মীদের জীবাণুবাহক হিসেবে সন্দেহ করে।

ওমানে কর্মরত ৩৩ বছর বয়সী উগান্ডান জাস্টিন মুকিসা বলেন, মহামারীতে তার ১৮০ ডলারের মাসিক বেতন কেটে অর্ধেক করা হয়েছে। তার কাজের চাপ বেড়ে গেছে এবং নিয়োগকর্তাও বৈরী হয়ে উঠেছে।

“আমার নিয়োগকর্তা শুরু থেকেই বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল না। করোনাভাইরাসের আগে মাঝে মাঝে বাচ্চাদের সঙ্গে খেলতাম। এখন সেটা নিষিদ্ধ। নিয়োগকর্তা চান না যে তাদের খাবারের স্পর্শ করি বা তাদের কাছে বসি।”

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বেশ কয়েকটি দেশ সপ্তাহে একদিন ছুটি, বার্ষিক বা দ্বিবার্ষিক ছুটি ও চাকরির মেয়াদকালের উপর ভিত্তি করে অবসর সুবিধা দিয়ে গৃহশ্রম নিয়ে বিধি প্রণয়ন করেছে।

দিনের কর্মসময় কাতার ১০ ঘণ্টা, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত ১২ ঘণ্টা এবং সৌদি আরব ১৫ ঘণ্টায় বেঁধে দিয়েছে। গৃহকর্মীদের জন্য কুয়েতে মাসিক সর্বনিম্ন মজুরি ১৯৫ ডলার। সৌদি আরবের কেনিয়ানরা প্রতিমাসে কিছু সুবিধাসহ কমপক্ষে ৩৭৫ ডলার আয় করার কথা এবং ফিলিপিন্স তার নাগরিকদের জন্য বিশ্বজুড়ে ন্যূনতম মজুরি ৪০০ ডলারে নির্ধারণ করেছে।

করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে বাহরাইন, কুয়েত ও আরব আমিরাত আটকে পড়া অভিবাসীদের ভিসা নবায়ন সহজলভ্য করেছে, যাতে তাদের আবাসিকতার মেয়াদ শেষ হলেও জরিমানা গুণতে না হয় এবং আটক হতে না হয়। কোভিড-১৯ আক্রান্ত প্রবাসী কর্মীদের বিনামূল্যে চিকিত্সার ঘোষণা দিয়েছে কাতার ও সৌদি আরব।

তবে শ্রমিক অধিকারকর্মীরা বলছেন, যেসব বিধি প্রণয়ন করা হয়েছে সেগুলোর বাস্তবায়নে অনেক সময়েই ত্রুটি দেখা যায়। নিগ্রহের মুখোমুখি হলে রেহাই পাওয়ার তেমন সুযোগ থাকে না।

ব্রিটেনের শ্রমিক অধিকার সংগঠন ইকুইডেমের নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা কাদরী বলেন, “এই দেশগুলি ক্ষণস্থায়ী শ্রমের এই পদ্ধতি যেভাবে সিদ্ধ করেছে, সেটা দেশগুলিকে উচ্চ পর্যায়ের শোষণের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ”

যারা ভাইরাসে আক্রান্ত হন, তাদের নিয়োগকর্তারা সহজেই ছাঁটাই করতে পারেন। সৌদি আরবে ফিলিপিনো গৃহকর্মী হ্যানিকো কুইনল্ট দুই মাস আগে আক্রান্ত হলে তাকে একা ঘরে আটকে রেখে চিকিত্সার জন্য কেবলমাত্র ব্যথানাশক ট্যাবলেট ও ভিটামিন সি দেওয়া হয়।

বদ্ধ ঘর থেকে টেলিফোনে তিনি বলেন, “আমাকে খাবার ছুঁড়ে দেওয়া হয়। আমরাতো মানুষ, প্রাণী নয়।”

সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কর্মীদের মধ্যে এমন নারীরাও আছেন যারা স্বাচ্ছন্দ্যের প্রত্যাশায় নিয়োগকর্তাদের কাছ থেকে পালিয়েছেন বা দেশগুলোতে পর্যটন ভিসা নিয়ে ঢুকেছেন।

গত ফেব্রুয়ারিতে কাজের সন্ধানে পর্যটক ভিসা নিয়ে কেনিয়া থেকে দুবাই আসেন ২৫ বছরবয়সী কেল্লে জোকি। কিন্তু এসেই বুঝতে পারেন যে তিনি গর্ভবতী। এখন তিনি একটি জনাকীর্ণ ডরমিটরিতে ঘুমান। তার মাতৃত্বকালীন কোনো যত্ন নেই; ফিরে যাওয়ার জন্য ৪০০ ডলার বিমান ভাড়াও নেই।

ফোন সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, “আমি সাত মাসের গর্ভবতী; এখানে আমি আমার বাচ্চাকে কীভাবে রাখব? আমি আটকে গেছি। আমার সত্যিই সাহায্য দরকার।”

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে আরও আট নারীর সঙ্গে আটকে পড়া অ্যাপিসাকি আরও বিপদে পড়েছিলেন গত মাসে যখন কয়েকমাসের বেতন পরিশোধ না করে তাকে ছাঁটাই করা হয় এবং তাকে দালালের কাছে ফিরে যেতে হয়।

তাকে কাজ হারানো কেনিয়া ও উগান্ডার অন্যদের সঙ্গে আটকে রাখা হয়েছিল। কাজ দালাল তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়ায় এবং লকডাউনের কারণে তাদের বাড়ি ফেরার কোনও উপায় ছিল না।

আপিসাকি বলেন, তাদের যে একক ঘরে রাখা হয়েছে সেটার একটিমাত্র জানালা দিয়ে সে সূর্যের আলো আসত সম্প্রতি তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তারা সবাই মিলে একটি টয়লেট ব্যবহার করেন, সিংকে কাপর কাচেন। তারা একবেলা রান্না করেন ও দালালরা প্রতিদিন খাবার ছুড়ে দিয়ে যান।

তিনি বলেন, গর্ভবতী নারীটি কয়েক মাস ধরে কোনও ডাক্তারকে দেখায়নি। যে নারী নিজের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেছিল তিনি কয়েক সপ্তাহ ধরে টাইলসের উপর উলঙ্গ পড়েছিলেন। এখন তার হাতটি শেকল দিয়ে দেয়ালে বেঁধে রাখা হয়েছে।

কেনিয়ার নারীদের দেশের ফিরতে দেশীয় দালাল সহায়তা করার জন্য দায়বদ্ধ হলেও আপিসাকি ফোন করেও তাদের সাড়া পাচ্ছেন না বলে জানালেন।

গত সপ্তাহে রিয়াদে কেনীয় দূতাবাস নাইরোবিতে সম্ভাব্য প্রত্যাবাসন ফ্লাইট ঘোষণা করে। তবে শর্ত হিসেবে ভ্রমণকারীদের করোনাভাইরাসমুক্ত থাকা, ৫২৫ ডলারের টিকিট ও ফিরে গিয়ে আইসোলশনে থাকার প্রতিশ্রুতি চাওয়া হয়।

কিন্তু আপিসাকির পক্ষে পরীক্ষা করা বা ফ্লাইট ধরা- কোনোটাই সম্ভব না। কারণ তার তো ঘর থেকে মুক্ত হতে হবে। দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তিনি ব্যর্থ হয়েছে।

ওই নারীরা বলছেন, তাদের সৌদি দালাল আলমোহাইত রিক্রুটমেন্ট তাদের তাদের আটকে রেখেছে। কিন্তু নিউ ইয়র্ক টাইমস তাদের মন্তব্যের জন্য অনুরোধ জানারেও কোনো জবাব পায়নি।

ইমেইলে এক প্রশ্নের জবাবে সৌদি আরবের কেনিয়ার রাষ্ট্রদূত পিটার ওজেগো বলেন, নারীদের আটকে রাখার ‘গুরুতর অভিযোগ’ পেয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পেতে এবং আইনের ফাঁকফোকর বন্ধসহ আরও কোনও অন্তর্নিহিত কারণ থাকলে সেগুলো সমাধানে তিনি সৌদি সরকারের সঙ্গে কাজ করবেন।

বিদেশীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বের কথা তুলে ধরে আপিসাকির দূতাবাস কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছাতে না পারা নিয়ে সৌদি আরবকে প্রশ্নের মুখোমুখি করেন তিনি।

তিনি লিখেছেন, “আমাদের দিনের বেশিরভাগ সময়েই মূলত এ জাতীয় অভিযোগের সমাধানে ব্যয় হয়।”

রোববার নিউ ইয়র্ক টাইমসের পক্ষ থেকে আলমোহাইতে রিক্রুটমেন্টের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টার পরে আপিসাকি সৌদি আরবের বাইরের এক সহযোগীকে জানিয়েছেন, ওই গর্ভবতী নারীরসহ বেশ কয়েক জনকে মেডিকেল চেকআপ এবং কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল।

অ্যাপিসাকি বলেন, “তারা কোনও অধিকার না দিয়ে তারা এভাবে আটকে রাখতে পারে না। আমরা শরীরে রোদ পাই না, পা মেলার জায়গা পাই না; হাঁটার বা অনুশীলনেরও জায়গা নেই। ভাবলেই মাথা পাগল হয়ে যায়।”

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য