ঘরে বন্দি হয়ে কেটে গিয়েছে মাস খানেকেরও বেশি সময়। আমরা বাড়ির কাজকর্ম, রান্নাবান্নার রুটিনে এতদিনে বেশ অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। প্রথমদিকে এতটা ছুটি একসঙ্গে পেয়ে দারুণ আনন্দ হয়েছিল, অনেকেই দুরন্ত সব পদ রেঁধেছেন, সেটা পোস্ট করেছেন সোশাল মিডিয়ায় — এবং তার মধ্যে দোষের খুব কিছু নেইও। এতটা অবসর পেয়ে গোড়ায় একটু ভালো থাকার চেষ্টা করাটা মোটেও অন্যায় নয়। কিন্তু এবার কয়েকটা বিষয় যুক্তি দিয়ে ভাবার সময় এসেছে।

বিশিষ্ট পালমোনোলজিস্ট ডা. সুস্মিতা রায় চৌধুরী পরিষ্কার বলেছেন, “লকডাউন উঠে গেলে কিন্তু রোগটা বাড়বে। ঠিক কতটা বাড়বে, সেটা এখন থেকে আন্দাজ করা সম্ভব নয়। যে মুহূর্তে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার শুরু হবে, অফিস কাছারি খুলবে, তখন রোগীর সংখ্যা বাড়তে বাধ্য।” তার চেয়েও বড়ো একটা আশঙ্কার কথা বলেছেন সাইকায়াট্রিস্ট ডা. অনিরুদ্ধ দেব, “আমরা ভারতীয়রা সোশাল ডিস্ট্যানসিং কথাটার অর্থই বুঝি না। আপাতত নেহাত ঠেকায় পড়ে সবাই বাড়িতে আছি তাই – লকডাউন উঠলে আর কেউ এত বাধা মানবেন বলে মনে তো হয় না।”

তার উপর বাড়িতে থেকে আমরা দেদার খেয়েছি, শুয়ে-বসে ছুটি কাটিয়েছি। চাকরি থাকবে কিনা এই চিন্তায় কপালে ভাঁজ ফেলে রাত জেগেছি। ফলে হরমোনের স্তরে বেজায় গন্ডগোল হয়েছে। বেড়েছে প্রেশার, সুগার, ওজন সবই। এই অবস্থায় যে কোনও রোগের আক্রমণ হওয়াটা সহজ। এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে আপনার রোজকার ডায়েট। খাবার আমাদের শক্তি জোগায়। তাই এমনভাবে খান যাতে শরীর সুস্থ থাকে, বাদ দিন ফ্যান্সি কেতা। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শরীর সুস্থ করুন। ডালগোনা কফি না খেলেও চলবে, তার চেয়ে অনেক কাজের গ্রিন টি-এর অ্যান্টিঅক্সিডান্ট। একান্ত তা হাতের কাছে না পেলে লিকার চা খান। এমনই আরও অনেক জরুরি পরামর্শ দিচ্ছেন কেপিসি হাসপাতালের ক্লিনিকাল ডায়েটেটিক্স বিভাগের প্রধান রঞ্জিনী দত্ত। আপনাদের সুবিধার্থে তা সহজ করে বুঝিয়ে দিচ্ছি আমরা।

এক, বাজার খোলা থাকছে, অহেতুক ভিড় জমাবেন না, রোজ বাজারে যাওয়ার দরকার নেইও। যাঁদের বয়স 20-35-এর মধ্যে, তাঁরা সাধারণত এই রোগের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিরোধ তৈরি করতে পারছেন, বাড়িতে তেমন কেউ থাকলে তাঁকে বাজারে পাঠান। সোশাল ডিস্ট্যানসিংয়ের নিয়ম মেনে চলুন। না হলে বাজার থেকেই বিপদ আসবে।

দুই, ফল আর সবজি দুটোই পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যাচ্ছে। ভাত, ডাল, তরকারি, ডিম, সোয়াবিন, কোনও কিছুরই অভাব নেই এখনও পর্যন্ত। তবে আনাজ বা ফল খুব ভালো করে ধোওয়া জরুরি। পারলে জলে সামান্য পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট বা ক্লোরিন মিশিয়ে আনাজ ধুয়ে নিন। ফল বা স্যালাড খেলে খোসা বাদ দিয়ে খাওয়াই ভালো। সবচেয়ে ভালো হয় যদি স্যালাড খাওয়াটা আপাতত স্থগিত রাখতে পারেন। রান্না করে নেওয়া খাবার যে জীবাণুমুক্ত, সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ হওয়া যায়।

তিন, হ্যাঁ, এ কথা ঠিক যে বাঙালির মাছ ছাড়া চলে না। আমাদের রোজের প্রোটিন ইনটেকের অনেকটাই আসে মাছ থেকে। কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও ঠিক যে সংক্রমণের আশঙ্কায় একের পর এক পাইকারি মাছ বাজার বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে বাজারে ক্রমশ তাজা মাছের জোগানও কমছে। খুব বড়ো যে সব বরফের মাছ মিলছে সেগুলি আসছে কোল্ড স্টোরেজ থেকে এবং এই পরিস্থিতিতে সেখানে স্বাস্থ্যবিধি মানা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। মনে রাখবেন, ঠান্ডায় রাখা মাছের শরীরেও কিন্তু কিছু মাইক্রোব্যাক্টেরিয়া জন্মায়। তা থেকে আবার নতুন বিপত্তি হতে পারে। চিকেন খাওয়া যায়, তবে এই সময় নাগাদ কিন্তু বার্ড ফ্লুয়ের প্রাদুর্ভাবও হয় প্রতি বছর। সেক্ষেত্রে তার জোগানেও টান পড়তে পারে। সেদিক থেকে ডিম অনেক নিরাপদ এবং তা খারাপ হলে বোঝা যায়।

চার, ভিটামিন সি খান। অর্থাৎ সব ধরনের লেবু জাতীয় ফল চলবে। অ্যান্টিঅক্সিডান্ট আপনাকে ভিতর থেকে সুস্থ রাখবে। সরষের তেলের ইরিউসিক অ্যাসিড খুব ভালো অ্যান্টিঅক্সিডান্ট। খেতে পারেন সরষে ও পোস্ত – এর ভিটামিন ইও শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডান্ট। রান্নায় ব্যবহার করুন টোম্যাটো, রসুন, জিরে, ধনে, আদা, হলুদ, দারচিনি – গোটা মশলা জলে ভিজিয়ে খেতে পারেন। সব মশলায় এসেনশিয়াল অয়েল থাকে, সেটা অত্যন্ত কার্যকর অ্যান্টিঅক্সিডান্ট।

আর একটা খুব জরুরি বিষয় – এর মধ্যেও অনেকে বাইরে থেকে অর্ডার করে খাবার খাচ্ছেন। সেটা কতটা নিরাপদ? হেলথ জংশন নিউট্রিশন সেন্টারের প্রধান ময়ঙ্কা সিঙ্ঘল বলছেন, “বাইরের খাবার এখন মোটেই নিরাপদ নয়। তা কোথায় তৈরি হচ্ছে, কীভাবে হচ্ছে, কে ডেলিভারি আনছেন, তার কিচ্ছু আপনি জানেন না। এই পরিস্থিতিতে রান্না করা খাবার খাওয়াটা একেবারেই নিরাপদ নয়। বাড়িতেই স্বাস্থ্যকর রান্না করে নেওয়ার পরামর্শই দেবো আমি।”

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য