মেডিকেলে ভর্তি হওয়া প্রবল প্রসববেদনায় ছটফটরত এক প্রসূতি মায়ের সন্তান জন্ম হলো লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে ভ্যানের উপর। সন্তান জন্মের সময় সহযোগিতা না করে উল্টো ক্লিনিকে নিয়ে সিজার করার জন্য চাপ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে নার্সদের বিরুদ্ধে।

গত রাত সাড়ে ১২টার দিকে ওই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনেই এ ঘটনাটি ঘটে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে দায়ী নার্সদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত বলে সচেতন মহলের দাবী।

জানা গেছে, উপজেলার পুর্ব বিছনদই এলাকার দিনমজুর রুহুল আমিনের গর্ভবতী মেয়ে মনিফা বেগমের (২২) সন্ধ্যার পর থেকে প্রসববেদননা শুরু হয়। পরে রাত ১০টার দিকে ভ্যানযোগে হাতীবান্ধা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এনে ভর্তি করান মনিফার ছোট ভাই রাকিব (১৫)। যার ভর্তি রেজি নং ৩৩৫৬/৫০ ও ওয়ার্ডে ভর্তি রেজি-১৪২৩। কিন্তু মেডিকেলে ভর্তির পর থেকে গর্ভবতী মনিফাকে কোন নার্স বা আয়া সহযোগীতা না করে উল্টো তাকে ক্লিনিকে গিয়ে সিজারের জন্য ডিউটিরত সিনিয়র স্টাফ নার্স তাহমিনা ও রঞ্জিলা বেগম চাপ দেয় দেয় বলে জানা যায়।

সিজার করার সামর্থ না থাকায় মেডিকেলেই বাচ্চা প্রসবের চেষ্টা করার জন্য নার্সদের কাছে কান্নাকাটি করে অনেক অনুরোধ করলেও তাদের মন গলেনি। নিরুপায় হয়ে রাকিব তার বোনকে নিয়ে মেডিকেলের নিচে নেমে কারও সহযোগিতা পাবার আশায় এদিক ওদিক ছুটাছুটি করতে থাকেন। অনেক হয়রানি হবার পরে রাত সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সামনে এক মহিলার সহযোগিতায় ভ্যানের উপরেই মনিফার একটা ফুটফুটে ছেলে বাচ্চা হয়। বাচ্চাটি বর্তমানে সুস্থ আছে। সরকারি মেডিকেলের নার্স ও ডাক্তারের কার্যকলাপ নিয়ে এলাকাজুড়ে ইতিমতো সমালোচনার ঝড় উঠে। সরকারি মেডিকেলে ভর্তিরত প্রসববেদনায় কাতর একজন প্রসূতি মায়ের সন্তান কিভাবে মেডিকেলের সামনে ভ্যানের উপরে প্রসব হয় এ নিয়ে প্রশ্ন এখন লালমনিরহাট জেলার সবার মুখে।

প্রসূতি মনিফা বেগম জানান, মেডিকেলে ভর্তি হবার পরে আমি প্রসববেদনা মরে যাচ্ছিলাম।বাচ্চাটিকে বাঁচার জন্য নার্স তাহমিনা ও রঞ্জিলা বেগমের কাছে অনেক কান্নাকাটি করেছি। কিন্তু তারা আমাকে কোন প্রকার সহযোগিতা তো করেননি উল্টো ভয় দেখিয়ে বলেন, বাচ্চার অবস্থা ভালোনা ক্লিনিকে গিয়ে সিজার করতে হবে। আল্লাহর রহমতে অপরিচিত একজন মহিলার সহযোগিতায় মেডিকেলে সামনে ভ্যানের উপরেই আমার সন্তান প্রসব হয়। “আমরা গবিব মানুষ হওয়ায় কি আমাদের জীবনের কোন মুল্য তাদের কাছে নেই বলে কাদতে থাকেন মনিফা বেগম”।

মেডিকেলে ভর্তি এক রোগীর আত্মীয় উত্তর পারুলিয়া এলাকার জমসের আলীর ছেলে এরশাদুল ইসলাম (প্রত্যক্ষদর্শী) বলেন, এটা কেমন সরকারি মেডিকেল। প্রসববেদনায় কাতর একজন প্রসূতি মায়ের সন্তান প্রসবের জন্য তাদের কোন চেষ্টাই আমার চোখে পড়লো না। প্রসূতি মনিফা বেগমে কান্না ও নার্সদের ভুমিকা নিয়ে আমি হতবাক হয়েছি। নার্সরা একটু সহযোগিতা করলে প্রসূতি মহিলাটিকে কোন কষ্টই পেতে হতোনা। মেডিকেলে ভর্তি হবার পর যে একজন প্রসূতি মাকে সন্তান জন্ম দেয়ার জন্য এত ছোটাছুটি করতে হবে তা তার জানা ছিলনা বা এখানে না আসলে জানতে পারতাম না।

মনিফার ছোট ভাই রাকিব বলেন, বোন মনিফা ও তার গর্ভের সন্তানকে বাচাতে তাকে কতটা যে ছোটাছুটি করতে হয়েছে তা আল্লাহই ভালো জানেন। এর ফলে যদি বোনের বা গর্ভের সন্তানের জীবন চলে যেত, তাহলে এর দায় কে নিত, নাকি গরীব বলে আমাদের জীবনের কোন মুল্য নেই।

হাতীবান্ধা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পঃপঃ কর্মকর্তা ডাক্তার নাইম হোসেনের সাথে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য তার মোবাইলে ফোন দিতে তা বন্ধ পাওয়া যায়।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডিউটিরত সিনিয়র স্টাফ নার্স তাহমিনা বেগমের সাথে কথা হলে তিনি জানান, মনিফা বেগম মেডিকেলে ভর্তি হবার পর রঞ্জিলা আপাসহ আমরা অনেক চেষ্টা করেছি। তার জরায়ুর মুখ খোলা থাকলেও জরায়ুর বাহিরে কট প্রলাভ্স (ফুলের একটা অংশ) থাকায় আমরা ঝুকি নিতে সাহস পাইনি তাই ক্লিনিকে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দেই।

কোন রেফার্ড (ছারপত্র) ছাড়া সরকারি মেডিকেলে ভর্তি একজন প্রসূতি মহিলা রাত ১২টার পর কিভাবে মেডিকেলের বাহিরে গেলো এমন একটি প্রশ্নে কোন সদুত্তর দিতে পারেননি নার্স তাহমিনা বেগম।

এ বিষয়ে কথা হলে অপর সিনিয়র স্টাফ নার্স রঞ্জিলা বেগম জানান, আমি ঐ সময় অনডিউটে বাসায় ছিলাম। সিনিয়র নার্স তাহমিনা বেগমের ফোন পেয়ে মেডিকেলে এসে দেখি, প্রসূতি মনিফা বেগমের জরায়ুর মুখ খোলা ছিলো কিন্তু তার গর্ভে বাচ্চাটি উল্টো দিকে থাকায় তার একটি পা জরায়ুর বাহিরে বের হয়, ফলে আমরা তার বাচ্চাপ্রসবে ঝুকি নিতে চাইনি। তবে ঐ মহিলাকে ক্লিনিকে সিজার করার জন্য চাপ দেয়ার কথা অস্বীকার করেন তিনি।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য