দিনাজপুর সংবাদাতাঃ সরকারি নির্দেশনা নির্দেশনা অনুযায়ী স্বাস্থ্যবিভাগের সবার ছুটি বাতিল করা হলেও কর্মস্থলে পাওয়া যায়নি দিনাজপুরের আব্দুর রহিম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বেশিরভাগ চিকিৎসককে। গতকাল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, বায়োমেট্রিক পদ্ধতি ও কাগজে হাজিরার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে হাজিরা ব্যবস্থাপনায় হাসপাতালে উপস্থিতি দেখানো হলেও অধিকাংশ চিকিৎসককেই কর্মস্থলে পাওয়া যায়নি। তাদের কক্ষগুলোও ছিল তালাবদ্ধ। এ বিষয়ে তথ্য নিতে গিয়ে লাঞ্ছিত হয়েছেন কয়েকজন সংবাদকর্মী।

এ দিন দুপুর ১২টার দিকে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. নির্মল চন্দ্র দাসের কক্ষে যাওয়া হলে জানা যায় তিনি ছুটিতে ঢাকায় রয়েছেন। এ সময় কথা হয় হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) নজমুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, ব্যক্তিগত কারণে হাসপাতালের পরিচালক ডা. নির্মল চন্দ্র দাসহ তিন জন চিকিৎসক ছুটিতে রয়েছেন। কর্মরত ৭১ জন চিকিৎসকের মধ্যে বাকিরা কর্মস্থলেই রয়েছেন।

চিকিৎসকরা বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে হাজিরা দিয়ে হাসপাতালে প্রবেশ করেন, পাশাপাশি কাগজেও তাদের হাজিরা নিশ্চিত করতে হয় বলে জানান তিনি। এসময় সকাল ৯টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত চিকিৎসকরা তাদের কর্মস্থলে থাকেন বলে দাবি করেন নজমুল ইসলাম।

পরে সহকারী পরিচালকের অনুমতি নিয়ে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে যান সংবাদকর্মীরা। দুপুর দেড়টার দিকে হাসপাতালের পুরুষ সার্জারি ওয়ার্ডে যাওয়া হলে সেখানে দেখা যায়, বিভাগের সামনে চিকিৎসকদের তালিকা টানানো রয়েছে যেখানে উল্লেখ রয়েছে, তিন ইউনিটে ১৬ জন রয়েছেন। তবে বাস্তব চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। হাসপাতালের ওই ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায় সেখানে চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র তিন জন, বাকিদের কক্ষ বাইরে থেকে তালাবদ্ধ। ওয়ার্ডের অন্য কোথাও তাদেরকে পাওয়া যায়নি। অথচ নিয়ম অনুযায়ী তাদের হাসপাতালের ওয়ার্ডেই থাকার কথা।

একইভাবে সাড়ে ১২টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত অর্থোসার্জারি ওয়ার্ডে ১৭ জন, নাক-কান-গলা ওয়ার্ডে ২ জন, চক্ষু বিভাগে ৪ জন এবং মেডিসিন ওয়ার্ডে তিন ইউনিটে ১৭ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও চিকিৎসক আছেন মাত্র ২ জন। চিত্রটি এমন ছিল যেন তিন জন চিকিৎসক ছুটিতে থাকলেও ছুটিতে রয়েছেন হাসপাতালের অধিকাংশ চিকিৎসকই। আর যারা চিকিৎসা দিচ্ছেন তাদের অধিকাংশই ইন্টার্ন চিকিৎসক। শুধু তাই নয়, হাসপাতাল থেকে রোগীদের বাধ্যতামূলক ছাড়পত্র দেওয়ারও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

হাসপাতালের নাক-কান ও গলা ওয়ার্ডের নার্স প্রতিভা দেবীর সঙ্গে কথা হলে তিনি প্রথমে তথ্য দিতে চাননি। এক পর্যায়ে বলেন, স্যারেরা রাউন্ড দিয়ে চলে গেছেন। তারা কোথায় আছেন, জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, এই তথ্য তার জানা নেই এবং এসব তথ্য দেওয়া যাবে না।

সদর উপজেলার খোদমাধবপুর মিস্ত্রিপাড়ার এলাকার লিটন হোসেন আকাশ বলেন, গত ১৭ মার্চ আমার বাবা আব্দুল জলিল (৪৮) মেডিসিন ওয়ার্ডের সাদা ইউনিটে ভর্তি হন। কিডনি জনিত সমস্যার মধ্যে আরও কয়েকদিন হাসপাতালে থাকার কথা এবং স্যালাইন দেওয়ার কথা থাকলেও শনিবার সকালে ছাড়পত্র দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বলে দেন, ‘বাড়িতে গিয়ে স্যালাইন দিয়েন।’

এদিকে সংবাদকর্মীরা সংবাদ সংগ্রহের কাজ করার সময় দুপুর সোয়া ২টার দিকে হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় একজন সাংবাদিককে হাসপাতালের ছবি তুলতে নিষেধ করেন হাসপাতালে কর্তব্যরত এক পুলিশ কর্মকর্তা। এসময় ওই পুলিশ কর্মকর্তা সংবাদকর্মীদের গায়ে হাত দেন। পরে অন্য সাংবাদিকরা সেখানে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন।

পুলিশ কর্মকর্তা জানায়, হাসপাতালের চিকিৎসকদের নির্দেশে সাংবাদিকদের বাধা দিচ্ছেন বলে জানান। সেখানে কর্মরত সাংবাদিকদের মধ্যে ছিলেন বাংলা ট্রিবিউনের দিনাজপুর প্রতিনিধি বিপুল সরকার সানি, দৈনিক কালেরকণ্ঠের এমদাদুল হক মিলন, প্রথম আলোর রাজিউল ইসলাম, দেশ রুপান্তরের এমএ মোমেন, খোলা কাগজের সুলতান মাহমুদ, চ্যানেল আই’র ক্যামেরাপার্সন আরমান হোসেন বরকত, যমুনা টিভির প্রতিনিধির সহকারী মোস্তফা কামাল, আরিফুল ইসলাম।

পরে ওই পুলিশ কর্মকর্তাহ সাংবাদিকরা সহকারী পরিচালক ডা. নজমুল ইসলামের কক্ষে গেলে সেখানে উপস্থিত চিকিৎসকরা সংবাদকর্মীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন।

ওই কক্ষেই উপস্থিত বিএমএ’র সভাপতি ডা. ওয়ারেস আলী সরকার বলেন, বর্তমানে দেশ একটা ক্রাইসিসের মধ্যে যাচ্ছে। এমন কোনও সংবাদ যেন না হয়, যাতে সবাই বিব্রত হই। কিন্তু সংবাদকর্মীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেবেন, তা তিনি কিছুই জানাননি।

পরে ডা. নজমুল ইসলাম বলেন, আমি হাসপাতালের অন্যান্য ইউনিটে সংবাদকর্মীদের যাওয়ার অনুমতি দেইনি। তবে পুলিশ দিয়ে সাংবাদিকদের বাধা প্রদান ও ডেকে নেওয়াসহ লাঞ্ছিতের বিষয়ে তিনি কোনও মন্তব্য করেননি।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য