দিনাজপুর সংবাদাতাঃ করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে ঘরবন্দি মানুষ বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে। এদিকে জমিতে ধান পাকা শুরু হলেও শ্রমিক সংকটের কারণে হাওড় অঞ্চলের কৃষকরা ধান ঘরে তুলতে পারছে না। শ্রমিক সংকট কাটিয়ে উঠতে এবং কৃষকদের ধান কাটার জন্য দিনাজপুর থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সরকারি বিধিবিধান মেনে শ্রমিক পাঠানো হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) দুপুর ১টায় জেলার খানসামা উপজেলা থেকে দিনাজপুর জেলা প্রশাসক ও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিপ্তরের সহযোগিতায় হাওড় অঞ্চলে ধান কাটতে ৫০ জনের একটি শ্রমিক দলকে সরকারি ও বিত্তবানদের সহযোগিতায় হাওড় এলাকায় পাঠানো হয়েছে। ধান কাটার কাজে যাওয়া এসব শ্রমিকদের জন্য ফ্রি বাস ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে পাঠানো হচ্ছে। দিনাজপুর থেকে রাজশাহী, সুনামগঞ্জ, নাটোর ইত্যাদি এলাকায় পর্যায়ক্রমে শ্রমিক পাঠানোর কাজ চলছে জেলা, উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ থেকে।

এই উদ্যোগে ব্যক্তি পর্যায়েও অনেকেই প্রশাসন ও কৃষি বিভাগকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার দিনাজপুরের খানসামা উপজেলা থেকে সুনামগঞ্জ জেলায় ৫০ জন ধান কাটা শ্রমিকের একটি দল যাচ্ছেন। তাদের বাসভাড়া ও রাস্তায় খাবার ব্যবস্থা করেছেন মাই ফ্রেশ ওয়াটার কোম্পানির এমডি মো. লিয়ন চৌধুরী। তিনি তাঁর ব্যক্তি উদ্যোগেই এই দুযোর্গকালীন সময়ে মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।

মাই ফ্রেশ ওয়াটার কোম্পানির এমডি লিয়ন চৌধুরী বলেন, ‘আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে এই দুর্যোগকালীন সময়ে মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছি। ইতোমধ্যে আমি আমার দিনাজপুর শহরের বাড়িটিকে হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণা করেছি। আমার নিজস্ব যে গাড়িটি (কার) আছে সেটাও রোগী পরিবহন সেবার জন্য দিচ্ছি। এছাড়াও মানুষকে ত্রাণ সহায়তা এবং হাওড় অঞ্চলে ধান কাটার জন্য শ্রমিকরা যাচ্ছেন তাদের বাসভাড়া ও খাবার ব্যবস্থা করেছি।’

এ বিষয়ে দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. তৌহিদুল ইকবাল বলেন, ‘কৃষি প্রধান এই দেশে কৃষকরা শ্রমিকের অভাবে ধান কাটতে পারবে না এটা হতে দেওয়া হবে না। সরাসরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও কৃষি মন্ত্রনালয় এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছেন। আমাদের সরকারি সহায়তার পাশাপাশি অনেক বিত্তবান মানুষরাও আমাদেরকে সহযোগিতা করছেন। আজকে (বৃহস্পতিবার) আমরা খানসামা থেকে সুনামগঞ্জে একটি শ্রমিক দল পাঠাচ্ছি, তাদের সবাইকে একটা করে তোয়ালা, মাস্ক, বিস্কুটের প্যাকেট দেওয়া হয়েছে। তাদের নিরাপত্তার জন্য আমরা সব জায়গায় কথা বলে রেখেছি।’

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. মাহমুদুল আলম বলেন, ‘এই সংকটময় সময় সরকারের পাশাপাশি সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা আজকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ধান কাটার জন্য শ্রমিক পাঠাচ্ছি। সবাইকে হ্যান্ডস্যানিটাইজার, গ্লোবস, সাবান, গামছা, বিস্কুট এবং সবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে সার্টিফিকেট প্রদান করে হাওড় অঞ্চলে পাঠাচ্ছি। এই প্রক্রিয়া চলমান থাকবে। আমরা প্রতিটি উপজেলা থেকে যেসব শ্রমিকরা ধান কাটতে যেতে ইচ্ছুক তাদেরকে যথাযথ নিয়মের মাধ্যমেই পাঠাব।’

নবাবগঞ্জঃ দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ থেকে ধান কাটা ও প্রক্রিয়াজাত করার লক্ষে ৩০জন শ্রমিক পাঠানো হলো নাটোরের হাওড় এলাকা সিংড়া উপজেলায়। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সকালে উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর ও নবাবগঞ্জ থানার সহযোগিতায় একটি ট্রাকে সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে তাদেরকে ঐ এলাকায় প্রেরন করা হয়।

এ সময় উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোছাঃ নাজমুন নাহার, উপজেলা কৃষি অফিসার মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান, থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) অশোক কুমার চৌহান, উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোঃ হালিমুর রহমান, উপজেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক মোঃ জিয়াউর রহমান মানিক প্রখুম উপস্থিত ছিলেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার শ্রমিকদের করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত সতর্কতা মুলক বিভিন্ন দিক নির্দেশনা প্রদান করেন।উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান- পুর্ব থেকেই উত্তর বঙ্গের কৃষি শ্রমিক হাওর এলাকায় গিয়ে ধান কাটার কাজ করে আসছিল। কিন্তু এবারে করোনা ভাইরাসের প্রভাবে শ্রমিক যেতে না পারায় হাওর এলাকায় বোরো ধান কাটা ও প্রক্রিয়াজাত করনে শ্রমিক সংকট দেখা দেয়ায় সরকারী নির্দেশনা অনুযায়ী ১ম দফায় বিশেষ ব্যবস্থপনায় উপজেলা থেকে ৩০ জন শ্রমিক নাটোরের সিংড়া উপজেলায় প্রেরন করা হয়েছে।

চিরিরবন্দরঃ সরকারি নির্দেশনায় দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলা থেকে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আগাম বোরো ধান কাটতে কৃষি শ্রমিক পাঠানোর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রথম ধাপে ৩১ জন ধান কাটার শ্রমিক পাঠানো হয়েছে। বৃহস্পিবার উপজেলা পরিষদ চত্বর হতে সরকারিভাবে আত্রাই ও নওগাঁ জেলার উদ্দেশ্যে যাত্রা করা ৩১ জন ধান কাটার শ্রমিকদের হাতে কৃষি বিভাগের প্রত্যয়নপত্র, উন্নতমানের ফেস মাস্ক, খাবার, জীবাণুনাশক স্প্রে ও প্রয়োজনীয় ওষুধসহ বিভিন্ন উপকরণ তুলে দেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার আয়েশা সিদ্দীকা।

এ সময় চিরিরবন্দর উপজেলা স্বাস্থ্য ও প.প. কর্মকর্তা ডাঃ আজমল হক কৃষি শ্রমিকদের সবাইকে স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শ প্রদান করেন। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বোরো ক্ষেতের পাকা ধান কাটতে শ্রমিক সংকট দেখা দেওয়ায় সরকারি নির্দেশে মোতাবেক উপজেলার বিভিন্ন এলাকার ধান কাটা শ্রমিককে বিশেষ ব্যবস্থায় প্রেরণের উদ্যোগ নিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও উপজেলা প্রশাসন। প্রতি বছর বোরো মৌসুমে ধান কাটা ও মাড়াইয়ের জন্য দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দর থেকে কৃষি শ্রমিকরা দেশের হাওড় ও দক্ষিণ অঞ্চলে আগাম বোরো ধান কাটতে বিভিন্ন জেলায় যায়। কিন্তু এবার মহামারি করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সরকারি বিধি নিষেধ ও লকডাউনের কারণে কেউ এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যেতে পারছেন না। এতে করে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আগাম বোরো ধান কাটা নিয়ে বিপাকে পড়েছে সেখানকার কৃষকরা।

এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীসহ কৃষি মন্ত্রণালয় নির্দেশনায় দিনাজপুর অঞ্চল হতে ধান কাটার শ্রমিক পাঠানোর বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়। উপজেলা নির্বাহী অফিসার আয়েশা সিদ্দীকা জানান, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে চিরিরবন্দর উপজেলা থেকে কৃষি বিভাগ ও পুলিশের সহযোগিতায় ধান কাটার শ্রমিক পাঠানো হবে। এরই প্রেক্ষিতে চিরিরবন্দর কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের ব্যবস্থাপনায় ও উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় প্রথম ধাপে উপজেলার আব্দুলপর ও আউলিয়াপুকুর ইউনিয়নের ৩১ জন শ্রমিককে একটি বাসে করে আত্রাই নওগাঁ জেলায় প্রেরণ করেছে। এ ব্যাপারে চিরিরবন্দর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ মাহমুদুল হাসান জানান, শ্রমিকরা যাতে করোনার সংক্রমণ থেকে নিরাপদে থাকে সে জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ওই এলাকার লোকজনের সাথে তাদের কেউ মেলামেশা করতে পারবে না।

সেখানকার প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তার মাধ্যমে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রত্যেক শ্রমিককে আলাদা করে থাকার ও খাবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শ্রমিকরা সেখান থেকে মাঠে গিয়ে ধান কাটার পর আবার নিজ নিজ কক্ষে ফিরে যাবেন। তিনি আরও জানান, ইতোমধ্যে এ অঞ্চল থেকে ৩’শ কৃষি শ্রমিকের তালিকা করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে তাদেরকে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলাতে ধান কাটতে পাঠানো হবে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য