বিশ্বজুড়ে কোভিড-১৯ এর তাণ্ডব শুরু হওয়ার পর প্রাণঘাতী এ রোগে একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু দেখেছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক ও লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্য।

শুক্রবার উত্তরপূর্ব ও দক্ষিণপূর্বের এ দুটি অঙ্গরাজ্যে ৬০০র বেশি মানুষ করোনাভাইরাসে প্রাণ হারিয়েছেন বলে মার্কিন গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে মৃতের সংখ্যা ৭ হাজার ১০০ পেরিয়ে গেছে। আক্রান্ত পৌঁছেছে পৌনে তিন লাখে।

জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বরাত দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় রাত ৮টা থেকে শুক্রবার রাত ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টাতেই যুক্তরাষ্ট্রে এক হাজার ১৬১ জনের মৃত্যু হয়েছে; আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে ৩২ হাজার ১৩৩ জন।

বিপুল পরিমাণ আক্রান্তের চিকিৎসা করতে গিয়ে হাসপাতালগুলোকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। রোগীর চাপে নিউ ইয়র্ক সিটি ও নিউ অরলিয়ন্সের মতো বিস্তৃত স্বাস্থ্যসেবা সম্বলিত শহরগুলোর স্বাস্থ্য কাঠামোও ভেঙে পড়তে বসেছে, বলছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর, শহরগুলোর মেয়র ও চিকিৎসকরা কোভিড-১৯ মোকাবেলায় সামনের কাতারে থাকা প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সুরক্ষা উপকরণের জন্য কয়েক সপ্তাহ ধরেই তাগাদা দিয়ে যাচ্ছেন; গুরুতর অসুস্থদের জন্য ভেন্টিলেটরের ঘাটতির কথাও বারবার বলছেন তারা।

কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে থাকা এসব উপকরণের মজুদ প্রায় শেষ হয়ে আসায়, অঙ্গরাজ্যগুলো এখন বিভিন্ন উৎস থেকে চড়া দামে এগুলো কিনতে একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মোট মৃত্যুর এক-চতুর্থাংশই নিউ ইয়র্ক শহরের। শহরটির মেয়র বিল ডি ব্লাসিয়ো বলেছেন, ভাইরাসের ছোবলের সবচেয়ে ভয়াবহ দিনগুলো এখনও সামনে বলে আশঙ্কা তার।

“সময়ের সঙ্গে দৌড়াতে হচ্ছে আমাদের,” সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি এমনটাই বলেছেন। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সেনাবাহিনীকে কাজে লাগাতেও ফের অনুরোধ করেছেন তিনি।

“আমরা এমন এক শত্রুর সঙ্গে লড়ছি যে হাজারো মার্কিনিকে মেরে ফেলছে, অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, যাদের মারা যাওয়ার দরকার ছিল না,” বলেছেন তিনি।

নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে মোট মৃতের সংখ্যা ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলায় মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে বলেও মার্কিন গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।

বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫৯ হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কমিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব নাগরিকই এখন ‘ঘরবন্দি’ নির্দেশনার আওতায়; প্রয়োজনীয় কেনাকাটা এবং চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করা ছাড়া আর কোনো অজুহাতেই ঘর থেকে বের হওয়ার সুযোগ নেই তাদের। তবে ঘর থেকে বের হলে মাস্ক পরা লাগবে কিনা, তা নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের বারবার অবস্থান বদলও তাদের বিপাকে ফেলেছে।

শুক্রবার হোয়াইট হাউসের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে ট্রাম্প বলেছেন, স্বাস্থ্য বিভাগ নাগরিকদের কাপড়ের মাস্ক পরার পরামর্শ দিলেও এটি পুরোপুরিই ঐচ্ছিক।

“কেউ চাইলে পরতে পারে, নাও পারে। আমি না পরার সিদ্ধান্ত নিয়েছি,” বলেছেন তিনি।

দেশটির অন্যান্য অঙ্গরাজ্যে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়লেও করোনাভাইরাস নিউ ইয়র্কজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। উত্তরপূর্ব এ রাজ্যটির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক জানান, হাসপাতাল শয্যার অভাবে তারা গুরুতর সব রোগীকেও চিকিৎসা সেবা দিতে পারছেন না।

“এরকমটা আগে কখনোই দেখিনি আমি। উন্নত বিশ্বে এমনটা হয় শুনিওনি,” বলেছেন তিনি।

শুক্রবার লুইজিয়ানায় মৃতের সংখ্যা আগের দিনের চেয়ে ২০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার পর গভর্নর জন বেল এডওয়ার্ড বাসিন্দাদের ঘরবন্দি থাকার নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলতে অনুরোধ জানিয়েছেন। দক্ষিণপূর্ব এ অঙ্গরাজ্যটিতে আক্রান্তের সংখ্যাও ১০ হাজার পেরিয়ে গেছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, সংক্রমণের বিস্তার রোধে মৃতপ্রায় রোগীদের কাছে স্বজনদের যাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় অনেককেই মৃত্যুর আগের কষ্টকর কয়েক ঘণ্টা একাকি কাটাতে হচ্ছে।

রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাওয়া নিউ ইয়র্কের হাসপাতালগুলোর বাইরে টাঙানো হয়েছে তাঁবু।

“সেসব তাঁবুতে আমি নিদারুণ কষ্ট, একাকিত্ব আর মৃত্যু দেখেছি। মানুষ একাকি অবস্থায় মারা যাচ্ছে,” টুইটারে বলেছেন নিউ ইয়র্কের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের গ্লোবাল হেলথ ইন ইমার্জেন্সি মেডিসিনের পরিচালক ড. ক্রেইগ স্পেনসার।

নিউ জার্সির গভর্নর ফিল মারফি করোনাভাইরাসজনিত জরুরি অবস্থা যতদিন থাকবে ততদিন সব পতাকা অর্ধনমিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ শুরুর পর প্রথম কোনো অঙ্গরাজ্য এমন পদক্ষেপ নিল।

উত্তরপূর্বের এ রাজ্যটিও করোনাভাইরাসের আঘাতে বিপর্যস্ত। শুক্রবার পর্যন্ত সেখানে ২৯ হাজার ৮৯৫ জন কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়েছে। মৃতের সংখ্যাও ৬০০ পেরিয়ে গেছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য