চিরিরবন্দর উপজেলার মহাসড়ক, আঞ্চলিক সড়ক ও গ্রামীণ সড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে যন্ত্রদানব ট্রাক্টর। ক্ষেত খামারে হালচাষের এ যন্ত্রটির অবাধ বিচরণে উপজেলার সড়কপথগুলো প্রায় সবজি চাষযোগ্য ক্ষেতে পরিণত হয়েছে, জনদূর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। এ নিয়ে আইন-শৃংখলা সভাসহ বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে আলোচনা হলেও প্রশাসনের তেমন কোন মাথাব্যথা নেই। মাঝে মধ্যে মোবাইল কোর্ট করা হলেও নিয়ন্ত্রন করা যায়নি দ্রুত গতির ট্রাক্টরগুলো।

প্রশাসনের সামনে দিয়েই বেপরোয়াভাবে বিকট শব্দে মাটি বোঝাই ট্রাক্টর পাউডারের মতো ধুলো উড়িয়ে ছুঁটে যাচ্ছে। উপজেলার সর্বত্র কৃষি জমি থেকে ইটভাটায় ব্যবহারের জন্য মাটি নিয়ে ট্রাক্টরগুলো মহাসড়ক, আঞ্চলিক সড়ক ও গ্রামীণ সড়কগুলোর উপর দিয়ে দিনরাত ছুঁটে চলেছে। সকাল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত শতাধিক ট্রাক্টর কৃষি জমি থেকে মাটি বোঝাই করে বিভিন্ন ইটভাটায় যাতায়াত করছে। ফলে গ্রামীণ সড়কগুলো ভেঙ্গে গিয়ে গর্ত সৃষ্টি হয়ে সড়কগুলো প্রায় সবজি চাষের জমিতে পরিণত হয়েছে।

আর এসব সড়ক দিয়ে স্কুল-কলেজ, মাদরাসাগামী শিক্ষার্থীসহ জনসাধারণের পায়ে হাঁটায় চরম দূর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। এসব সড়কে মাটি ছিটকে পড়ে পিচ ঢেকে পাকা সড়ক এখন মাটির সড়কে পরিণত হয়েছে। দিনের বেলায় সূর্যের আলোয় পিচ্ছিল মাটি ট্রাক্টরের চাকায় পিষ্ঠ হয়ে ধুলো সৃষ্টি করে সড়ক ও সড়কের আশপাশের এলাকার পরিবেশ দূষিত ও দূর্বিষহ করে তুলছে। ফলে এলাকার জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে রয়েছে। এসব ট্রাক্টরের বডি থেকে উপরে উঁচু করে খোলা অবস্থায় মাটি বোঝাই করে বিকট শব্দে চলাচল করছে।

ফলে বিভিন্ন সড়কে প্রতিনিয়ত যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। ট্রাক্টরের অবাধ চলাচলে প্রশাসনের নীরবতায় জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে গরীবের বাহন নছিমন, করিমন, শ্যালো ইঞ্জিন চালিত ভটভটি নিষিদ্ধ করে যন্ত্রদানব ট্রাক্টরকে পাকা সড়কে চলতে দেওয়া হচ্ছে কোন স্বার্থে? গ্রামের কাঁচা সড়কগুলো যন্ত্রদানবের দাপটে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

ফলে এসব সড়কে অন্যান্য যানবাহনের চলাচল বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভ্যানচালক নজরুল ইসলাম ও একরামুল হক জানান, সূর্যের আলো থাকার পরেও রাস্তার আশপাশ এলাকা ট্রাক্টরের সৃষ্ঠ ধূলোয় অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে থাকে। আর ধূলোর মধ্য দিয়ে চলাচল করায় সর্দি-কাশিসহ শ্বাসকষ্ট জনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এলাকার শিশুসহ সব বয়েসি মানুষ। আর এসব সড়ক যেন ট্রাক্টরের দখলে। এসব সড়ক দিয়ে যারা চলাচল করে থাকেন তাদের পা থেকে মাথা পর্যন্ত ধূলোয় সাদা হয়ে যায়।

অনেক যাত্রীবাহি যানবাহন এসব সড়কে আসতে চায় না। আর যারা গাড়ি নিয়ে আসেন তারা প্রায়ই বিভিন্ন দূর্ঘটনার শিকার হন। চিরিরবন্দর প্রেসক্লাবের সম্পাদক মোরশেদ উল আলম বলেন, ট্রাক্টরের বিষয় নিয়ে উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় আলোচনা করেছি কোন কাজ হয়নি। ইটভাটা মালিকরা প্রতিবছর শুকনো মৌসুমের শুরুতেই মনে হয় প্রশাসনের নিকট ট্রাক্টর চালানোর অলিখিত অনুমতি নিয়ে নেন। গত ৬ মাসে অন্তত ১৫ জনের ট্রাক্টর চাপায় মৃত্যু হয়েছে। অল্প টাকায় দ্রুত আপোষরফা করায় কোন মামলা হয়নি। কিছু ভূমি মালিকের অসাধু লাভের কারণে ট্রাক্টরগুলো জমির টপওয়েল মাটি কেটে জমির ভারসাম্যতা নষ্ট করছে।

ট্রাক্টর মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ জানান, উপজেলার উন্নয়নমূলক সকল কাজে আমাদের ট্রাক্টরগুলি দিয়ে বালু, ইটসহ অন্যান্য মালামাল বহন করা হচ্ছে। আমরাও উন্নয়নের অংশীদার। প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক এ কাজে নিয়োজিত আছে। সকল চালকদের ধীরে চালানোর নির্দেশ দেয়া আছে। কোন চালক কথা শুনলে আমরা তাকে গাড়ি হতে নামিয়ে দেই।

চিরিরবন্দর থানার কর্মকর্তা ইনচার্জ (ওসি) সুব্রত কুমার সরকার জানান, এ উপজেলায় অতিরিক্ত ইটভাটা হওয়ায় ট্রাক্টরের উপদ্রব বেশি। লোকবল স্বল্পতার কারণে আমরা এসব ট্রাক্টরের বিরুদ্ধে অভিযান দিতে পারছি না।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আয়েশা সিদ্দীকা জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। সকল চালক, শ্রমিক ও ট্রাক্টর মালিকদের সাথে মতবিনিময় করা হয়েছে। এরপরও কেউ আইন মেনে না চললে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। গত ২ মার্চ সহকারি কমিশনার (ভূমি) মেজবাউল করিম দুজন ভূমি মালিকের ও একজন ট্রাক্টর চালকের জরিমানা করেছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য