লিহাজ উদ্দিন মানিক; বোদা, পঞ্চগড়ঃ পঞ্চগড়ের বোদায় ৫ জন নারী জয়ীতা পুরস্কার পেয়েছে। উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর প্রতি বছর বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে এ পুরস্কার দিয়ে থাকেন। অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী মোছাঃ হাসিান বানু, সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন মোছাঃ সেলিনা বেগম, নির্যাতনের বিভিশিখা মুছে ফেলে নতুন উদ্যোমে জীবন শুরু করেন মোছাঃ সেতারা বেগম, শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অজনকারী মোছাঃ আসমা বেগম, সফল জননী নারী হিসেবে মোছাঃ মেহেরুন নেছা।

এদের সফলতার জীবনের গল্প ও জীবনবৃত্তান্ত তুলে ধরা হলোঃ

হাসিনা বানুঃ অর্থনৈতিক ভাবে সফলতা অর্জনকারী হাসিনা বানু, স্বামীঃ মৃত-মিলন হোসেন, গ্রামঃ জমাদারপাড়া, সে ১৯৭৯ সালের বোদা উপজেলার জমাদারপাড়া গ্রামের এক হতদরিদ্র পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। ৮ ভাই বোনের মধ্যে সে ছিল ৬ষ্ট। তার পরিবার তাকে নবম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় বিয়ে দেয়। স্বামীর পরিবারের সাথে বনিবনা না হওয়ায় স্বামী সহ সে অনত্র বসবাস শুরু করেন। মাত্র ১৭ টাকা দিয়ে নার্সারি ব্যবসায় নামেন। নার্সারির লাভের টাকা ও এনজিও থেকে লোন নিয়ে ১৯৯৬ সালে স্বামীর নামে মিলন নাসারি দিয়ে নাসিরা ব্যবসা পুরো দমে শুরু করেন। ইতি পুর্বে তাদের কোলে ২টি কন্যা সন্তানের জন্ম নেয়। নার্সারি ব্যবসা করে ধীরে ধীরে তার পরিবারে স্বচ্ছলতা ফিরতে শুরু করে। এর মধ্যে হঠাৎ একদিন তার স্বামী মৃত্য বরণ করেন। স্বামী মারা যাওয়ার পরও হাসিনা বানু নার্সারি ব্যবসা পরিচালনা করে লাভবান হয়েছেন। মাত্র ১৭ টাকা ব্যবসায় বর্তমানে সে ১১ বিঘা জমিতে নাসারি বাগান গড়ে তুলেছেন। মেয়ে দুটি বড় করে গড়ে তুলেছেন। অর্থনৈতিকভাবে সে এগিয়ে গেছেন।

সেলিনা আকতারঃ সমাজ উন্নয়ন অসামান্য অবদান রাখা সেলিনা আকতার, স্বামী: আবদুল গফুর, গ্রামঃ প্রামানিকপাড়া, সে একসময় গৃহিনী ছিলেন। শিক্ষাগত যোগ্যতা বিএ পাশ। তখন তার মুল্যায়ন কম ছিল। তার স্বামী ছিল বেকার, সে কিভাবে সমাজে বড় হবে, সমাজের মানুষ কিভাবে তাকে মুল্যায়ন করবে এবং ছেলে মেয়েদের কিভাবে মানুষ করা যাবে এ রকম ভাবনা থেকে তার শুরু হল জীবন সংগ্রাম। প্রথমে নিজেকে আত্মকর্মসংস্থানের জন সেলাই প্রশিক্ষন করে পরর্বতীতে-বেসরকারী ক্লিনিকে চাকুরি করে একসময় আরডিআরএস বাংলাদেশে কৃষি প্রোগ্রাম চাকরী করেন। চাকুরী করে সে তার সংসারের স্বচ্ছলতা ফিরে এনেছেন। চাকুরী ছেড়ে একসময় শিক্ষকতা করেছেন। এলাকার মানুষের ভালবাসায় বোদা পৌরসভার ১ম নির্বাচনে তিনি ৭,৮,৯ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলার নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি নিজের সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরে এনে সমাজের মানুষের উন্নয়নে কাজ করেছেন।

সেতারা বেগমঃ নির্যাতনের বিভিষীকা মুছে নতুন জীবন অর্জনকারী সেতারা বেগম, পিতা-মৃত-আলাউদ্দীন, গ্রামঃ চন্দনবাড়ি সরকারপাড়া, ১৯৯০ সালে তার নবম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় বাবা মারা যায়, শত কষ্টের পরেও সে এসএসসি পাশ করেন। এসএসসি পাশ করা পর কলেজে একাদশ শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় বিয়ে হয়। তার বিয়ে হয় একটি গরীব ঘরে। শুরু হয় তার অভাব অনটনে স্বামী সংসার। অভাবের কারণে কিছু দিনের মধ্যে শুরু হয় ঝগড়া কলহ। এমন এক পরিস্থিতিতে সে আবার বাবাব বাড়ি চলে আসে। পরে তাদের পরিবারের দুই পক্ষের মধ্যে সমঝতা হয়ে স্থানীয় শালিশ মিমাংসা হয়ে আবার সংসার জীবন শুরু করে। এভাবে ৭ বছর সংসার জীবন কালে তার একটি সন্তান আসে। সন্তান আসার পর থেকে তার স্বামী তাকে ও তার সন্তানকে ঠিক মত খাবার দিত না। তার স্বামী তাকে রেখে বিভিন্ন জায়গা চলে যেতেন। হঠাৎ একদিন তার স্বামী বাড়িতে এসে ব্যাপক মরপিট করলে সে এ নির্যাতন সইতে না পেরে বাবার বাড়ি চলে আসে। পরে কোটের মাধ্যমে স্বামীর কাছ থেকে দেরমোহর ও ভরণপোষন নিয়ে স্বামীর কাছ থেকে পৃথক হয়ে শুরু হয় তার নতুন জীবন। স্থানীয় একটি এনজিও অনুভব সংস্থায় এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনে চাকরি করে এবং অবসর সময়ে বাড়িতে ছাগল ও হাস- মুরগি পালন করে পোষ্ট অফিসে কিছু টাকা সঞ্চয় করেন। বাবার বাড়িতে এভাবে ১৪ বছর সংসার চালিয়ে নিজে জমি কিনে বাড়ি করেছেন। বর্তমানে তার একটি মেয়ে রংপুর কারমাইকেল কলেজে অনার্স প্রথম বর্ষে লেখাপাড়া করছে। ছোট মেয়েটি বোদা বালিকা বিদ্যালয়ে ৭ শ্রেণীতে পড়াশুনা করছেন।

আসমা বেগমঃ শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সফলতা অর্জনকারী আসমা বেগম, স্বামীঃ রফিকুল ইসলাম, গ্রামঃ ভীমপুকুর, তার বাবা ও মা শিক্ষিত ছিলনা বলে মেয়েদের লেখাপড়ার দিকে নজর দিত না। তারা মেয়েদের বিয়ে দিয়ে সংসার জীবন বেছে নেয়ার পক্ষে। সে নিজে কষ্ট করে ৩ কিলোমিটার রাস্তা পায়ে হেটে পড়াশুনা করে এসএসসি পাশ করেছেন। তার পরে তাকে পড়াশুনা করা অবস্থায় এক গরীব ঘরের ছেলের সাথে বিয়ে দেয়। সংসার জীবন শুরু হলে নেমে আসে শ্বশুর শ্বাশুরীর নির্যাতন। তার পরে সে তার স্বামীকে সাথে নিয়ে চুপি চুপি লেখাপড়া চালিয়ে গেছেন। একসময় অভাবের তারনায় লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে ঠিক সেই সময় ব্র্যাক কর্মকর্তার সহায়তার ব্রাকের শিক্ষা কর্মসুচীতে কিশোর কিশোরী স্কুলে চাকুরি পায়। সংসারের পাশাপাশি অনেক কষ্ট করে ব্র্যাক স্কুলে চাকুরী করে লেখাপড়া চালিয়ে যায়। এই মধ্যে এইচএসসি পাশ করে স্কুলের চাকুরিটা সতের মাস করার পর সুপারভাইজার পদে দায়িত্ব পায়। এইচএসসি পাশ করার পর সে তার মা বাবার চেষ্টায় একটি রেজিষ্ট্রেশনকৃত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের চাকুরী নেয়। চাকুরী চলাকালীন বিএ ভর্তি হয়ে ২য় বিভাগে পাশ করেন। চাকুরী চলাকালীন বিএ পাশ করে চাকুরী বহিতে বিএ পাশ তুলতে না পেরে বাংলাদেশ উম্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসএস ১ম বিভাগে পাশ করেন। ভাল শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে পিটিআই এ এক বছর মেয়াদী বেসিক কোর্স সিইন অ্যাড কোস অংশগ্রহণ করে ১ম বিভাগে উর্ণীন হয়ে ২০০৮ সালে বোদা উপজেলার শ্রেষ্ট সহকারী শিক্ষক নির্বাচিত হন। অনেক বাধা প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সহকারী শিক্ষকের পদোন্নতি পেয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে চাকুরীতে যোগদান করেন। তিনি সেখানে ৭ বছর ধরে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। দ্ররিদ্রতা তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বর্তমানে তিনি একজন সফল শিক্ষিকা ও সফল মা। তার একটি মেয়ে রংপুর কারমাইকেল কলেজে অনাস ফাইনালে পড়ছেন। একমাত্র ছেলে ঢাকা নটরডেম কলেজের এইচএসসি ১ম বর্ষের ছাত্র।

মেহেরুন নেছাঃ সফল জননী নারী অজনকারী মেহেরুন নেছা, স্বামীঃ আজহারুল ইসলাম, গ্রামঃ ভীমপুকুর, ১৯৬৪ সালে তিনি জন্মগ্রহন করেন। তারা সংসারে ৮ ভাই বোন। সবার বড় হওয়ায় সবাই তাকে আদর করতেন। ৬ বছর বযসে তাকে গ্রামের স্কুলে ভর্তি করে দেয়া হয়। শুরু হয় তার স্কুল জীবন। কিন্তু সবার কপালে সুখ থাকে না তাইতো ৮ম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় তার পরিবার তাকে বিয়ে দিয়ে দেয়। বিয়ে হওয়ার পর তার আর পড়াশুনা করা হয়নি। শুরু হয় তার সংসার জীবন। অল্প কিছু দিন সংসার করার পর শ্বশুর শ্বাশুরী তাকে পৃথক করে দেয়। তার স্বামীর সংসারে তেমন খেয়াল রাখত না। সংসারে প্রতি তার কোন দায়িত্ব ছিল না। সে নিজে অনেক কষ্ট করে ছেলে মেয়েদের নিয়ে জীবন যাপন শুরু করেন। ছেলে মেয়েদের ভবিষতের কথা চিন্তা করে সংসার শক্ত হাতে ধরেন। তার স্বামী সংসারে যে টুকু খরচ দিত তা থেকে এবং বাড়িতে হাস-মুরগি ও গবাদি পশু পালন করে ব্র্যাক সামজিক ক্ষমতায়ন কর্মসুচীর পল্লী সমাজের সদস্য হয়ে তাদের গঠন মুলক পড়ামর্শ পেয়ে সংসারে নতুন প্রেরণ খুঁজে পেয়েছেন। সংসার জীবনে সে ৫ সন্তানের জননী। ৩ মেয়ে ২ ছেলে। তিনি নিজে বেশি দূর পড়াশুনা করতে না পারলেও তার ৩ মেয়েকে বিএ পাশ করিয়ে চাকুরীজীবি ছেলের সাথে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে দু’টিকে বিএ পাশ করিয়ে একটি ছেলেকে মাদরাসায় শিক্ষক বানিয়েছেন আর একটি ছেলেকে বড় কোম্পানীতে চাকুরীজীবি বানিয়েছেন। তিনি নিজে বেশি দূর পড়াশুনা না করতে পারলেও তার সংসারে ৫টি সন্তানকে লেখাপড়া করিয়ে মানুষ করে গতে তুলেছেন বলে তিনি একজন সফল জননী হতে পেরেছেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য