উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে বয়োবৃদ্ধ এবং অন্যান্য রোগে ভোগা ব্যক্তিদের মৃত্যু ঝুঁকিই সবচেয়ে বেশি বলে চীনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের করা এক বিস্তৃত গবেষণায় উঠে এসেছে।

দেশটির সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিসিডিসি) কভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত ও সন্দেহভাজন ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষের তথ্য নিয়ে এ গবেষণাটি করেছে, জানিয়েছে বিবিসি।

কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে হুবেই প্রদেশের রাজধানী থেকে চীনের অন্যান্য শহর ও দুই ডজনেরও বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়া নতুন ভাইরাসটি নিয়ে এখন পর্যন্ত এর চেয়ে বড় গবেষণা হয়নি।

সিসিডিসির গবেষণার প্রাথমিক ফলে দেখা গেছে, আক্রান্তদের মধ্যে ৮০ শতাংশের দেহেই সংক্রমণের মাত্রা ‘মৃদু’; বৃদ্ধ ও অন্যান্য রোগে আক্রান্তদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এমনকী আক্রান্তদের চিকিৎসায় নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মীদের ঝুঁকির মাত্রাও তুলনামূলক বেশি।

বিস্তৃত এ গবেষণায় হুবেই প্রদেশে ভাইরাসটির সংক্রমণের তীব্রতাও উঠে এসেছে। চীনের অন্যান্য অঞ্চলে ভাইরাসটিতে আক্রান্তদের মধ্যে গড়ে যেখানে মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশের মৃত্যু হচ্ছে, হুবেইতে তখন প্রতি একশ আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে মৃত্যুর হার হচ্ছে ২ দশমিক ৯।

সব মিলিয়ে কভিড-১৯ রোগে মৃত্যুর হার ২ দশমিক ৩ শতাংশ বলেও সিসিডিসির এ গবেষণায় উঠে এসেছে।

সোমবার চীনের জার্নাল অব এপিডেমিওলজিতে প্রকাশিত সিসিডিসির এ গবেষণাপত্রে ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৭২ হাজার ৩১৪ জনের শরীরে ভাইরাসটির উপস্থিতি সংক্রান্ত পরীক্ষার তথ্য স্থান পেয়েছে। যাদের নিয়ে এ গবেষণাটি হয়েছে, তাদের মধ্যে আক্রান্ত, সন্দেহভাজন ছাড়াও লক্ষণ ধরা পড়েনি এমন ব্যক্তিরাও রয়েছেন।

গবেষণার প্রাথমিক ফলে ভাইরাসটির প্রকার ও সংক্রমণের ধরন সংক্রান্ত আগেকার ধারণারই প্রতিফলন পাওয়া গেছে। গবেষণায় আক্রান্ত ৪৪ হাজার ৬৭২ জনের পরিস্থিতিরও বিস্তৃত বর্ণনা আছে।

ওইসব তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আক্রান্তদের মধ্যে ৮০ দশমিক ৯০ শতাংশের সংক্রমণই ‘মৃদু’; ১৩ দশমিক ৮০ শতাংশের সংক্রমণ তীব্র; ৪ দশমিক ৭০ শতাংশের পরিস্থিতি সংকটাপন্ন।

সবচেয়ে বেশি মৃত্যুহার ৮০ বা তদুর্ধ্ব ব্যক্তিদের, ১৪ দশমিক ৮০ শতাংশ।

শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সীদের মধ্যে কারও মৃত্যুর খবর নেই; ৩৯ বছর পর্যন্তও এ হার মাত্র শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি বাড়তে দেখা গেছে। কভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত চল্লিশোর্ধ্বদের মৃত্যুহার শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ, পঞ্চাশোর্ধ্বদের এক দশমিক ৩০ শতাংশ; ষাটোর্ধ্বদের ৩ দশমিক ৬০ শতাংশ, আর ৭০ এর ঘরে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ৮ শতাংশ।

প্রাণঘাতী এ ভাইরাসে আক্রান্ত ছেলেরা মেয়েদের তুলনায় বেশি মারা যাচ্ছে বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে। আক্রান্ত প্রতি ১০০ পুরুষের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ২ দশমিক ৮০ জনের; নারীদের ক্ষেত্রে এ হার এক দশমিক ৭০ শতাংশ।

গবেষণায় অসুস্থদের মধ্যে হৃদরোগে আক্রান্তদের মৃত্যু ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় বেশি বলে জানানো হয়েছে। রোগের তালিকায় এর পরের স্থানগুলোতে আছে ডায়াবেটিক, শ্বাসযন্ত্রের দীর্ঘস্থায়ী রোগ ও উচ্চ রক্তচাপ।

নিউমোনিয়া সদৃশ এ ভাইরাসে মঙ্গলবার উহানের এক হাসপাতালের পরিচালক চিকিৎসকের মৃত্যুর খবরের মধ্যেই সিসিডিসির এসব তথ্য মিলল।

৫১ বছর বয়সী লিউ জিমিং ছিলেন উহানের উচাং হাসপাতালের পরিচালক; উপদ্রুত শহরে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই এ হাসপাতাল গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখছে। চীনে করোনাভাইরাসে মৃত ঊর্ধ্বতন স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মধ্যে জিমিং-ই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে উচ্চপদস্থ, বলছে বিবিসি।

চীনে মঙ্গলবার পর্যন্ত নতুন এ করোনাভাইরাসে এক হাজার ৮৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে; আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছেছে ৭২ হাজার ৪৩৬ জন। আক্রান্তদের মধ্যে ১২ হাজারেরও বেশি এরই মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছেন বলেও নিশ্চিত করেছে চীনা কর্তৃপক্ষ।

সিডিসির গবেষণায় ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এক হাজার ৭১৬ স্বাস্থ্য কর্মীর দেহে ভাইরাসটি উপস্থিতি এবং ৫ জনের মৃত্যুর তথ্যও স্থান পেয়েছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য