পুলিশ হেফাজতে যে কালো মানুষের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বব্যাপী বর্ণবাদবিরোধী প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে সেই জর্জ ফ্লয়েডের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে।

মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস রাজ্যের পেয়ারল্যান্ডের একটি কবরস্থানে পারিবারিকভাবে তাকে দাফন করা হয় বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

২৫ মে মিনেসোটা রাজ্যের মিনিয়াপোলিস শহরে পুলিশের নির্যাতনে ৪৬ বছর বয়সী ফ্লয়েডের মৃত্যু হয়। সামনে আসা বেশ কয়েকটি ভিডিওতে শ্বেতাঙ্গ এক পুলিশ কর্মকর্তাকে রাস্তায় উপুড় করে ফেলে রাখা হাতকড়া পরা ফ্লয়েডের ঘাড়ে হাঁটু তুলে দিয়ে প্রায় নয় মিনিট ধরে চেপে রাখতে দেখা যায়।

ভিডিওতে ফ্লয়েডকে নিশ্বাস নেয়ার জন্য হাঁসফাঁস করতে ও ‘মা মা’ বলে চিৎকার করতে দেখা যায়, একসময় গভীর আর্তনাদ করে বলতে শোনা যায়, “দয়া করেন, আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না’। এরপরই তিনি নিশ্চুপ হয়ে যান এবং তার নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায়।

এই ভিডিও সামনে আসার পর ঘটনার সঙ্গে জড়িত মিনিয়াপোলিস নগর পুলিশের চার কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়। এদের মধ্যে ফ্লয়েডের ঘাড়ে হাঁটু তুলে দেওয়া পুলিশ কর্মকর্তা ডেরেক শভিনের বিরুদ্ধে সেকেন্ড-ডিগ্রি মার্ডারের অভিযোগসহ কয়েকটি অভিযোগ আনা হয়েছে। বাকি তিন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফ্লয়েড হত্যায় ইন্ধন দেওয়া ও সহযোগিতা করার অভিযোগ আনা হয়েছে।

ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনার দিন রাত থেকেই মিনিয়াপোলিসজেুড়ে তীব্র প্রতিবাদ বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরদিন থেকে পুরো যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ব্যাপক বর্ণবাদ-বিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়, যার প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন বড় বড় শহরে ও প্রান্তে বর্ণবাদ-বিরোধী প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে।

ফ্লয়েডের বলা শেষ কথা ‘আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না’ বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার প্রতিবাদকারীর প্রধান শ্লোগানে পরিণত হয়েছে। করোনাভাইরাস মহামারীর হুমকিকে উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমে এসে তারা ফ্লয়েড হত্যার বিচার ও যুক্তরাষ্ট্রে সংখ্যালঘুদের ওপর পুলিশি নির্যাতন বন্ধের দাবি জানাচ্ছেন।

টেক্সাসের হিউস্টনের ফাউন্টেইন অব প্রেইস গির্জায় ফ্লয়েডের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়। ফ্লয়েডের পরিবারের সদস্যরা, পাদরীবর্গ ও রাজনীতিকরা এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন। চার ঘন্টা ধরে চলা এই শেষকৃত্য যুক্তরাষ্ট্রের সবগুলো প্রধান টেলিভিশন নেটওয়ার্ক সরাসরি সম্প্রচার করে।

অনুষ্ঠানে ফ্লয়েডের ভাইঝি ব্রুকলিন উইলিয়ামস বলেন, “আমি নিশ্বাস নিতে পারছি। যতক্ষণ আমার নিশ্বাস আছে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবেই। এটা শুধু একটা খুন না এটা ঘৃণাজনিত একটি অপরাধ।”

উইলিয়ামসহ শেষকৃত্যে যোগ দেওয়া ফ্লয়েডের আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সবার পরনে ছিল সাদা পোশাক।

অনুষ্ঠানে নাগরিক অধিকার আন্দোলনকারী রেভারেন্ড আল শার্পটন ফ্লয়েডকে হিউস্টনের একটি হাউজিং প্রজেক্টে বেড়ে ওঠা ‘একজন সাধারণ ভাই’ অভিহিত করে বলেন, মহৎ উত্তরাধিকার রেখে যাবেন সেই উদ্দেশ্যেই যেন ঈশ্বরের ইচ্ছায় খেলাধুলা, চাকরি সবকিছুতেই ফ্লয়েডে যা হতে চেয়েছেন তা থেকে তাকে বিরত রাখা হয়েছিল।

“ঈশ্বর সেই প্রত্যাখ্যাত পাথরটিকেই বেছে নিয়ে এমন এক আন্দোলনের স্তম্ভ করে তুললেন যা পুরো বিশ্বকে পরিবর্তন করে দিতে যাচ্ছে,” নিউ টেস্টামেন্ট থেকে বাইবেলের উপমা ধরা করে তিনি এমনটি বলেছেন বলে রয়টার্স জানিয়েছে।

শার্পটন জানান, আগামী ২৮ অগাস্ট ওয়াশিংটন ডিসিতে ১৯৬৩ সালে লিঙ্কন মেমোরিয়ালের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার র্কি জুনিয়রের দেওয়া ‘আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম’ বক্তৃতার ৫৭তম বার্ষিকী উদযাপিত হবে, সেদিন মিছিলের নেতৃত্বে থাকবে ফ্লয়েডের পরিবার।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য