সময়টা ২০১৪ সাল। এলাকার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘বাগপুর একতা স্পোর্টিং ক্লাব’ খেলাধুলার পাশাপাশি দিনাজপুরের কাহারোল, বীরগঞ্জ ও খানসামা উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকার পিছিয়ে পড়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীদের নিয়ে কাজ করি। হঠাৎ একদিন ক্লাবে কয়েকজন বসে প্রতিবন্ধীদের নিয়ে স্কুল করার চিন্তা মাথায় আসে। বিষয়টা নিয়ে কথা বলি ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আমার বাবা বাবু হরিকেশর রায়ের সাথে।

তিনি এর আগে নিজে জমি দান করে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে তোলেন। তিনি ইতিবাচক সাড়া দিয়ে স্কুলের কথা শোনে অনুপ্রেরণা ও পরামর্শ দেন। উৎসাহটা তখন আরো বেড়ে যায়। এক কান, দু কান করে স্কুল প্রতিষ্ঠার গল্পটা এরই মাঝে ছড়িয়ে পড়ে গ্রামের যুব সমাজের মাঝে। সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে স্কুল প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসে গ্রামের শিক্ষিত তরূণ-তরূণীরা। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে গল্পের পরিধিটা। সবার সিদ্ধান্তে স্কুলের নামকরণ করা হয় কাহারোল উপজেলার অন্তর্গত সুন্দরপুর ইউনিয়নের বাগপুর গ্রামের নামকরণে ‘বাগপুর বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়’।

২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি আমাদের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পৃষ্ঠপোষকতায় বাগপুর গ্রামে আমার বাবার প্রতিষ্ঠিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে বাবা প্রতিবন্ধী স্কুলের জন্য ২০ শতক জমিদান করেন। সেখানে এলাকার সংকর পাল, দৌলতুন নেসা, আফসানা আছমিরা আশা, বিমল রায় উদ্যোগ নিয়ে ক্লাবের অর্থায়নে কয়েকটি বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘর তৈরি করে ৫৩ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু হয় স্কুলটির। প্রতিবন্ধীদের নিয়ে স্কুল প্রতিষ্ঠার গল্পের শুরুর দিকটা এভাবেই এই প্রতিবেদকের কাছে তুলে ধরেন বাগপুর বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হরিদাস রায়। তিনি বলেন, স্কুল প্রতিষ্ঠার শুরুতেই স্বপ্রণেদিত হয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে স্কুলে শিক্ষকতার কাজে যোগ দেন এলাকার বাসিন্দা সংকর পাল, দৌলতুন নেসা, আফসানা আছমিরা আশা, বিমল রায় সহ অনেকই।

এরপর সবার সহযোগিতা নিয়েই নানা চড়াই-উৎড়াই পেরিয়ে স্কুলটি এখন তিন উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকার প্রতিবন্ধী ছেলে-মেয়েদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়েছে। বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যালয়ে মোট ২২ জন শিক্ষক-কর্মচারীর মধ্যে শিক্ষক রয়েছেন ১০ জন। আর ১ম শ্রেণি হতে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী রয়েছে ১৩৫ জন। এর মধ্যে প্রায় ৯৯ জন শিক্ষার্থীর প্রতিবন্ধী স্মার্ট কার্ড রয়েছে।

সরেজমিনে যেয়ে দেখা যায়, ৩টি কক্ষ ও বারান্দায় প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের গ্রুপ করে শিক্ষকরা তাদের বিভিন্ন কৌশলে পাঠদান করাচ্ছেন। দুপুরের পর অধ্যয়নরত প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা, গান-বাজনার, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডেরও প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন শিক্ষকরা। অধ্যয়নরত স্কুলের প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বয়স ৫ থেকে ১৮ এর মধ্যে। কেউ অটিজম, কেউ সেলিব্রাল, আবার কেউবা শারীরিক প্রতিবন্ধী, কেউ দৃষ্টি প্রতিবন্ধীসহ বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী রয়েছে। শিক্ষার্থীরা সবাই বাগপুর, সুন্দরপুর সহ আশেপাশের কয়েকটি উপজেলার বাসিন্দা। কথা হয় স্কুলের সিনিয়র শিক্ষক সংকর পাল, দৌলতুন নেসা, আফসানা আছমিরা আশার সাথে। তারা বলেন, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা এই স্কুলে আসার আগে একরকম ঘরবন্দি অবস্থায় থাকত। কিন্তু স্কুলে আসার পর থেকেই ওদের জীবন পাল্টে যেতে শুরু করেছে।

প্রশিক্ষণ পেয়ে স্কুলের শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে শুরু করেছে। ৮/১০ জন শিক্ষার্থী অনেক ভালো গান ও নাচতে পারে। প্রতিবন্ধী বাচ্ছাদের বাড়ি নিয়ে যেতে কয়েকজন অভিভাবক আসলে তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, উপজেলা পরিষদ হতে এই সীমান্তবর্তী স্কুলটির দূরত্ব প্রায় ১৬-১৮ কি.মি। এই অঞ্চলে প্রতিবন্ধীদের পড়াশোনার জন্য কোনো স্কুল ছিল না। আমরা কখনো ভাবি নি যে আমাদের প্রতিবন্ধী বাচ্ছারা স্কুলে যাবে। বাড়ি হতে প্রতিদিন স্কুলের অটোগাড়িতে করে আমাদের সন্তানকে নিয়ে এসে শিক্ষকরা আন্তরিকভাবে তাদের মাঝে যেভাবে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে তাতে স্কুলটি দিন দিন এলাকায় অনেক ভাল সুনাম ছড়িয়েছে। তাই স্কুলটি প্রতিষ্ঠার পর এখানে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

প্রতিবন্ধীদের নিয়মিত স্কুলে আসা দেখে অন্য প্রতিবন্ধী শিশুরাও স্কুলে আসার বিষয়ে উৎসাহিত হয়ে উঠেছেন। চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মা-মনি রায়ের বাবা রমনী রায় বলেন, প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে আমার মেয়েটারে কোনো ইসকুলে ভর্তি করাইতে পারছিলাম না। এইহানে ভর্তি হওয়ার এহন নিজেই নিজের নাম লেখা শিখছে। মা-মনির দেহাদেহি পাশের পাড়ার প্রতিবন্ধী শিশু সাথী, জাকিয়া, মিজানুর, ফয়সালও এহন এই ইসকুলে আইতাছে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক হরিদাস রায় বলেন, আর্থিক সমস্যার কারণে স্কুল প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখনো শিক্ষকরা বিনা পারিশ্রমিকে শিক্ষকতা করছে।

বাচ্ছাদের প্রতিদিন মিড-ডে মিল, জাতীয় বিভিন্ন দিবস পালন, খেলাধুলার সামগ্রী ও কর্মচারী খরচ আমরা নিজেরাই খরচ করছি। তাছাড়া স্কুলের শিক্ষার্থীদের বেঞ্চ, টেবিল, ক্রীড়াসামগ্রী, গান বাজনার সরঞ্জাম সহ প্রয়োজনীয় নানা আসবাবপত্র ও জিনিসপত্রের সংকট রয়েছে। তারপরেও সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে আমরা সকলের সহযোগিতায় স্কুলটিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। তিনি আরো বলেন, কিছু দিন আগে স্কুলটি স্থানীয় সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপাল, জেলা ও উপজেলা সমাজসেবা অফিসের কর্মকর্তা এবং কাহারোল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারসহ আরো অনেক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্কুলটি পরিদর্শন করে সন্তোষজনক প্রতিবেদন দেন। ইতোমধ্যে স্কুলটি সরকারিভাবে স্বীকৃতির জন্য আবেদন করা হয়েছে। স্বীকৃতি পেলে স্কুলটি আরো বেগবান হবে বলে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা মতপ্রকাশ করেছেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য