কয়েক বছরের যুদ্ধ আর অবরোধে দুর্ভিক্ষের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়েমেনের লাখ লাখ মানুষকে দাতা সংস্থাগুলোর দেয়া জীবন রক্ষাকারী ‘মানবিক সাহায্য’ বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

উত্তর ইয়েমেনের বেশিরভাগ এলাকার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা হুতি কর্তৃপক্ষের ‘অভূতপূর্ব ও অগ্রহণযোগ্য বাধায়’ দাতাদের অসন্তোষের কারণে এমন পদক্ষেপের ঘোষণা আসতে পারে বলে বিবিসির এক প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

ব্রিটিশি এ সংবাদমাধ্যমটি বলেছে, ইয়েমেনের সংকটাপন্ন নাগরিকদের মানবিক সাহায্য পাঠানোর পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে যৌথ পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিতে বৃহস্পতিবার ব্রাসেলসে বৃহৎ দাতা গোষ্ঠী ও বিশ্বের বড় বড় সাহায্য সংস্থাগুলোর একটি বৈঠক হতে যাচ্ছে।

ইয়েমেনের লাখ লাখ লোক এ সাহায্য সংস্থাগুলোর পাঠানো ত্রাণের ওপরই গত কয়েক বছর ধরে নির্ভর করে আসছিলো।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ইয়েমেনে সংক্রান্ত সর্বশেষ ব্রিফিংয়ে বলা হয়েছে,মানবিক সাহায্য পৌঁছে দিতে যে বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে, তা ইয়েমেনের ৬৭ লাখ মানুষের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে।

“এ সংখ্যা আগে কখনোই এত ছিল না,” বলেছে তারা।

কর্মকর্তারা এর জন্য ইরানঘনিষ্ঠ হুতি বিদ্রোহীদের বাধা ও অসহযোগিতাকে দায়ী করছেন।

“মানবিক সাহায্য দেওয়া সংস্থাগুলোকে এমন পরিবেশে কাজ করতে দিতে হবে, যেখানে তারা মানবিক সাহায্যের মূল নীতিগুলো মেনে চলতে পারেন। যদি সেখানকার পরিবেশ তা না করতে দেয়, তাহলে এটার পরিবর্তনে আমরা সবকিছু করতে পারি,” বলেছেন ইয়েমেনে জাতিসংঘের মানবিক ত্রাণ কার্যক্রম বিষয়ক আবাসিক সমন্বয়ক লিসে গ্রান্ডে।

সমাধান খুঁজতে ‘একেবারে শেষ মুহুর্তেও’ ঊর্ধ্বতন হুতি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের ধারাবাহিক আলোচনা চলছে বলে বিবিসি জানিয়েছে।

তবে মাসের পর মাস ধরে চলা বৈঠক, ইয়েমেনের রাজধানী সানায় দূত পাঠানো এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলের একের পর এক বিবৃতিতেও লাভ হয়নি। হুতিদের বিরুদ্ধে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সাহায্য পণ্যের প্রবেশাধিকারের অনুমতি দিতে দীর্ঘসূত্রিতা, হয়রানি, কর্মীদের আটকে রাখাসহ নানান অভিযোগের পাহাড় জমেছে।

দাতা সংস্থার এক কর্মকর্তাও মানবিক সাহায্য পাঠানোর ক্ষেত্রে সেখানকার পরিবেশকে ‘ভয়াবহ প্রতিকূল’ হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়েছেন ।

ইয়েমেনে ক্রিয়াশীল প্রতিটি দাতা সংস্থার ওপর হুতিদের সুপ্রিম কাউন্সিল ফর দ্য ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড কোঅর্ডিনেশন অব হিউম্যানিটেরিয়ান অ্যাফেয়ার্সের (এসসিএমসিএইচএ) কর আরোপের একটি প্রস্তাব উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। প্রস্তাবিত করের পরিমাণ সংস্থাগুলোর পরিচালন ব্যয়ের প্রায় দুই শতাংশ।

“এটা বিশাল। এই অর্থ হুতিরা যুদ্ধে খরচ করবে, এমনভাবেও দেখা হতে পারে,” বলেছেন দাতা সংস্থার এক কর্মকর্তা। ইস্যুটির সংবেদনশীলতা বিবেচনায় ইয়েমেনে ক্রিয়াশীল বেশিরভাগ দাতাসংস্থাই এ নিয়ে কথা বলতে চায় না বলেও জানিয়েছে বিবিসি।

হুতিরা বলছে, কর আরোপের বিষয়টি এখনও প্রস্তাব হিসেবেই আছে, কার্যকর হয়নি। দাতা সংস্থাগুলোর পাঠানো ‘মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধ’ ও পণ্যসামগ্রী নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে তারা।

বিবিসির এক প্রতিবেদক লিখেছেন, তিনি হুতি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি মালগুদামে বসে কথা বলার সময় সেখানে থাকা ‘সাহায্য উপকরণগুলোর’ মেয়াদ ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত আছে বলে দেখেছিলেন। হুতি কর্মকর্তারা জানান, এই পণ্যগুলোর অনুমোদন পেতে পেতে এবং তা মানুষের কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে এগুলোর ‘মেয়াদ ফুরিয়ে যাবে’।

মূলত, এ দীর্ঘসূত্রিতার কারণেই খাদ্যসামগ্রীগুলো পচে যায় এবং তা মানুষের কোনো কাজে আসে না বলে বিভিন্ন দাতা সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

দাতা সংস্থাগুলো সাহায্যের নাম করে রাজনৈতিক কোনো উদ্দেশ্য পূরণ করতে চাইছে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ আছে হুতিদের।

“আমরা দাতা সংস্থাগুলোর সঙ্গে মনোমালিন্য চাই না। আমরা তাদের জানিয়েছি, যদি মানুষজনকে সাহায্য করার একই উদ্দেশ্য নিয়ে আমরা কাজ করি, তাহলে বিবাদ করা যাবে না। কিন্তু তারা যদি একে রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে নেয়, তাহলে করার কিছু নেই,” বলেছেন এসসিএমসিএইচএ-র আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিভাগের কর্মকর্তা মানে আল আসাল।

দাতা সংস্থাগুলোর ওপর কর আরোপের বিষয়ে যুক্তিও দিয়েছেন তিনি।

“যখন আমরা অবরোধের মধ্যে আছি, তখন মানবিক সাহায্য কর্মকাণ্ড সমন্বয়ের জন্য এই অর্থ চাওয়া অন্যায় নয়,” বলেছেন আসাল।

ইরানঘনিষ্ঠ হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট কয়েক বছর ধরেই ইয়েমেনের আকাশ, বন্দরসহ চারপাশে অবরোধ দিয়ে রেখেছে। ওই অবরোধ এবং সৌদিজোট সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীর বাধার কারণেও অনেক এলাকায় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো যাচ্ছে না; অবশ্য একে হুতি অঞ্চলে পাওয়া বাধার তুলনায় ‘অনেক কম’ বলছেন দাতা সংস্থার কর্মকর্তারা।

হুতিদের বাধা ও অসহযোগিতার কারণে গত বছর ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডব্লিউএফপি) সানার একটি এলাকায় ত্রাণসামগ্রী দেওয়া তিনমাস বন্ধ রেখেছিল। কাদের ত্রাণ বেশি দরকার, এ সংক্রান্ত একটি নতুন বায়োমেট্রিক পদ্ধতি চালু নিয়ে মতপার্থক্যের পর ডব্লিউএফপি ওই পদক্ষেপ নিয়েছিল।

হুতি কর্তৃপক্ষ ত্রাণসামগ্রী যাদের দরকার তাদের না দিয়ে তাদের যোদ্ধাসহ অন্যদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছিল, এমন অভিযোগের পর ডব্লিউএফপি ওই বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে ত্রাণ সরবরাহের কার্যক্রম চালু করে।

তিন মাসের এ ‘সাময়িক বন্ধের’ পর হুতিরা নতুন পদ্ধতি নিয়ে তাদের আপত্তি সরিয়ে নেয়। এ ধরনের উদাহরণগুলোই দাতা সংস্থাগুলোকে কিছু সময়ের জন্য ‘মানবিক সাহায্য’ বন্ধ রেখে হুতিদের ওপর চাপ সৃষ্টিতে আগ্রহী করে তুলছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে এই সিদ্ধান্ত পরিস্থিতির ভয়ঙ্কর অবনতি ঘটাতে পারে বলেও আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।

“আমরা অনেক ভুগেছি। আমরা আশা করছি, দাতারা ফের সাহায্য বন্ধ করে দেবে না,” বলেছেন ক্রাচে ঠেকা দিয়ে দাঁড়ানো সানার এক বাসিন্দা। পাশে দাঁড়ানো অন্য ইয়েমেনিদের চোখেও তখন আসন্ন ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ, শঙ্কা।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য