আমাদের একজন সহকর্মী কুড়িগ্রাম জেলার সাংবাদিক আরিফুলকে রাতের অন্ধকারে তার বাড়ী থেকে তুলে ডিসি অফিসে নিয়ে গিয়ে মধ্যযুগীয় শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে, তারপর তাকে মাদক দ্রব্যের মিথ্যা মামলায় ফাসিয়ে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। কারনটা ছিল সে তার জেলার সুযোগ্য জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে পত্রিকায় রিপোর্ট করেছিল। সে কারনে প্রশাসন তার উপর এই অন্যায় ভাবে মধ্যযুগীয় বর্বরতা চালায়। কারন সে তাদের সাথে হাতে হাত মেলায় নি। সে একজন সাংবাদিক।

সাংবাদিকতা দেশের নিকৃষ্ট পেশা, মানুষ সুইপার, মুচির, সুদ খোর, বাটপারের সাথে কথা বলবে কিন্তু যদি কেউ কারো সাংবাদিক পরিচয় পায় তাহলেই হয়েছে। সে যেন সিরিয়াল কিলার অথবা রেপিস্ট কিংবা ডাকাতের চেয়ে খারাপ কিছু ভাবে মানুষ তাকে এডিয়ে চলে যাবে। আসলে গেজেটেট কর্মকর্তা, আমলা, নেতা নেত্রীসহ দেশের মহা মহা উচ্চ শিক্ষিত ক্ষমতাবান মানুষ নিজেদের দোষ ঢাকতে সাংবাদিকদের পরিচয় জনসাধারনের কাছে খারাপ করে রেখেছে নিজেদের স্বার্থে। কারন সাংবাদিকরা মুখোশ খুলে তাদের আসল চেহারা জনগনের সামনে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে।

আমাদের এমনই আমলাতন্তিক প্রজাতন্ত্র, যেখানে একজন প্রথম শ্রেনীর গেজেট ভুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ বা মামলা করতে, বিভাগীয় কমিশনার বা মন্ত্রনালয়ের অনুমতি লাগে। যা কোন সাধারন মানুষের পক্ষে সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। এদেরকে এমন ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যে তারা নিজেদের আইনের উর্ধে ভাবতে শুরু করেছে। আজ টিভি ক্যামেনার সামনে ব্যারিস্টার সুমন একটা সত্যি কথা বলে ফেলেছেন, “কিছু কিছু ডিসির আচরণ মোগল সম্রাটদের মতো”। শুধু একটা জায়গায় তিনি যে ভুলটা করেছেন, তার বক্তব্য থেকে সেই “কিছু কিছু” শব্দটা বাদ দেওয়া অনুরোধ জানাচ্ছি।

আমরা যারা ছোট ছোট জেলা শহরে গুলোতে মানুষ হয়েছি, তারা মোটামোটি জেলার এসব শীর্ষ কর্মকর্তাদের আয়েশী জীবন, রাজকীয় চলন ফিরন, ঢংঢাং, সিকিউরিটি, রাজকীয় বিলাশি বহুল গাড়ী, বিলাশ বহুল বাংলো বাড়ি সম্পর্কে সুন্দর ধারনা রাখি। কোন সাধারন মানুষের পক্ষে অত্যন্ত প্রয়োজনেও উনাদের সাক্ষাত পাওয়া সম্ভব হয় না, এখানে নেতা কর্মীদের ব্যপারটা আলাদা। উনারা মানুষ নয় যেন এক একজন এক এক জেলার দেবতার আসনে অধিষ্ঠিত। আর তাদের আশেপাশে যারা ঘুরে বেড়ায় তাদের অনুগত, তারা হচ্ছে পুরোহিত। দেবতা তুষ্টিসম্পাদনে অনর্গল মন্ত্রপাঠ চলছে।

একজন জেলা প্রশাসক মানে সে সেই জেলার রাজা। আর রাজা টাজাদের ব্যাপারস্যাপার যেমন আলাদা ছিল, এদের জীবন যাত্রাও সেরকম। তারা এখনও বৃটিশ আমলের ধারা ধরে রেখেছে। কথাবার্তায় দাম্ভিকতা এবং পোশাক পরিচ্ছদে তারা সাধারন মানুষের চেয়ে যে বড় কিছু তা স্পষ্ট। আজ ম্যাজিস্ট্রেট, কাল জেলা প্রশাসক, তারপর সচিবালয়ের চেয়ারে মানে একদম ধরা ছোয়ার বাহিরে। রাষ্ট্রের সর্বচ্চ সুযোগ সুবিধা পাওয়ার এই মানুষ গুলো নিজেদের আর সাধারন ভাবতে পারে না। তারা ভুলে যায় যে তারা প্রজাতন্ত্রর চাকর মাত্র। তাদেরও জবাদ দিতে হবে রাষ্ট্রর কাছে, রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে।

সেই জেলা প্রশাসকে অপসরন মানে কোন সুনির্দিষ্ট সমাধান নয়, দেশে চাই আমলাতন্ত্রের সমাপ্তি। দরকার সাংবাদিক নয় মানুষ হিসেবে আরিফুল ইসলামের উপর মধ্যযুগীয় বর্বরতার দৃষ্টান্ত মুলক বিচার। কারন আমরা সাংবাদিকরা তো সাধারন মানুষের চেয়ে তুচ্ছ এবং নিকৃষ্ট, আমাদের কি আর বিচার চাওয়ার বা পাওয়ার অধিকার আছে। এই দেশে দুই একটা সাংবাদিক সাগর রুনির মত খুন বা গুম হয়ে গেলে কারও তেমন কিছু যায় আসবে না। আরিফুল ইসলাম যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে তার কর্মস্থলে ফিরে যায়, দোয়া কামনা রইলো। কলম ও সাংবাদিকতার জয় হোক।
১৪/০৩/২০২০
– আজাদ জয়
সম্পাদক দিনাজপুরনিউজ

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য