প্রি-মেন্সট্রুয়াল সিনড্রোম বা পিএমএস-এ আক্রান্ত হলে মাসের বিশেষ দিনগুলোর আগে বা পরে মেয়েদের নানান রকম সমস্যা দেখা দেয়। এর থেকে রেহাই পাওয়া যায় খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে। বিস্তারিত জানাচ্ছেন পুষ্টিবিদ আসফিয়া আজিম।

গত দুই-তিন দিন ধরে কি মেজাজটা একটু খিটখিটে হয়ে আছে? নাকি কারণে-অকারণে হঠাৎই খারাপ হয়ে যাচ্ছে মন? রাগ উঠে যাচ্ছে দুম করে? ক্যালেন্ডারের দিকে কি তাহলে একটু তাকাবেন? ভালো করে ভেবে দেখুন তো, ‘বিশেষ দিনগুলো’ কি সামনেই? আর প্রায় প্রতি সময়ই এই ‘বিশেষ দিনগুলো’ আসার কয়েক দিন আগে থেকেই ঘটতে থাকে এ ধরনের ঘটনা?

ওপরের প্রশ্নগুলোর বেশির ভাগের উত্তরই যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে বলতেই হবে, আপনি প্রি-মিন্সট্রুয়াল সিনড্রোমে আক্রান্ত। সংক্ষেপে যাকে বলে ‘পিএমএস’।

পিএমএস কী

এটি মেয়েদের খুব সাধারণ আর পরিচিত একটি সমস্যা। প্রতি তিনজন মেয়ের মধ্যে দুজনেরই এমনটা হয়ে থাকে। মন-মেজাজের তারতম্যের পাশাপাশি পেটব্যথা, মাথাব্যথা কিংবা হাতপায়ের জ্বলুনি- এসব সমস্যাও দেখা যায় প্রায়ই। এ ধরনের শারীরিক অস্বস্তি বা মানসিক অস্থিরতা আসলে ঘটে থাকে হরমোনের তারতম্যের কারণে।

মেয়েদের শরীরে হরমোনের এই তারতম্যকে দুটো ‘ফেইজ’ বা পর্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে। পিরিয়ড শুরুর প্রথম দিন থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত সময়টায় যে হরমোনের আধিক্য বেশি থাকে, সেটা মেয়েদের জন্য বন্ধুসুলভ। নির্ঝঞ্ঝাট এই হরমোন শরীর বা মনের ওপর বিশেষ কোনো চাপ তৈরি করে না, বাধা দেয় না স্বাভাবিক চলাফেরা বা দৈনন্দিন কাজে।

এর পরবর্তী সময়ে, মানে পিরিয়ডের ১৫ বা ১৬ দিনের পরেই যে হরমোনগুলোর পরিমাণ শরীরে বাড়তে শুরু করে, সেগুলোই মূলত পিএমএসের জন্য দায়ী। সাধারণত পিরিয়ডের ১৯ দিনের পর যেকোনো সময়ই দেখা দিতে পারে পিএমএসের লক্ষণ। তবে একেক মেয়ের ক্ষেত্রে পিএমএসের এই লক্ষণ হানা দিতে পারে ১৯ দিনের পর যেকোনো সময়ই।

যা করবেন

পিএমএসের বিরক্তিকর এই উপদ্রবের তীব্রতা কমানোর সহজ একটা উপায় আছে। আর সেটা হলো ‘নিউট্রিশন থেরাপি’। এই নিউট্রিশন থেরাপি যদি নিয়মিতভাবে মেনে চলা যায়, তাহলে পিএমএসের উপসর্গগুলো দূর করা যায় সহজেই।

পিরিয়ডের প্রথম ১৫ দিনের পর থেকে পিএমএসের জন্য দায়ী যে হরমোনগুলো শরীরে বাড়তে থাকে, সেই একই সময়ে বাড়তে থাকে ভিটামিন বি গ্রুপের ভিটামিনগুলোর চাহিদা। যেমন: থায়ামিন, রিবোফ্লাবিন, নায়াসিন, ভিটামিন বি-৬, ভিটামিন বি-১২ ইত্যাদি। পাশাপাশি ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি, ম্যাগনেশিয়াম আর জিংকও দরকারি হয়ে পড়ে শরীরের জন্য।

তাই এই সময়ে সেসব খাবার বেশি পরিমাণে খাওয়া জরুরি, যেগুলোতে আছে ভিটামিন বি, ভিটামিন ডি, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, জিংক আর ফলিক অ্যাসিড। আর দূরে থাকতে হবে গরু বা খাসির মাংস, রিফাইন্ড খাবার যেমন-কেক, পেস্ট্রি, মিষ্টি, কোলা বা সোডাজাতীয় খাবার বা পানীয় থেকে। এ ধরনের খাবার পিএমএসের উপসর্গকে বাড়াতে সাহায্য করে সাংঘাতিকভাবে।

ছোটখাটো কিছু খাদ্যাভ্যাস বা নিয়ম মেনে চললে পিএমএসের কষ্ট ও অস্বস্তি দূরে সরিয়ে রাখা সম্ভব। খুব সহজ ১০টা নিউট্রিশন থেরাপি দেওয়া হলো পিএমএসের ভুক্তভোগীদের জন্য।

১. নিয়মিত খাওয়াদাওয়া করা

ডায়েট কিংবা কাজের চাপের কারণে অনেক সময়ই যেকোনো এক বেলার খাওয়া বাদ পড়ে যায় আমাদের। দেখা যায়, সকালের নাশতা বা দুপুরের খাওয়া-যেকোনো এক বেলার খাওয়া বাদ যাওয়ায় বিকেলে বা রাতে অনেক বেশি পরিমাণে খাওয়া হয়ে যায়। এ ধরনের অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস একেবারেই বাদ দিতে হবে। উপোস বা ক্ষুধা ভাব পিএমএসের উপসর্গকে বাড়িয়ে দিতে সাহায্য করে বহুগুণে। শরীরে নিয়মিত পুষ্টির সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে পিএমএসকে ‘বিদায়’ বলা অনেক সহজ হয়ে যায়।

২. ভিটামিন-বি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া

চিনাবাদাম, কাঠবাদাম, কাজু, পেস্তার মতো একমুঠো রকমারি বাদাম, একটা কলা, আর এর সঙ্গে সাদা দই- নিয়মিত বা পিরিয়ডের অন্তত ১৫ দিনের পর থেকে পরবর্তী পিরিয়ড পর্যন্ত সময়ে যদি সকালের নাশতা বা স্ন্যাকস হিসেবে খাওয়া যায়, তাহলে পিএমএসের দুর্ভাবনা কমে যায় অনেকটাই। এ ছাড়া মুরগির মাংস, মিষ্টি আলু আর সপ্তাহে অন্তত একটি কুসুমসহ ডিম পিএমএসের উপসর্গকে দূর করতে ম্যাজিকের মতো কাজ করে। এই খাবারগুলোয় ভিটামিন-বি এর পরিমাণ অনেক বেশি। ভিটামিন-বি পিএমএসের মহা শত্রু; তবে মেয়েদের কিন্তু পরম বন্ধু।

৩. ফ্যাটজাতীয় খাবার থেকে দূরে থাকা

খাবারের তালিকায় যদি পনির, মাখন, বিরিয়ানি, রেজালা, পোলাও বা বেশি ভাজা খাবার থাকে- তাহলে এখনি আপনার খাদ্যতালিকাটি পাল্টে ফেলুন। রেস্তোরাঁয় খেতে গেলে কোমল পানীয় সরিয়ে তাজা ফলের রস বা সাধারণ পানির অর্ডার দিন। নতুন খাবারের তালিকায় রাখুন মাছ, ব্রকোলি, মুরগির কলিজা, ডাল আর কুমড়া বা শিমের মতো বিভিন্ন ধরনের দানাজাতীয় সবজি ইত্যাদি।

৪. পটাশিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া

শরীরে পটাশিয়ামের মাত্রা ঠিক থাকলে পিএমএসের সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমে আসে। তাই প্রতি বেলায় খাবার তালিকায় বেশি পরিমাণে শাকসবজি থাকতেই হবে। এক বাটি ফ্রেশ ফলের সালাদ, কমলার রস কিংবা মিক্সড সবজি সারা দিনের খাবারে যোগ করলে পিএমএস বিদায় নিতে বাধ্য।

৫. পানি খাওয়া

সারা দিনে ৮ থেকে ১০ গ্লাস পানি অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। চা, কফি, ফলের রস ইত্যাদি পানি খাওয়ার পরিমানের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যাবে না কোনোভাবেই।

৬. দুধ বা দুধের তৈরি খাবার

ক্যালসিয়াম আর ভিটামিন ডি মেয়েদের জন্য অত্যন্ত দরকারি মিনারেল আর ভিটামিন। প্রতিদিন দুধ বা দুধের তৈরি খাবার, যেমন: ছানা, পায়েস, সেমাই খেতেই হবে। তোফু, সয়াবিন, সামুদ্রিক মাছ, ছোট মাছ ইত্যাদি ক্যালসিয়ামের খুব ভালো উৎস। ক্যালসিয়াম রক্ত জমাট বাঁধতে সহযোগিতা করে আর হাড়ের দেখভাল করে থাকে।

৭. কালো বা তিতকুটে চকলেট

মিল্ক চকলেট বা ক্যান্ডি শরীরের জন্য ক্ষতিকর হলেও ব্ল্যাক চকলেট কিন্তু বেশ উপকারী। মিষ্টিজাতীয় খাবার খাওয়ার ইচ্ছা তাই পূরণ করা ভালো ব্ল্যাক চকলেটের মাধ্যমে।

৮. চিনি বা মিষ্টি-জাতীয় খাবার

বেশি পরিমাণে চিনি দিয়ে তৈরি খাবার বা মিষ্টিজাতীয় খাবার শরীরকে ক্লান্ত করে দ্রুত। এ জন্য রিফাইন্ড সুগার বা মিষ্টি জাতীয়খাবার যত কম গ্রহণ করা যায়, পিএমএসের ঝুঁকি ততই কমে আসে। মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছা যদি খুব তীব্র হয়, সে ক্ষেত্রে ফল খেয়ে মনটা সন্তুষ্ট করা ভালো। ফল পিএমএসের উপসর্গ দূর করতে সাহায্য করে।

৯. ভিটামিন-ই সমৃদ্ধ খাবার

লাল চালের ভাত বা রুটি, ব্রকোলি, বাদাম, জলপাই, পেঁপে, কুমড়া-এগুলোয় ভিটামিন-ই’র পরিমাণ অনেক বেশি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরে ভিটামিন-ই এর সরবরাহ ঠিকমতো থাকলে পিএমএসের সমস্যা সহজে কাবু করতে পারে না মেয়েদের। বলা হয়ে থাকে, মাংসপেশির সংকোচন-প্রসারণে যেহেতু ভিটামিন-ই সাহায্য করে থাকে, ফলে পরোক্ষভাবে এই ভিটামিন পিএমএসের উপসর্গ দূর করতেও সাহায্য করে।

১০. ম্যাগনেশিয়াম

অনেক ধরনের দানাজাতীয় খাবার ও বাদামে ম্যাগনেশিয়াম পাওয়া যায়, পাশাপাশি লাল চালেও। পিএমএসের কারণে সৃষ্ট পেটব্যথা, মাথাব্যথা, অস্বস্তি, ক্লান্তি ভাব ও অবসন্নতা কাটাতে ম্যাগনেশিয়াম সাহায্য করে। ধমনিগুলোকে প্রসারিত করে রক্ত চলাচলে সহায়তা করে ম্যাগনেশিয়াম। পাশাপাশি মাংসপেশির স্বাভাবিকতা রক্ষা করে বলে পিএমএস থেকে মুক্তি পেতে ম্যাগনেশিয়াম সমৃদ্ধ খাবারের জুড়ি নেই।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য