আজিজুল ইসলাম বারী, লালমনিরহাট থেকেঃ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাস দুর্যোগের ছোবলে লালমনিরহাটের সবজি চাষিদের স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়েছে। দুর্ভিক্ষকে আলিঙ্গন করতে হাতছানি দিয়ে ডাকছে জেলার অর্থনীতির চাকা।

জানা গেছে, বুক ভরা স্বপ্ন নিয়ে গায়ের ঘাম পানি করে সবজি ক্ষেতে মাঠ ভরে তুলেছেন জেলার সবজি চাষিরা। সবজি চাষে জীবিকার চাকা সচল রেখেছেন জেলার হাজার হাজার কৃষক পরিবার। কেউ নিজের জমিতে কেউ বর্গা নিয়ে বিশাল এলাকা জুড়ে করেছেন বিভিন্ন জাতের সবজি বাগান। এসব সবজি ক্ষেতে শ্রম বিক্রির টাকায় সচল ছিল হাজারো দিনমজুরের সংসার। ভুমিহীন দিনমজুরও সবজি ক্ষেতের শ্রম বিক্রি করে ছেলে মেয়েদের উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন দেখেন। মুলত কৃষিপ্রধান এ জেলার অধিকাংশ মানুষ সবজি চাষাবাদে জড়িত। এক সময়ের দিনমজুরও সবজি চাষের মাধ্যমে স্বালম্বী করেছেন নিজেকে। হয়েছেন বাড়ি গাড়ির মালিক।

ভারতীয় সীমান্তবর্তি জেলা লালমনিরহাটের সবজি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে চলে যায় রাজধানীসহ সারাদেশের বড় বড় সবজি বাজারে। দিনভর ক্ষেতের সবজি সংগ্রহ করে প্রতিদিন রাতে ট্রাকে ট্রাকে সারাদেশের বাজারে যেতে এ অঞ্চলের সবজি। পরদিন ভোরে ঢাকা চট্রগ্রামসহ বিভিন্ন জেলার বড় বড় বাজারে বিক্রি হত এসব টাটকা সবজি। টাটকায় পৌছানোর জন্য সারা বছর এ জেলার সবজির চাহিদাও প্রচুর।

সারাদেশের চাহিদাকে বিবেচনায় রেখে চলতি মৌসুমেও বিভিন্ন জাতের সবজি চাষাবাদ করেছেন জেলার চাষিরা। বুকভরা স্বপ্নে সন্তানতুল্য প্রতিটি সবজি বাগান বড় করেন পরম যত্নে। চাষিদের মাঠ ভরে আছে, করলা, শসা, বেগুন, শীম, বরবটি,লাউ, টমেটো, গাজর, মিষ্টিকুমড়াসহ নানান সবজি ও শাকে। মৌসুমের শুরুতে দাম ভাল পেয়ে বেজায় খুশি হলেও তা স্থায়ী হয়নি। সুদুর চীনের সেই মহামারী মরনঘাতি করোনাভাইরাস এসে মুহুর্তেই চুরমার করেছে জেলার সবজি চাষিদের স্বপ্ন। ক্রেতার অভাবে মাঠেই নষ্ট হচ্ছে চাষিদের সবজি।

করোনা ভাইরাস সংক্রামন রোধে সরকার দেশকে অঘোষিত লকডাউন করেছেন। ফলে বড় বড় মোকামে সবজির চাহিদা ও ক্রেতা নেই। তাই ব্যবসায়ীরাও সবজি ক্রয় করতে চাষিদের মাঠে ভিরছেন না। স্থানীয় বাজারেও চাহিদার তুলনায় যোগান বেশি হওয়ায় মুল্য নেই বললেই চলে। ফলে মুনাফা তো দুরের কথা ক্ষেতের সবজি সংগ্রহ ও পরিবহন খরচও উঠছে না। তাই ক্ষেতেই পচে নষ্ট হচ্ছে চাষিদের লালিত স্বপ্ন।

জেলার সবজি এলাকাখ্যাত বড় কমলাবাড়ী উত্তরপাড়া এলাকার কৃষক হাবিবুর রহমান জানান, প্রতি বছরের মত লাভের আশায় এ বছর প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচে দেড় একর জমিতে বিভিন্ন জাতের সবজি চাষ করেন। সবজি বিক্রির শুরুতেই হঠাৎ করোনার ছোবলে লকডাউন হওয়ায় দরপতন ঘটেছে। এতে প্রতিমণ ১হাজার ৬শত টাকা দরের সবজি এখন বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮০ টাকায়। যা শ্রমিক খরচ আদায় হচ্ছে না। ফলে সবজির পরিচর্যা বন্ধ করেছেন তিনি। তবে করোনার এ দুর্যোগ মোকাবেলায় নেই কোন প্রস্তুতি। ফলে ফসলের লোকসানসহ পরিবারের খাদ্যাভাব নিয়ে বড্ড চিন্তিত এ চাষি।

দোলাপাড়া গ্রামের কৃষক নুরুল ইসলাম জানান, কিছু দিন আগেও ক্ষেতেই করলা বিক্রি করেছেন প্রতিমণ আড়াই/তিন হাজার টাকায়। এখন তা বিক্রি হচ্ছে মাত্র এক/দেড়শত টাকায়। করলা ক্ষেত থেকে সংগ্রহ করার শ্রমিক খরচও উঠছে না। অন্যের এক বিঘা জমি লিজ নিয়ে সবজি চাষ করে লোকসানের মুখে পড়েছেন তিনি। লিজের অর্থ ও পরিবারের খরচ যোগান নিয়ে বড্ড চিন্তায় রয়েছেন এ বর্গাচাষি।

সবজি ক্ষেতের দিনমজুর তরনী কান্ত, শামীম ও আব্দুল মজিদ জানান, সারা বছর দৈনিক তিন/সাড়ে তিনশত টাকা মজুরীতে সবজি ক্ষেতে কাজ করেন তারা। এখন সবজির দাম নেই, লোকসানের কারনে মালিক কাজে ডাকেন না এবং করোনার প্রভাবে সরকার বাহিরে না যাওয়া নির্দেশ দেয়ায় তারা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

সিংগিমারী গ্রামের সবজি চাষি আসাদুজ্জামান সাজু বলেন, চার বিঘা জমিতে চাষ করা দেশিজাতের বেগুন প্রথম দিকে ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করলেও এখন মাত্র দেড় থেকে দুই টাকা কেজিতে বিক্রি করতে হচ্ছে। সেটাও ক্রেতা নেই। ফলে মাঠেই পচে নষ্ট হচ্ছে। কেউ কেউ গরু ছাগলের জন্য ক্রয় করছেন। ক্রেতার অভাবে চলতি মৌসুমে কয়েক লাখ টাকার ক্ষতির আশংকা করছেন এ চাষি।

সরকারী আদিতমারী কলেজের অবসার প্রাপ্ত অর্থনীতি বিভাগের প্রধান আবু তাহের বলেন, ক্রেতা না থাকায় মাঠেই নষ্ট হচ্ছে চাষিদের ঘাম ঝড়া ফসল। চাষি সোনাখ্যাত সবজি’র বাজারে দরপতনের মন্দাপ্রভাব পড়ছে জেলার তথা দেশের অর্থনীতিতে। করোনা দুর্যোগ স্থায়ী হলে চাহিদা বৃদ্ধি পাবে তাই বর্তমান লোকসন হলেও স্বাস্থ্যবার্তা মেনে সবজি ক্ষেতের পরিচর্যার পরামর্শ দেন। একই সাথে এসব বর্গাচাষীদের প্রনোদনাসহ করোনা দুর্যোগ মোকাবেলায় তাদেরকে সহায়তা প্রদানে সরকারের প্রতি আহবান জানান তিনি।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য