ইতালিতে করোনাভাইরাসে একদিনে রেকর্ড ৯১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে ইতালিতে করোনাভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯,১৩৪ জনে।

ইউরোপের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ দেশ ইতালিতে প্রায় সবকিছু বন্ধ রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে মানুষকে ঘরে থাকতে বলা হয়েছে।

শুক্রবার ইতালির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল যে চলাফেরা এবং স্বাভাবিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা তেশরা এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেড্রোস ঘেব্রেয়েসাস কিছুদিন আগে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা উপকরণের ‘বৈশ্বিক ঘাটতি’ দেখা দিতে পারে।

যা হবে জীবন বাঁচানোর সক্ষমতার ক্ষেত্রে ‘সবচেয়ে ভয়াবহ হুমকি’গুলোর একটি।

ইতালির উত্তরাঞ্চলীয় এলাকা লোমবার্দিতে, যেটি দেশটির সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা, এই লোমবার্দিতে কোভিড-১৯ এ মৃত্যুর সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়েছে।

যদিও বৃহস্পতিবার মৃত্যুর সংখ্যা আগেরদিনের চেয়ে কমে যাওয়ায় আশা করা হচ্ছিল যে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আসা শুরু হয়েছে।

ইতালিতে নতুন করে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে ৫,৯৫৯ জনের মধ্যে।

দেশটির অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দক্ষিণাঞ্চলীয় এলাকায় ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় আশঙ্কা আরও বাড়ছে।

নেপলসের কাছের বৃহস্পতিবার ক্যাম্পানিয়া অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট ভিনসেনজো ডে লুকা বলেন কেন্দ্রীয় সরকার ভেন্টিলেটরসহ গুরুত্বপূর্ণ জীবন রক্ষাকারী উপাদান সরবরাহ করার আশ্বাস দিলেও তারা এখনও তা দেয়নি।

তিনি জানান, “দক্ষিণাঞ্চলের পরিস্থিতি লোমবার্দির মত হতে পারে বলে এই মুহূর্তে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।”

সেদিনই ইতালির প্রেসিডেন্ট গুইসেপ্পে কন্টে মন্তব্য করেন যে, পুরো ইউরোপই অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে দিয়ে যেতে পারে।

দ্বিতীয় দফায় ইতালির অর্থনীতিতে আড়াই হাজার কোটি ইউরো তহবিল ঘোষণা করেন তিনি।

ইতালির পরিস্থিতি এখন এমন হয়েছে যে, প্রতিদিনই যেন একটি গ্রামের লোকসংখ্যার সমান মানুষ মারা যাচ্ছে সেখানে।

গত ২৪ ঘন্টায় শুধু লোমবার্দি অঞ্চলেই ৫৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে আশার আলো দেখা প্রায় অসম্ভব হলেও ইতালির গত কয়েকদিনের সংক্রমণের হার কিছুটা হলেও আশাবাদী করছে দেশের মানুষকে। গত কয়েকদিন ধরে সংক্রমণের হার কিছুটা কমের দিকে।

কিন্তু দু্ই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে পুরো দেশ লকডাউন পরিস্থিতিতে থাকায় সব ধরণের কাজই হচ্ছে ধীরগতিতে।

প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৪৬ জন চিকিৎসক মারা গেছেন।

দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে অবরুদ্ধ পরিস্থিতি আরো দীর্ঘ সময়ের জন্য কার্যকর করা প্রয়োজন – প্রয়োজনে কয়েক মাসব্যাপী।

তবে এ ধরণের পদক্ষেপের ফলে শুধু ইতালিতেই উদ্বেগ বাড়বে না, বিশ্বের অন্যান্য দেশে, যেখানে ইতালির মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে ভাইরাস প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করার জন্য, সেসব দেশেও মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হবে। অবরুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকায় হুমকির মুখে পড়েছে ইতালির অর্থনীতি।

ভাইরাস ছড়ানোর মাত্রা ও লকডাউনের দিক থেকে হিসেব করলে ইতালি বাকি ইউরোপের চেয়ে এক বা দুই সপ্তাহ এগিয়ে রয়েছে। অর্থাৎ আগামী কিছুদিনের মধ্যেই ইউরোপের অন্যান্য দেশেও একই ধরণের পরিস্থিতি ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কাজেই ইতালিতে কী ধরণের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে বাকি ইউরোপ।

পশ্চিমা দেশের নেতাদের মধ্যে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনই প্রথম করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়েছেন বলে এখন পর্যন্ত জানা যাচ্ছে।

তিনি জানিয়েছেন তার মধ্যে ‘মৃদু উপসর্গ’ দেখা গেছে এবং তিনি নিজেকে ডাউনিং স্ট্রিটে সেল্ফ আইসোলেট বা বিচ্ছিন্ন করে রেখেছেন।

তবে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ‘ভাইরাস মোকাবেলা করার লক্ষ্যে সরকারে কার্যক্রমের নেতৃত্ব’ দেবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

ইতালির পর ইউরোপের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ দেশ স্পেনে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লেও নতুন সংক্রমণের সংখ্যা স্থিতিশীল হয়ে আসছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া মানুষের হার আগের দিনের চেয়ে বেড়েছে ১৪%, যেই সংখ্যাটি বৃহস্পতিবার ছিল ১৮%।

২৪ ঘন্টায় স্পেনে মারা গেছে ৭৬৯ জন, যা দৈনিক মৃত্যুর হিসেবে রেকর্ড। এ পর্যন্ত মোট মারা গেছে ৪,৮৫৮ জন। স্পেনের সরকার জরুরি অবস্থা ১২ই এপ্রিল পর্যন্ত বাড়িয়েছে।

মানুষের চলাফেরার ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে এবং দোকানপাট, ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ রয়েছে।

শুক্রবার ফ্রান্স সরকার জানায়, আগের ২৪ ঘন্টায় তাদের দেশে ২৯৯ জন মারা গেছে – যা আগের দিনের দৈনিক পরিসংখ্যানের হিসেবে কম।

এ নিয়ে ফ্রান্সে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ালো ১,৯৯৫ জনে। প্রায় ৩৩ হাজার মানুষের মধ্যে ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।

শুক্রবার ফরাসী প্রধানমন্ত্রী এডুয়ার্ড ফিলিপ জানান মানুষকে ১৫ই এপ্রিল পর্যন্ত ঘরে থাকতে হবে।

এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সংখ্যক কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। শুক্রবার জানানো হয় যুক্তরাষ্ট্রে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়েছে। সারাদেশে এখন পর্যন্ত মারা গেছে প্রায় ১,৩০০ মানুষ।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন কেন্দ্রীয়ভাবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশনা প্রকাশ করার পরিকল্পনা করছে তার দল, যেখানে কয়েকটি রাজ্যে অবরুদ্ধ থাকার আদেশ শিথিল করা হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্র নিউ ইয়র্ক শহর। তবে নিউ অরলিন্স, শিকাগো ও ডেট্রয়েটে দ্রুত এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে বলে সেসব অঞ্চলের মেয়র জানিয়েছেন।

চীনের ভিসা বা চীনে থাকার অনুমতি থাকলেও বিদেশ থেকে আসার ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে চীন। চীনে এখন পর্যন্ত ৩,২৯২ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং দেশে মোট ৮১,৩৪০ জনের মধ্যে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। চীনে গত কিছুদিন নতুন করে করোনাভাইরাস আক্রান্তদের অধিকাংশই বিদেশ থেকে এসেছেন।

জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী সারাবিশ্বে ৫ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষের মধ্যে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে এবং ২৪ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন। প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার মানুষ সুস্থও হয়েছেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য